পরিবারের কল্যাণ ও মুত্তাকীদের নেতৃত্ব
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا، وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ، وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا.
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
আর যারা প্রার্থনা করে : হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান কর যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও।
রূপ: «হাব লানা» (هَبْ لَنَا) এবং «ইজ‘আলনা» (اجْعَلْنَا) ক্রিয়াপদ। এটি পারিবারিক সুখ, সৎ স্ত্রী ও সন্তান এবং তাকওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব লাভের এক মহৎ দোআ।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
«আর যারা বলে: হে আমাদের রব! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে… দান করুন»—অর্থাৎ আমাদের সঙ্গী, বন্ধু, সমবয়সী ও স্ত্রীদের পক্ষ থেকে; «এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের প্রশান্তি»—অর্থাৎ যাদের দেখে আমাদের চোখ জুড়িয়ে যায়। তাদের অবস্থা ও গুণাবলি অনুসন্ধান করলে, তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার উচ্চতা থেকে বোঝা যায় যে, তারা তাদের আপনজনদেরকে তাদের রবের অনুগত, জ্ঞানী ও সে অনুযায়ী আমলকারী না দেখা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হয় না।
এটি যেমন তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সংশোধন ও সৎ হওয়ার জন্য দোআ, তেমনি নিজেদের জন্যও দোআ; কারণ এর উপকার তাদের কাছেই ফিরে আসে। এ কারণেই তারা একে নিজেদের জন্য দান হিসেবে চেয়েছে এবং বলেছে: «আমাদেরকে দান করুন»। বরং তাদের দোআ সব মুসলিমের উপকারে ফিরে আসে; কারণ যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তারা সৎ হলে তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু মানুষের সংশোধনের কারণ হবে এবং তারা তাদের দ্বারা উপকৃত হবে।
«এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন»—অর্থাৎ, হে আমাদের রব! আমাদেরকে এই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিন—আল্লাহর সৎ বান্দাদের মধ্যে সিদ্দীক ও পূর্ণতাপ্রাপ্তদের মর্যাদায়; তা হলো দ্বীনের নেতৃত্বের মর্যাদা, যেখানে তারা মুত্তাকীদের জন্য কথা ও কাজে অনুসরণীয় আদর্শ হবে। তাদের কাজ অনুসরণ করা হবে, তাদের কথায় আস্থা রাখা হবে এবং কল্যাণকামী লোকেরা তাদের পেছনে চলবে; ফলে তারা পথ দেখাবে এবং নিজেরাও সৎপথে পরিচালিত হবে।
জানা কথা যে, কোনো কিছু অর্জনের দোআ করলে তার জন্য অপরিহার্য উপায়গুলোর জন্যও দোআ করা হয়। দ্বীনের নেতৃত্বের এই মর্যাদা ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাস ছাড়া পূর্ণ হয় না। আল্লাহ বলেন: «আর যখন তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল এবং আমার নিদর্শনাবলির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল, তখন আমি তাদের মধ্য থেকে এমন নেতৃবৃন্দ করেছিলাম, যারা আমার আদেশে পথনির্দেশ করত» (সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:২৪)। অতএব, এই দোআতে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা, তাঁর বেদনাদায়ক সিদ্ধান্তে ধৈর্য ধারণ করা এবং এমন পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে, যা মানুষকে দৃঢ় বিশ্বাসের পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।
এতে রয়েছে প্রচুর কল্যাণ ও বিপুল দান; আর রাসূলদের পর সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় উপনীত হওয়ার প্রার্থনাও রয়েছে।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
৭২-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহর সৎ বান্দাদের আরো বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না অর্থাৎ শিরক করে না, মূর্তিপূজা হতে তারা বেঁচে থাকে। তারা মিথ্যা কথা বলে না, পাপাচারে লিপ্ত হয় না, কুফরী করে না, অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে দূরে থাকে, গান শুনে না এবং মুশরিকদের আনন্দ-উৎসবে যোগদান করে। তারা মদ্যপান করে না, মদ্যখানায় যায় না এবং ওর প্রতি আকৃষ্ট হয় না। যেমন হাদীসে এসেছে যে, যে আল্লাহর উপর ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন ঐ দস্তরখানায় না বসে যেখানে মদচক্র চলতে থাকে।
আবার ভাবার্থ এও হয় যে, তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না । হযরত আবু বুকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় পাপের খবর দেবো না?” এ কথা তিনি তিনবার বলেন। সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!
হা (খবর দিন)।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলো আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।” তখন পর্যন্ত তিনি বালিশে হেলান লাগিয়েছিলেন। এরপর তিনি সোজা হয়ে বসেন এবং বলেনঃ “আর মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।” এ কথা তিনি বারবার বলতে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত সাহাবীগণ মনে মনে বললেন যে, যদি তিনি নীরব হতেন! (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে) কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এ অর্থই বেশী প্রকাশমান যে, তারা মিথ্যার কাছেও যায় না। এ জন্যেই পরে বর্ণিত হয়েছে যে, ঘটনাক্রমে তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হলে স্বীয় মর্যাদার সাথে তারা তা পরিহার করে চলে। ইবরাহীম ইবনে মাইসার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) কোন খেলার পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন।
সেখানে তিনি না থেমে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলতে থাকেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট মর্যাদাবান হয়ে গেলেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আল্লাহ তা'আলার এই বুযর্গ বান্দাদের আর একটি গুণ এই যে, কুরআনের আয়াতগুলো শুনে তাদের অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং তাদের ঈমান এবং আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু কাফিরদের এরূপ হয় না।
কুরআনের আয়াতসমূহ তাদের অন্তরে ক্রিয়াশীল হয়। সুতরাং তারা তাদের দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকে না, কুফরী পরিত্যাগ করে না এবং ঔদ্ধত্যপনা, হঠকারিতা এবং অজ্ঞতা হতে বিরত হয় না। পক্ষান্তরে ঈমানদারদের ঈমান বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। আর যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তাদের ব্যাধি আরো বেড়ে যায়।
অতএব, কাফিররা আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে বধির ও অন্ধ হয়। মুমিনদের অভ্যাস এর বিপরীত। তারা হক হতে বধিরও নয় এবং অন্ধও নয়। তারা শুনে ও বুঝে। আর এর দ্বারা তারা উপকার লাভ করে এবং নিজেদেরকে সংশোধিত করে নেয়। বহু লোক এমন রয়েছে যারা পাঠ করে, অথচ নিজেদের বধিরতা ও অন্ধত্ব পরিত্যাগ করে না।
হযরত শা’বী (রঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ “একটি লোক এসে দেখে যে, কতকগুলো লোক সিজদায় পড়ে রয়েছে, কিন্তু তারা কোন আয়াতটি পড়ে সিজদায় পড়েছে তা তার জানা নেই। এমতাবস্থায় লোকটি কি তাদের সাথে সিজদায় পড়ে যাবে?” তখন হযরত শা’বী (রঃ) এ আয়াতটিই পাঠ করেন। অর্থাৎ সে তাদের সাথে সিজদা করবে না।
কেননা, সে সিজদার আয়াত পাঠ করেনি, শুনেনি এবং বুঝেনি। আর কোন কাজ অন্ধভাবে করা মুমিনের উচিত নয়। যখন পর্যন্ত তার সামনে কোন জিনিসের হাকীকত না থাকবে তখন পর্যন্ত ভার তাতে শামিল হওয়া ঠিক নয়। অতঃপর এই বুযর্গ বান্দাদের একটি দু'আর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করে- হে আমাদের প্রতিপালক!
আমাদের জন্যে এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের জন্যে নয়ন প্রীতিকর হয়। অর্থাৎ তারা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যে, তাদের সন্তান-সন্ততিও যেন তাদের মত একত্ববাদী হয় এবং মুশরিক না হয়, যাতে দুনিয়াতেও ঐ সুসন্তানদের কারণে তাদের অন্তর ঠাণ্ডা থাকে এবং আখিরাতেও তাদের ভাল অবস্থা দেখে তারা খুশী হতে পারে। এই প্রার্থনার উদ্দেশ্য তাদের দৈহিক সৌন্দর্য নয়, বরং সততা ও সুন্দর চরিত্রই উদ্দেশ্য। মুসলমানদের প্রকৃত আনন্দ এতেই রয়েছে যে, তারা তাদের সন্তানদেরকে ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে আল্লাহর অনুগত বান্দারূপে দেখতে পায়।
তারা যেন যালিম না হয়, দুষ্কৃতিকারী না হয়, বরং খাটি মুসলমান হয়। হযরত নুফায়ের (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ আমরা একদা হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ)-এর নিকট বসেছিলাম, এমন সময় একটি লোক তার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। সে বলেঃ “তাঁর দু’চক্ষুর জন্যে মুবারকবাদ, যে চক্ষুদ্বয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দর্শন করেছে! আপনি যেমন তাঁকে দেখেছেন ও তাঁর সঙ্গ লাভ করেছেন তেমনই যদি আমরাও তাঁকে দেখতাম ও তাঁর সাহচর্য লাভ করতাম তবে আমাদের জীবনকে আমরা ধন্য মনে করতাম!”
তার এ কথা শুনে হযরত মিকদাদ (রাঃ) অসন্তুষ্ট হলেন। আমি বিস্মিত হলাম যে, লোকটি তো মন্দ কথা বলেনি, অথচ তিনি অসন্তুষ্ট হলেন কেন! ইতিমধ্যে হযরত মিকদাদ (রাঃ) বললেনঃ “জনগণের কি হয়েছে যে, তারা এমন কিছুর আকাক্ষা করে যা তাদের শক্তির বাইরে এবং যা আল্লাহ তাআলা তাদেরকে প্রদান করেননি? তারা ঐ সময় থাকলে তবে তাদের অবস্থা কি হতো তা আল্লাহই ভাল জানেন।
আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে তো ঐসব লোকও ছিল যারা না তাঁকে বিশ্বাস করেছে এবং না তাঁর আনুগত্য করেছে। ফলে তারা উল্টো মুখে জাহান্নামে চলে গেছে। তোমরা কি আল্লাহর এ অনুগ্রহ স্বীকার কর না যে, তিনি ইসলামে ও মুসলমান ঘরে তোমাদের জন্ম দিয়েছেন?
ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই তোমাদের কানে আল্লাহর তাওহীদ ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর রিসালাতের শব্দ পৌঁছেছে। আর ঐসব বিপদ-আপদ থেকে তোমাদেরকে বাঁচিয়ে নেয়া হয়েছে যেগুলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর পতিত হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এমন যুগে প্রেরণ করেন যখন দুনিয়ার অবস্থা ছিল খুবই শশাচনীয়। ঐ সময় দুনিয়াবাসীদের নিকট মূর্তিপূজা অপেক্ষা উত্তম ধর্ম আর কিছুই ছিল না।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফুরকান নিয়ে আসলেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি করলো এবং এর ফলে পিতা ও পুত্র পৃথক পৃথক হয়ে গেল। মুসলমানরা তাদের পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র এবং বন্ধু-বান্ধবদেরকে কুফরীর উপর দেখে তাদের উপর থেকে তাদের প্রেম-প্রীতি ও শ্রদ্ধা লোপ পায় এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তারা সব জাহান্নামী। এ জন্যেই তাদের প্রার্থনা ছিলঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের জন্যে নয়ন প্রীতিকর হয়।
কেননা, কাফিরদেরকে দেখে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হতো না। এই প্রার্থনার শেষে রয়েছেঃ “আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শ স্বরূপ করুন। আমরা যেন তাদেরকে পুণ্যকর্মের শিক্ষা দিতে পারি। তারা যেন ভাল কাজে আমাদের অনুসারী হয়। আমাদের সন্তানরা যেন আমাদের পথ অনুসরণ করে, যাতে পুণ্য বৃদ্ধি পায় এবং তাদের পুণ্যের কারণও যেন আমরা হয়ে যাই।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আদম সন্তান যখন মারা যায় তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, শুধু তিনটি আমল বাকী থাকে। প্রথম হলো সুসন্তান, যে তার জন্যে প্রার্থনা করে, দ্বিতীয় হলো সেই ইল্ম যার দ্বারা তার মৃত্যুর পরে মানুষ উপকৃত হয় এবং তৃতীয় হলো সাদকায়ে জারিয়া (এগুলোর সওয়াব সে মৃত্যুর পরেও পেয়ে থাকে)।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
আল-বাগাভির তাফসির
«আর যারা বলে: হে আমাদের রব! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে… দান করুন»—আবু আমর, আল-কিসাঈ ও আবু বকর ‘আলিফ’ ছাড়া (ذُرِّيَّتِنَا) পড়েছেন। অন্যরা বহুবচন বোঝাতে ‘আলিফ’সহ পড়েছেন।
«চোখের প্রশান্তি»—অর্থাৎ, সৎ ও মুত্তাকী সন্তান; তারা বলে, ‘তাদের সৎ করে দিন, তাহলে তাদের কারণে আমাদের চোখ জুড়াবে।’ আল-কুরাযী বলেছেন: মুমিনের চোখের জন্য তার স্ত্রী ও সন্তানদের আল্লাহ—মহামহিমান্বিত—এর অনুগত দেখা অপেক্ষা অধিক প্রশান্তিদায়ক আর কিছু নেই। আল-হাসানও এ কথা বলেছেন। এখানে «قُرَّة» একবচনে এসেছে, কারণ এটি মাসদার [ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য]।
এর মূল অর্থ শীতলতা; কেননা আরবরা গরমে কষ্ট পায় এবং শীতলতায় স্বস্তি খোঁজে। আনন্দের সময় «চোখের শীতলতা» এবং দুঃখের সময় «চোখের উত্তাপ» বলা হয়। আরও বলা হয়, আনন্দের সময় চোখের অশ্রু ঠান্ডা হয়, আর দুঃখের সময় গরম হয়। আল-আযহারী বলেছেন: «চোখের প্রশান্তি»র অর্থ, তার হৃদয় এমন কাউকে পায় যাকে সে পছন্দ করে; ফলে তার চোখ তাকে দেখেই তৃপ্ত হয় এবং অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করে না।
«এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন»—অর্থাৎ, আমাদেরকে এমন নেতা বানান, যাদের অনুসরণ করে মানুষ কল্যাণের পথে চলে। এখানে «ইমাম» একবচনে বলা হয়েছে, «আইম্মাহ» [নেতৃবৃন্দ] বলা হয়নি; যেমন আল্লাহর বাণী: «নিশ্চয়ই আমরা বিশ্বজগতের রবের রাসূল» (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:১৬)। বলা হয়েছে, এখানে «আইম্মাহ» বোঝানো হয়েছে; যেমন আল্লাহর বাণী: «তারা আমার শত্রু» (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৭৭)—অর্থাৎ, শত্রুরা। আরবরা বলে: ‘আমাদের আমির এরা’, অর্থাৎ, ‘আমাদের আমিররা এরা’।
আরও বলা হয়েছে, এটি সিয়াম ও কিয়ামের মতো মাসদার; বলা হয় «أمَّ إمامًا», যেমন বলা হয় «قام قيامًا» এবং «صام صيامًا»।
আল-হাসান বলেছেন: আমরা মুত্তাকীদের অনুসরণ করি, আর মুত্তাকীরা আমাদের অনুসরণ করে। ইবন আব্বাস বলেছেন: আমাদেরকে সৎপথের দিশারি নেতা বানান—যেমন আল্লাহ বলেছেন: «আমি তাদের মধ্য থেকে এমন নেতৃবৃন্দ করেছিলাম, যারা আমার আদেশে পথনির্দেশ করত» (সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:২৪)। আর আমাদেরকে ভ্রষ্টতার নেতা বানাবেন না—যেমন তিনি বলেছেন: «আমি তাদের এমন নেতা করেছিলাম, যারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করত» (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৪১)। আরও বলা হয়েছে, এখানে শব্দের বিন্যাস উল্টানো হয়েছে; অর্থাৎ, ‘মুত্তাকীদের আমাদের নেতা বানান এবং আমাদেরকে তাদের অনুসারী ও অনুকরণকারী বানান।’ এটি মুজাহিদের মত।
«সহীহ আল-বুখারী» (নং ৫০৬৫)-তে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে: «দুনিয়ার জীবন হলো সাময়িক ভোগের উপকরণ; আর এর উপকরণগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হলো সৎ স্ত্রী»।