দোয়া 07 তওবা ও ক্ষমা 29 মিনিট পড়তে

ক্ষমা ও সাহায্যের প্রার্থনা

মুমিনরা 2:285–286
আরবি পাঠ

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ، وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ، وَقَالُوا سَمِعْنَا، وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ. رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ، وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ. رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا، إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا. رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا. رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ، وَاعْفُ عَنَّا، وَاغْفِرْ لَنَا، وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا، فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। البقرة 2:285–286
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Ghufrānaka rabbanā wa ilayka al-maṣīr. Lā yukallifu Allāhu nafsan illā wus‘ahā, lahā mā kasabat wa ‘alayhā ma iktasabat. Rabbanā lā tu’ākhidhnā in nasīnā aw akhṭa’nā. Rabbanā wa lā taḥmil ‘alaynā iṣran kamā ḥamaltahu ‘alā alladhīna min qablinā. Rabbanā wa lā tuḥammilnā mā lā ṭāqata lanā bih. Wa‘fu ‘annā, waghfir lanā, warḥamnā. Anta mawlānā fanṣurnā ‘alā al-qawmi al-kāfirīn.
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

রসূল (সাঃ) তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা তার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তাতে ঈমান এনেছে এবং মু’মিনগণও। তারা সবাই আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর এবং রসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, (তারা বলে), ‘আমরা রসূলগণের মধ্যে কারও ব্যাপারে তারতম্য করি না’ এবং তারা এ কথাও বলে যে, ‘আমরা শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা কর আর প্রত্যাবর্তন তোমারই দিকে’। আল্লাহ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না, সে ভাল যা করেছে সে তার সওয়াব পাবে এবং স্বীয় মন্দ কৃতকর্মের জন্য সে নিজেই নিগ্রহ ভোগ করবে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তাহলে আমাদেরকে পাকড়াও করো না, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের আগের লোকেদের উপর যেমন গুরু-দায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না; হে আমাদের প্রতিপালক! যে ভার বহনের ক্ষমতা আমাদের নেই, এমন ভার আমাদের উপর চাপিয়ে দিও না, (ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করে) আমাদেরকে রেহাই দাও, আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর; তুমিই আমাদের প্রতিপালক, কাজেই আমাদেরকে কাফিরদের উপর জয়যুক্ত কর।

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

গঠন: ‘গুফরানাকা’ (غُفْرَانَكَ—আমরা তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করি) একটি মাসদার, যা অর্থে ক্রিয়ার স্থলাভিষিক্ত। এর পরে এসেছে নিষেধসূচক রূপ ‘লা তু’আখিজনা’ (لَا تُؤَاخِذْنَا) এবং প্রার্থনাসূচক রূপ ‘ওয়া‘ফু ‘আন্না’ (وَاعْفُ عَنَّا)। এটি সূরা আল-বাকারার শেষের দুটি মহিমান্বিত আয়াত।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

যখন আল্লাহর বাণী—“তোমরা তোমাদের অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করো অথবা গোপন রাখো, আল্লাহ সে সম্পর্কে তোমাদের হিসাব নেবেন”[সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৪]—অবতীর্ণ হলো, তখন মুসলিমদের জন্য তা কঠিন মনে হলো। কারণ তারা আশঙ্কা করলেন, অন্তরে স্থায়ীভাবে বা সাময়িকভাবে উদিত হওয়া নানা চিন্তার জন্যও তাদের পাকড়াও করা হবে। তখন আল্লাহ এই আয়াতে জানিয়ে দিলেন: “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না”; অর্থাৎ এমন দায়িত্ব দেন না, যা তার সামর্থ্যের মধ্যে নেই বা তার জন্য কষ্টকর। যেমন আল্লাহ বলেছেন: “তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি”[সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮]।

আদেশ ও নিষেধের মূল বিষয়গুলো মানুষের জন্য কষ্টকর নয়; বরং সেগুলো আত্মার খাদ্য, দেহের ওষুধ এবং ক্ষতিকর বিষয় থেকে রক্ষার উপায়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহবশতই তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এরপরও যখন এমন কোনো ওজর দেখা দেয়, যাতে কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন তিনি বিধান সহজ করে দেন—হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছ থেকে তা সম্পূর্ণ তুলে নেন, অথবা তার কিছু অংশ লাঘব করেন; যেমন অসুস্থ, মুসাফির এবং অন্যদের ক্ষেত্রে সহজীকরণ করা হয়েছে।

এরপর আল্লাহ জানিয়েছেন, প্রত্যেক ব্যক্তি যে সৎকর্ম অর্জন করে, তার প্রতিদান সে পাবে; আর যে মন্দকর্ম করে, তার দায় তারই ওপর বর্তাবে। অতএব, কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না, আর বান্দার সৎকর্ম অন্য কারও কাছে চলে যাবে না। কল্যাণের ক্ষেত্রে ‘কাসাবা’ (كَسَبَ—অর্জন করেছে) শব্দটি এসেছে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সামান্য প্রচেষ্টাতেই, এমনকি শুধু অন্তরের নিয়তের মাধ্যমেও মানুষ কল্যাণের কাজের প্রতিদান পেতে পারে।

আর মন্দকর্মের ক্ষেত্রে ‘ইকতাসাবা’ (اكْتَسَبَ—অর্জন করেছে) শব্দ এসেছে, যা বোঝায় যে, মানুষ তা বাস্তবে সম্পাদন করে চেষ্টা না করা পর্যন্ত তার নামে মন্দকর্ম লেখা হয় না।

আল্লাহ যখন জানালেন যে, রাসূল ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনরা ঈমান এনেছেন এবং প্রত্যেক কর্মী তার কাজের প্রতিফল পাবে, তখন তিনি এ-ও জানালেন যে, মানুষ কর্তব্যে ত্রুটি, ভুল ও বিস্মৃতির শিকার হতে পারে এবং তিনি আমাদের সাধ্য ও শক্তির মধ্যে থাকা বিষয় ছাড়া অন্য কিছুর দায়িত্ব দেন না। এরপর তিনি মুমিনদের এ বিষয়ে প্রার্থনার কথা উল্লেখ করলেন। নবী ﷺ জানিয়েছেন, আল্লাহ এই দোয়ার জবাবে বলেছেন: “আমি তা কবুল করেছি।” মুমিনরা বললেন: “হে আমাদের প্রতিপালক!

আমরা যদি ভুলে যাই অথবা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করো না।” বিস্মৃতি ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য হলো: বিস্মৃতি হচ্ছে, অন্তর থেকে আদেশের কথা হারিয়ে যাওয়ায় তা ভুলে ছেড়ে দেওয়া; আর ভুল হচ্ছে, এমন কোনো কাজ করার ইচ্ছা করা যা করা বৈধ, কিন্তু কাজটি এমনভাবে ঘটে যাওয়া যা করা বৈধ নয়। আল্লাহ এই উম্মতের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করে এ দুই অবস্থায় সংঘটিত কাজের জন্য তাদের ক্ষমা করেছেন।

সুতরাং কেউ যদি অন্যায়ভাবে দখল করা বা নাপাক কাপড় পরে নামাজ পড়ে, অথবা নিজের শরীরে নাপাকি থাকার কথা ভুলে যায়, কিংবা নামাজে ভুলে কথা বলে, অথবা ভুলে রোজা ভঙ্গকারী কোনো কাজ করে, কিংবা ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলোর এমন কোনো কাজ করে যাতে কোনো বস্তু নষ্ট হয় না—তবে তাকে ক্ষমা করা হবে। একইভাবে, কসমের বিষয়টি ভুলে করে ফেললে তার কসম ভঙ্গ হবে না। আর ভুলবশত কাউকে হত্যা করলে বা কোনো সম্পদ নষ্ট করলে গুনাহ হবে না; তবে শুধু ক্ষতিসাধনের কারণে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তদ্রূপ, যেসব ক্ষেত্রে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা আবশ্যক, সেখানে কেউ ভুলে তা না বললে তার কোনো ক্ষতি হবে না।

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন ভার চাপিয়ে দিও না”—অর্থাৎ কষ্টকর দায়িত্ব চাপিয়ে দিও না—“যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছিলে।” আল্লাহ এই উম্মতের জন্য পবিত্রতা অর্জন ও ইবাদতের বিধানে এমন কিছু সহজ করেছেন, যা অন্য উম্মতদের জন্য সহজ করেননি। “হে আমাদের প্রতিপালক!

আমাদের ওপর এমন ভার দিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই”—আল্লাহ তা করেছেন; সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। “আমাদের অপরাধ মাফ করো, আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো।” ক্ষমা ও মার্জনার মাধ্যমে বিপদ ও অকল্যাণ দূর হয়, আর রহমতের মাধ্যমে বিষয়সমূহ সঠিক ও সুন্দর হয়।

“তুমিই আমাদের অভিভাবক”—অর্থাৎ তুমিই আমাদের প্রতিপালক, অধিপতি ও উপাস্য; আমাদের অস্তিত্ব দেওয়া ও সৃষ্টি করার পর থেকে তোমার অভিভাবকত্ব আমাদের ওপর অব্যাহত রয়েছে। তোমার নিয়ামত প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের ওপর প্রবাহিত ও অবিরাম। এরপর তুমি আমাদের ইসলাম নামক মহামূল্যবান নিয়ামত ও বিরাট অনুগ্রহ দান করেছ, যার অধীনেই অন্যান্য সব নিয়ামত। তাই হে আমাদের প্রতিপালক ও অভিভাবক, আমরা তোমার কাছে তোমার নিয়ামত পূর্ণ করার আবেদন করি—কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করে।

তারা তোমাকে ও তোমার রাসূলদের অস্বীকার করেছে, তোমার দ্বীনের অনুসারীদের বিরোধিতা করেছে এবং তোমার আদেশ পরিত্যাগ করেছে। যুক্তি ও প্রমাণ এবং তরবারি ও বর্শার সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় দাও; পৃথিবীতে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করো, তাদের লাঞ্ছিত করো এবং আমাদের এমন ঈমান ও সৎকর্ম দান করো যার মাধ্যমে বিজয় অর্জিত হয়। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। আল্লাহর সাহায্য ও তাওফিকে সূরা আল-বাকারার তাফসির সমাপ্ত হলো। মুহাম্মদের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

আল্লাহ তাঁর রাসূল ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনদের ঈমান, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের কথা জানিয়েছেন; একই সঙ্গে তাঁরা তাঁর কাছে ক্ষমাও প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁরা আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান এনেছেন। এর অন্তর্ভুক্ত হলো—আল্লাহ নিজের সম্পর্কে যা জানিয়েছেন এবং তাঁর রাসূলগণ আল্লাহর সম্পর্কে যা জানিয়েছেন, তাঁর পূর্ণতার গুণাবলি ও মহিমার বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রতি সামগ্রিক ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনা; তাঁকে সৃষ্টির সদৃশ করা, তাঁর গুণাবলি অস্বীকার করা এবং সব ধরনের অপূর্ণতা থেকে তাঁকে পবিত্র গণ্য করা।

এর অন্তর্ভুক্ত আরও হলো, শরিয়তে যেসব ফেরেশতার কথা সামগ্রিকভাবে ও বিশদভাবে এসেছে তাঁদের প্রতি ঈমান আনা, এবং সব রাসূল ও কিতাবের প্রতি ঈমান আনা—অর্থাৎ রাসূলগণ যে সংবাদ দিয়েছেন এবং কিতাবসমূহে যে সংবাদ, আদেশ ও নিষেধ রয়েছে, সবকিছুর প্রতি ঈমান আনা। তারা রাসূলদের কারও মধ্যে পার্থক্য করে না; বরং তাঁদের সবাইকে বিশ্বাস করে। কারণ তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যকার মাধ্যম। তাঁদের কারও প্রতি কুফর করা মানে সকলের প্রতি কুফর করা; বরং তা আল্লাহর প্রতিই কুফর।

“তারা বলে, ‘আমরা শুনেছি’”—তুমি আমাদের যা আদেশ করেছ এবং যা থেকে নিষেধ করেছ, তা শুনেছি; “এবং আনুগত্য করেছি”—সে বিষয়ে তোমার আনুগত্য করেছি। তারা এমন ছিল না যে বলবে, ‘আমরা শুনেছি, কিন্তু অমান্য করেছি।’ বান্দার পক্ষে আল্লাহর হক আদায়ে ত্রুটি হওয়া অবশ্যম্ভাবী, আর তার সর্বদাই আল্লাহর ক্ষমার প্রয়োজন। তাই তারা বলল: “তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করি”—অর্থাৎ আমাদের কাছ থেকে যে ত্রুটি ও পাপ হয়েছে, তার জন্য আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই এবং আমাদের যে দোষত্রুটি রয়েছে তা মুছে দেওয়ার আবেদন করি।

“আর তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন”—অর্থাৎ সব সৃষ্টির প্রত্যাবর্তন তোমারই কাছে; তুমি তাদের কাজ অনুযায়ী ভালো ও মন্দের প্রতিদান দেবে।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

২৮৫-২৮৬ নং আয়াতের তাফসীর এই আয়াত দু'টির ফযীলতের বহু হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াত দু'টি রাত্রে পাঠ করবে তার জন্যে এ দু'টোই যথেষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াত দু'টি আমাকে আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। আমার পূর্বে কোন নবীকে এ দু'টো দেয়া হয়নি।'

সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, যখন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে। মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি সপ্তম আকাশে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছেন,যে জিনিস আকাশের দিকে উঠে যায় তা এই স্থান পর্যন্ত পৌছে থাকে ও এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয় এবং যে জিনিস উপর থেকে নেমে আসে ওটাও এখন পর্যন্তই পৌছে থাকে। অতঃপর এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয়। ঐ স্থানটিকে সোনার ফড়িং ঢেকে রেখেছিল।

তথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনটি জিনিস দেয়া হয়-(১) পাঁচ ওয়াক্ত নামায। (২) সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং (৩) একত্ববাদীদের সমস্ত পাপের ক্ষমা। মুসনাদ -ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উকবা বিন আমির (রাঃ)-কে বলেনঃ সূরা-ই-বাকারার এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে থাকবে। আমাকে এ দুটো আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে।

তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই গ্রন্থেই রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাদেরকে লোকদের উপর তিনটি ফযীলত দেয়া হয়েছে। সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াতগুলো আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। এ দুটো আমার পূর্বে আর কাউকেও দেয়া হয়নি। এবং আমার পরেও আর কাউকেও দেয়া হবে।'

ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার জানা নেই যে, ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান রয়েছে এরূপ লোকেদের মধ্যে কেউ আয়াতুল কুরসী এবং সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি না পড়েই শুয়ে যায়। এটা এমন একটি ধনভাণ্ডার যা তোমাদের নবী (সঃ)-কে আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে।' জামে তিরমিযী শরীফে একটি হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দু'হাজার বছর পূর্বে একটি কিতাব লিখেছিলেন। যার মধ্যে দু'টি আয়াত অবতীর্ণ করে সূরা-ই-বাকারা শেষ করেন।

যেই বাড়ীতে তিন রাত্রি পর্যন্ত এই আয়াত দু’টি পাঠ করা হবে শয়তান সেই বাড়ীর নিকটেও যেতে পারবে না। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। কিন্তু হাকীম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাকের মধ্যে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং আয়াতুল কুরসী পাঠ করতেন তখন তিনি হেসে উঠে বলতেনঃ ‘এই দু'টো রহমানের (আল্লাহর) আরশের নীচের ধন ভাণ্ডার।

যখন তিনি (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে।( আরবি) অর্থাৎ মানুষ যা চেষ্টা করেছে তাই তার জন্যে রয়েছে অর্থাৎ নিশ্চয় তার চেষ্টার ফল তাকে সত্বরই দেখানো হবে অর্থাৎ অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। (৫৩:৩৯-৪১) এই আয়াতগুলো পাঠ করতেন তখন তাঁর মুখ দিয়ে (আরবি) অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী’ আয়াতটি বেরিয়ে যেতো এবং তিনি বিষন্ন হয়ে পড়তেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমাকে সূরা-ই-ফাতিহা এবং সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি আরশের নিম্নদেশ হতে দেয়া হয়েছে এবং মুফাসসাল সূরাগুলো অতিরিক্ত।

হযরত ইবনে আব্বাস। (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এবং হযরত জিবরাঈলও (আঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। এমন সময় আকাশ হতে এক ভয়াবহ শব্দ আসে। হ্যরত জিবরাঈল (আঃ) উপরের দিকে চক্ষু উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেল যা আজ পর্যন্ত কোন দিন খুলেনি।

তথা হতে এক ফেরেশতা অবতরণ করেন এবং নবী (সঃ)কে বলেনঃ আপনি সন্তোষ প্রকাশ করুন! আপনাকে ঐ দু’টি নূর দেয়া হচ্ছে যা আপনার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। তা হচ্ছে সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি। এগুলোর প্রত্যেকটি অক্ষরের উপর আপনাকে নূর দেয়া হবে।

(সহীহ মুসলিম) সুতরাং এই দশটি হাদীসে এই বরকতপূর্ণ আয়াতগুলোর ফযীলত সম্বন্ধে বর্ণিত হলো। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, রাসূল অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর উপর তার প্রভুর পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপর তিনি ঈমান এনেছেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি ঈমান আনয়নের পূর্ণ হকদার। অন্যান্য মুমিনগণও ঈমান এনেছে।

তারা মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ এক। তিনি অদ্বিতীয়। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই। এই মুমিনরা সমস্ত নবীকেই (আঃ) স্বীকার করে। তারা সমস্ত রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, ঐ আসমানী কিতাবসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে যেগুলো নবীগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল।

তারা নবীদের (আঃ) মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করে না। অর্থাৎ কাউকে মানবে এবং কাউকে মানবে না তা নয়। বরং সকলকেই সত্য বলে স্বীকার করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাঁরা সবাই সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং মানুষকে ন্যায়ের দিকে আহবান করতেন। তবে কোন কোন আহকাম প্রত্যেক নবীর যুগে পরিবর্তিত হতো বটে, এমনকি শেষ পর্যন্ত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়ত সকল শরীয়তকে রহিতকারী হয়ে যায়।

নবী (সঃ) ছিলেন সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসূল। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর শরীয়ত বাকী থাকবে এবং একটি দল তাঁর অনুসরণও করতে থাকবে। তারা স্বীকারও করে আমরা আল্লাহর কালাম শুনলাম এবং তাঁর নির্দেশাবলী আমরা অবনত মস্তকে স্বীকার করে নিলাম। তারা বললো-“হে আমাদের প্রভু!

আপনারই নিকট আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আপনারই নিকট আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।' হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে আপনার ও আপনার অনুসারী উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে।

এই সুযোগে আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন তা গৃহীত হবে এবং তার নিকট যাঞা করুন যে,তিনি যেন সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট না দেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, কোন ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সামর্থের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না। এটা বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ। সাহাবীগণের (রাঃ) মনে যে খটকা এসেছিল এবং আল্লাহ তা'আলা মনের ধারণার জন্যেও যে হিসাব নিবেন তা তাঁদের কাছে যে খুব কঠিন ঠেকেছিল, আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত দ্বারা তা নিরসন করেন।

ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা হিসাব গ্রহণ করবেন বটে, কিন্তু সাধ্যের অতিরিক্ত কার্যের জন্যে তিনি শাস্তি প্রদান করবেন না। কেননা, মনে হঠাৎ কোন ধারণা এসে যাওয়া এটা রোধ করা কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়। বরং হাদীসে তো এটাও এসেছে যে, এরূপ। ধারণাকে খারাপ মনে করাও ঈমানের পরিচায়ক।

নিজ নিজ কর্মের ফল সকলকেই ভোগ করতে হবে। ভাল কাজ করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। এবং মন্দ কাজের ফল মন্দ হবে। অতঃপর আল্লাহ পাক তার বান্দাদেরকে প্রার্থনা শিখিয়ে দিচ্ছেন এবং তা কবুল করারও তিনি অঙ্গীকার করছেন। বান্দা প্রার্থনা করছেঃ হে আমাদের প্রভু!

যদি আমাদের ভ্রম অথবা ক্রটি হয় তজ্জন্য আমাদেরকে ধরবেন না। অর্থাৎ যদি ভুল বশতঃ কোন নির্দেশ পালনে আমরা ব্যর্থ হয়ে থাকি বা কোন মন্দ কাজ করে থাকি অথবা শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ আমাদের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে তবে আমাদেরকে তজ্জন্যে। পাকড়াও না করে দয়া করে ক্ষমা করুন। 'ইতিপূর্বে সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই প্রার্থনার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনআমি এটা কবুল করেছি এবং আমি এটাই করেছি।'

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক যে কাজ করিয়ে নেয়া হয় তজ্জন্যেও ক্ষমা রয়েছে। (ইবনে মাজাহ)।' ‘হে আল্লাহ! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন আমাদের উপর অজ্রপ গুরুভার অর্পণ করবেন না।

আল্লাহ তা'আলা তাদের এই প্রার্থনাও কবুল করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি শান্তিপূর্ণ ও সহজ ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।' ‘হে আমাদের প্রভু! যা আমাদের শক্তির অতীত এরূপ কার্যভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না।'

হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মনের সংকল্প এবং প্রবৃত্তির উপর বিজয় লাভ। এই প্রার্থনার উত্তরেও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে মার্জনা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন।' অর্থাৎ আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন, আমাদের পাপসমূহ মার্জনা করুন, আমাদের অসকার্যাবলী গোপন রাখুন এবং আমাদের উপর সদয় হউন যেন পুনরায় আমাদের দ্বারা আপনার অসন্তুষ্টির কোন কাজ সাধিত না হয়।

এ জন্যে মনীষীদের উক্তি রয়েছে যে, পাপীদের জন্যে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। (১) আল্লাহর ক্ষমা যেন সে শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারে। (২) গোপনীয়তা রক্ষা, যেন সে অপমান ও লাঞ্ছনা হতে রক্ষা পায়। (৩) পবিত্রতা লাভ, যেন সে দ্বিতীয় বার পাপ কার্যে লিপ্ত না হয়।

এর উপরও আল্লাহ তাআলার মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আপনিই আমাদের সাহায্যকারী, আপনার উপরেই আমাদের ভরসা, আপনার নিকটই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি, আপনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। আপনার সাহায্য ছাড়া না আমরা অন্য কারও সাহায্য পেতে পারি, না কোন মন্দ কাজ হতে বিরত থাকতে পারি। আপনি আমাদেরকে ঐ লোকদের উপর সাহায্য করুন যারা আপনার মনোনীত ধর্মের বিরোধী, যারা আপনার একত্বে বিশ্বাসী নয়, যারা আপনার রাসূলের (সঃ) রিসালাতকে অস্বীকার করে, যারা আপনার ইবাদতে অন্যদেরকে অংশীদার করে; হে আল্লাহ!

আপনি আমাদেরকে তাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করুন। আল্লাহ তা'আলা এর উত্তরেও বলেনঃ হাঁ, আমি এটাও করলাম।' হযরত মু'আজ (রাঃ) এই আয়াতটি শেষ করে আমীন বলতেন। (ইবনে জারীর) "

২৮৫-২৮৬ নং আয়াতের তাফসীর এই আয়াত দু'টির ফযীলতের বহু হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াত দু'টি রাত্রে পাঠ করবে তার জন্যে এ দু'টোই যথেষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াত দু'টি আমাকে আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। আমার পূর্বে কোন নবীকে এ দু'টো দেয়া হয়নি।'

সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, যখন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে। মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি সপ্তম আকাশে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছেন,যে জিনিস আকাশের দিকে উঠে যায় তা এই স্থান পর্যন্ত পৌছে থাকে ও এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয় এবং যে জিনিস উপর থেকে নেমে আসে ওটাও এখন পর্যন্তই পৌছে থাকে। অতঃপর এখান হতেই নিয়ে নেয়া হয়। ঐ স্থানটিকে সোনার ফড়িং ঢেকে রেখেছিল।

তথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনটি জিনিস দেয়া হয়-(১) পাঁচ ওয়াক্ত নামায। (২) সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং (৩) একত্ববাদীদের সমস্ত পাপের ক্ষমা। মুসনাদ -ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উকবা বিন আমির (রাঃ)-কে বলেনঃ সূরা-ই-বাকারার এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে থাকবে। আমাকে এ দুটো আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে।

তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই গ্রন্থেই রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমাদেরকে লোকদের উপর তিনটি ফযীলত দেয়া হয়েছে। সূরা-ই-বাকারার শেষের আয়াতগুলো আরশের নীচের ভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে। এ দুটো আমার পূর্বে আর কাউকেও দেয়া হয়নি। এবং আমার পরেও আর কাউকেও দেয়া হবে।'

ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ ‘আমার জানা নেই যে, ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান রয়েছে এরূপ লোকেদের মধ্যে কেউ আয়াতুল কুরসী এবং সুরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি না পড়েই শুয়ে যায়। এটা এমন একটি ধনভাণ্ডার যা তোমাদের নবী (সঃ)-কে আরশের নীচের ধনভাণ্ডার হতে দেয়া হয়েছে।' জামে তিরমিযী শরীফে একটি হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দু'হাজার বছর পূর্বে একটি কিতাব লিখেছিলেন। যার মধ্যে দু'টি আয়াত অবতীর্ণ করে সূরা-ই-বাকারা শেষ করেন।

যেই বাড়ীতে তিন রাত্রি পর্যন্ত এই আয়াত দু’টি পাঠ করা হবে শয়তান সেই বাড়ীর নিকটেও যেতে পারবে না। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। কিন্তু হাকীম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাকের মধ্যে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াতগুলো এবং আয়াতুল কুরসী পাঠ করতেন তখন তিনি হেসে উঠে বলতেনঃ ‘এই দু'টো রহমানের (আল্লাহর) আরশের নীচের ধন ভাণ্ডার।

যখন তিনি (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে।( আরবি) অর্থাৎ মানুষ যা চেষ্টা করেছে তাই তার জন্যে রয়েছে অর্থাৎ নিশ্চয় তার চেষ্টার ফল তাকে সত্বরই দেখানো হবে অর্থাৎ অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। (৫৩:৩৯-৪১) এই আয়াতগুলো পাঠ করতেন তখন তাঁর মুখ দিয়ে (আরবি) অর্থাৎ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী’ আয়াতটি বেরিয়ে যেতো এবং তিনি বিষন্ন হয়ে পড়তেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)-এর গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমাকে সূরা-ই-ফাতিহা এবং সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি আরশের নিম্নদেশ হতে দেয়া হয়েছে এবং মুফাসসাল সূরাগুলো অতিরিক্ত।

হযরত ইবনে আব্বাস। (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এবং হযরত জিবরাঈলও (আঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। এমন সময় আকাশ হতে এক ভয়াবহ শব্দ আসে। হ্যরত জিবরাঈল (আঃ) উপরের দিকে চক্ষু উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেল যা আজ পর্যন্ত কোন দিন খুলেনি।

তথা হতে এক ফেরেশতা অবতরণ করেন এবং নবী (সঃ)কে বলেনঃ আপনি সন্তোষ প্রকাশ করুন! আপনাকে ঐ দু’টি নূর দেয়া হচ্ছে যা আপনার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। তা হচ্ছে সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই-বাকারার শেষ আয়াত দু'টি। এগুলোর প্রত্যেকটি অক্ষরের উপর আপনাকে নূর দেয়া হবে।

(সহীহ মুসলিম) সুতরাং এই দশটি হাদীসে এই বরকতপূর্ণ আয়াতগুলোর ফযীলত সম্বন্ধে বর্ণিত হলো। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, রাসূল অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর উপর তার প্রভুর পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপর তিনি ঈমান এনেছেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি ঈমান আনয়নের পূর্ণ হকদার। অন্যান্য মুমিনগণও ঈমান এনেছে।

তারা মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ এক। তিনি অদ্বিতীয়। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নেই এবং তিনি ছাড়া কেউ পালনকর্তাও নেই। এই মুমিনরা সমস্ত নবীকেই (আঃ) স্বীকার করে। তারা সমস্ত রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, ঐ আসমানী কিতাবসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে যেগুলো নবীগণের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল।

তারা নবীদের (আঃ) মধ্যে কোন পার্থক্য আনয়ন করে না। অর্থাৎ কাউকে মানবে এবং কাউকে মানবে না তা নয়। বরং সকলকেই সত্য বলে স্বীকার করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাঁরা সবাই সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং মানুষকে ন্যায়ের দিকে আহবান করতেন। তবে কোন কোন আহকাম প্রত্যেক নবীর যুগে পরিবর্তিত হতো বটে, এমনকি শেষ পর্যন্ত শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর শরীয়ত সকল শরীয়তকে রহিতকারী হয়ে যায়।

নবী (সঃ) ছিলেন সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসূল। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর শরীয়ত বাকী থাকবে এবং একটি দল তাঁর অনুসরণও করতে থাকবে। তারা স্বীকারও করে আমরা আল্লাহর কালাম শুনলাম এবং তাঁর নির্দেশাবলী আমরা অবনত মস্তকে স্বীকার করে নিলাম। তারা বললো-“হে আমাদের প্রভু!

আপনারই নিকট আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আপনারই নিকট আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।' হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখানে আপনার ও আপনার অনুসারী উম্মতের প্রশংসা করা হচ্ছে।

এই সুযোগে আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন তা গৃহীত হবে এবং তার নিকট যাঞা করুন যে,তিনি যেন সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্ট না দেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, কোন ব্যক্তিকেই আল্লাহ তার সামর্থের অতিরিক্ত কর্তব্য পালনে বাধ্য করেন না। এটা বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ। সাহাবীগণের (রাঃ) মনে যে খটকা এসেছিল এবং আল্লাহ তা'আলা মনের ধারণার জন্যেও যে হিসাব নিবেন তা তাঁদের কাছে যে খুব কঠিন ঠেকেছিল, আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত দ্বারা তা নিরসন করেন।

ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা হিসাব গ্রহণ করবেন বটে, কিন্তু সাধ্যের অতিরিক্ত কার্যের জন্যে তিনি শাস্তি প্রদান করবেন না। কেননা, মনে হঠাৎ কোন ধারণা এসে যাওয়া এটা রোধ করা কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়। বরং হাদীসে তো এটাও এসেছে যে, এরূপ। ধারণাকে খারাপ মনে করাও ঈমানের পরিচায়ক।

নিজ নিজ কর্মের ফল সকলকেই ভোগ করতে হবে। ভাল কাজ করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। এবং মন্দ কাজের ফল মন্দ হবে। অতঃপর আল্লাহ পাক তার বান্দাদেরকে প্রার্থনা শিখিয়ে দিচ্ছেন এবং তা কবুল করারও তিনি অঙ্গীকার করছেন। বান্দা প্রার্থনা করছেঃ হে আমাদের প্রভু!

যদি আমাদের ভ্রম অথবা ক্রটি হয় তজ্জন্য আমাদেরকে ধরবেন না। অর্থাৎ যদি ভুল বশতঃ কোন নির্দেশ পালনে আমরা ব্যর্থ হয়ে থাকি বা কোন মন্দ কাজ করে থাকি অথবা শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ আমাদের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে তবে আমাদেরকে তজ্জন্যে। পাকড়াও না করে দয়া করে ক্ষমা করুন। 'ইতিপূর্বে সহীহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এই প্রার্থনার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনআমি এটা কবুল করেছি এবং আমি এটাই করেছি।'

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক যে কাজ করিয়ে নেয়া হয় তজ্জন্যেও ক্ষমা রয়েছে। (ইবনে মাজাহ)।' ‘হে আল্লাহ! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেরূপ গুরুভার অর্পণ করেছিলেন আমাদের উপর অজ্রপ গুরুভার অর্পণ করবেন না।

আল্লাহ তা'আলা তাদের এই প্রার্থনাও কবুল করেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি শান্তিপূর্ণ ও সহজ ধর্ম নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।' ‘হে আমাদের প্রভু! যা আমাদের শক্তির অতীত এরূপ কার্যভার বহনে আমাদেরকে বাধ্য করবেন না।'

হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মনের সংকল্প এবং প্রবৃত্তির উপর বিজয় লাভ। এই প্রার্থনার উত্তরেও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে মার্জনা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন।' অর্থাৎ আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন, আমাদের পাপসমূহ মার্জনা করুন, আমাদের অসকার্যাবলী গোপন রাখুন এবং আমাদের উপর সদয় হউন যেন পুনরায় আমাদের দ্বারা আপনার অসন্তুষ্টির কোন কাজ সাধিত না হয়।

এ জন্যে মনীষীদের উক্তি রয়েছে যে, পাপীদের জন্যে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। (১) আল্লাহর ক্ষমা যেন সে শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারে। (২) গোপনীয়তা রক্ষা, যেন সে অপমান ও লাঞ্ছনা হতে রক্ষা পায়। (৩) পবিত্রতা লাভ, যেন সে দ্বিতীয় বার পাপ কার্যে লিপ্ত না হয়।

এর উপরও আল্লাহ তাআলার মঞ্জুরী ঘোষিত হয়। আপনিই আমাদের সাহায্যকারী, আপনার উপরেই আমাদের ভরসা, আপনার নিকটই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি, আপনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। আপনার সাহায্য ছাড়া না আমরা অন্য কারও সাহায্য পেতে পারি, না কোন মন্দ কাজ হতে বিরত থাকতে পারি। আপনি আমাদেরকে ঐ লোকদের উপর সাহায্য করুন যারা আপনার মনোনীত ধর্মের বিরোধী, যারা আপনার একত্বে বিশ্বাসী নয়, যারা আপনার রাসূলের (সঃ) রিসালাতকে অস্বীকার করে, যারা আপনার ইবাদতে অন্যদেরকে অংশীদার করে; হে আল্লাহ!

আপনি আমাদেরকে তাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করুন। আল্লাহ তা'আলা এর উত্তরেও বলেনঃ হাঁ, আমি এটাও করলাম।' হযরত মু'আজ (রাঃ) এই আয়াতটি শেষ করে আমীন বলতেন। (ইবনে জারীর) "

আল-বাগাভির তাফসির

আল্লাহর বাণী: “রাসূল তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছেন”—অর্থাৎ তিনি তা সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। “এবং মুমিনরাও। প্রত্যেকেই আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে”—অর্থাৎ তাদের প্রত্যেকেই। এ কারণেই ক্রিয়াটি একবচনে এসেছে।

“তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।” হামযা ও কিসাঈ ‘কিতাবিহি’ (كِتَابِهِ) একবচনে পড়েছেন; এর দ্বারা কুরআন বোঝানো হয়েছে। আবার বলা হয়েছে, একবচন শব্দে উল্লেখ হলেও এর অর্থ বহুবচন; যেমন আল্লাহ বলেছেন: “অতঃপর আল্লাহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে নবীদের পাঠালেন এবং তাঁদের সঙ্গে কিতাব অবতীর্ণ করলেন”[সূরা আল-বাকারা, ২:২১৩]। অন্য পাঠকগণ ‘কুতুবিহি’ (كُتُبِهِ—তাঁর কিতাবসমূহ) বহুবচনে পড়েছেন; যেমন আল্লাহর বাণী: “তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণ”[সূরা আন-নিসা, ৪:১৩৬]।

“আমরা তাঁর রাসূলদের কারও মধ্যে পার্থক্য করি না”—অর্থাৎ আমরা কারও প্রতি ঈমান এনে অন্য কারও প্রতি কুফর করি না, যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা করেছে। এখানে একটি উহ্য বাক্য রয়েছে, যার পূর্ণরূপ: ‘তারা বলে, আমরা পার্থক্য করি না।’ ইয়াকুব ‘লা ইউফাররিকু’ (لَا يُفَرِّقُ—পার্থক্য করেন না) ‘ইয়া’ দিয়ে পড়েছেন; এ ক্ষেত্রে তা রাসূলের সংবাদ হিসেবে এসেছে, অথবা অর্থ হলো, তারা সবাই মিলে কোনো পার্থক্য করে না। এখানে “কারও মধ্যে” বলা হয়েছে, “ব্যক্তিদের মধ্যে” বলা হয়নি; কারণ ‘আহাদ’ (أَحَد) শব্দটি একবচন ও বহুবচন উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

আল্লাহ বলেছেন: “তখন তোমাদের মধ্যে কেউই তাকে ঠেকাতে পারবে না”[সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯:৪৭]।

“তারা বলে, ‘আমরা শুনেছি’”—তোমার বাণী; “এবং আনুগত্য করেছি”—তোমার আদেশ। হাকীম ইবন জাবির সূত্রে জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এই আয়াত অবতীর্ণ হলে জিবরীল (আ.) নবী ﷺ-কে বললেন: “আল্লাহ তোমার ও তোমার উম্মতের প্রশংসা করেছেন। অতএব, তুমি প্রার্থনা করো, তোমাকে দেওয়া হবে।”

তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শিখিয়ে দেওয়া ভাষায় তিনি প্রার্থনা করলেন: “তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করি”—এটি মাসদাররূপে মানসুব; অর্থ: ‘তোমার ক্ষমা করা’ অথবা ‘আমরা তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করি।’

“হে আমাদের প্রতিপালক! আর তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন।” “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।” আয়াতের বাহ্যিক অর্থে প্রয়োজন পূরণের কথা বোঝায়, তবে এর মধ্যে প্রশ্ন বা প্রার্থনার উহ্য অর্থ রয়েছে; যেন তারা বলেছে: ‘আমাদের সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিও না।’

এর উত্তরে বলা হয়েছে: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না; অর্থাৎ তার সামর্থ্য অনুযায়ীই দেন। ‘উস‘’ (وُسْع) হলো এমন পরিমাণ, যা মানুষের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব এবং যা তার জন্য সংকীর্ণ বা কষ্টকর নয়। এর ব্যাখ্যায় মতভেদ রয়েছে। ইবন আব্বাস (রা.), আতা এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে “তোমাদের অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করো অথবা গোপন রাখো”[সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৪]—এই বাণীতে উল্লেখিত অন্তরের কথাই উদ্দেশ্য।

ইবন আব্বাস (রা.) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে, এখানে বিশেষভাবে মুমিনদের বোঝানো হয়েছে: তাদের দ্বীনের বিধান সহজ করা হয়েছে এবং তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। যেমন আল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না”[সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫]; এবং বলেছেন: “তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি”[সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮]।

সুফিয়ান ইবন উয়াইনা-কে আল্লাহর বাণী, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না”—এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “যতটুকু সহজ, তার বেশি নয়; তিনি তাকে তার শক্তির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেননি।” এটি উত্তম ব্যাখ্যা; কারণ ‘উস‘’ হলো সামর্থ্যের চেয়ে কম পরিমাণ।

“সে যা অর্জন করেছে তা তারই প্রাপ্য”—অর্থাৎ আত্মা যে সৎকাজ করেছে, তার প্রতিদান ও সওয়াব তারই। “আর যা মন্দ অর্জন করেছে, তার দায় তারই ওপর।” “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাকড়াও করো না”—অর্থাৎ আমাদের শাস্তি দিও না। “যদি আমরা ভুলে যাই”—কেউ কেউ বলেছেন, এখানে ভুলে যাওয়া বলতে বিস্মৃতি বোঝানো হয়েছে।

কালবি বলেছেন: বনি ইসরাঈল যখন তাদের আদিষ্ট কোনো বিষয় ভুলে যেত অথবা ভুল করত, তখন তাদের শাস্তি ত্বরান্বিত করা হতো; সেই পাপের অনুপাতে তাদের কোনো খাদ্য বা পানীয় নিষিদ্ধ করা হতো। তাই আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিলেন, যেন তারা তাঁর কাছে এ ধরনের পাকড়াও থেকে রেহাই চায়। আবার বলা হয়েছে, এখানে ‘নাসিনা’ (نَسِينَا) বলতে পরিত্যাগ করা বোঝায়; যেমন আল্লাহ বলেছেন: “তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল, তাই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন”[সূরা আত-তাওবা, ৯:৬৭]।

“অথবা আমরা ভুল করি”—কেউ বলেছেন, এর অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবে করা; আরবিতে কেউ ইচ্ছা করে কাজ করলে বলা হয়, ‘সে ভুল করেছে’। আল্লাহ বলেছেন: “তাদের হত্যা করা তো মহাপাপ”[সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩১]। আতা বলেছেন, “যদি আমরা ভুলে যাই অথবা ভুল করি”—এর অর্থ: যদি আমরা না জানি অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে করি। অধিকাংশের মতে, এখানে ভুল বলতে অজ্ঞতা ও অনিচ্ছাকৃত ভুল বোঝানো হয়েছে।

কারণ ইচ্ছাকৃত পাপ ক্ষমাপ্রাপ্ত নয়; তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন, কিন্তু ভুল ক্ষমাপ্রাপ্ত। নবী ﷺ বলেছেন: “আমার উম্মতের কাছ থেকে ভুল, বিস্মৃতি এবং যে কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে, তা ক্ষমা করা হয়েছে।”

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর ভার চাপিয়ে দিও না”—অর্থাৎ এমন ভারী অঙ্গীকার ও চুক্তি দিও না, যা পালন করতে আমরা অক্ষম হয়ে পড়ব এবং তা ভঙ্গ বা পরিত্যাগ করার কারণে তুমি আমাদের শাস্তি দেবে—“যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর চাপিয়েছিলে।” এখানে ইহুদিদের বোঝানো হয়েছে; তারা তা পালন করতে পারেনি, ফলে আল্লাহ তাদের শাস্তি দিয়েছেন। মুজাহিদ, আতা, কাতাদা, সুদ্দি, কালবি এবং অন্যদের এ মত।

এর সমর্থনে আল্লাহর বাণী: “তোমরা কি তা স্বীকার করেছ এবং আমার এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেছ?”[ সূরা আলে ইমরান, ৩:৮১]—অর্থাৎ আমার অঙ্গীকার। আরেকটি মত হলো, আমাদের ওপর আদেশ কঠোর ও কঠিন করে দিও না, যেমন পূর্ববর্তী ইহুদিদের ওপর কঠোর করেছিলে। কারণ আল্লাহ তাদের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছিলেন, যাকাত হিসেবে সম্পদের এক-চতুর্থাংশ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন; তাদের কাপড়ে নাপাকি লাগলে সেই অংশ কেটে ফেলতে হতো; কেউ পাপ করলে পরদিন তার দরজায় পাপের কথা লেখা থাকত—এ ধরনের আরও ভার ও কঠোর বিধান ছিল।

উসমান, আতা, মালিক ইবন আনাস, আবু উবাইদা এবং আরও অনেকে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর সমর্থনে আল্লাহ বলেছেন: “তিনি তাদের ওপর থেকে তাদের বোঝা ও শৃঙ্খলসমূহ নামিয়ে দেন”[সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১৫৭]। আরেকটি মত হলো, ‘ইসর’ (إِصْر) এমন পাপ, যার তাওবা নেই; অর্থাৎ আমাদের সে ধরনের পাপ থেকে রক্ষা করো। শব্দটির মূল অর্থ বাঁধন ও দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করা।

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন ভার দিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই”—অর্থাৎ এমন কাজের দায়িত্ব দিও না, যা আমরা পালন করতে অক্ষম। কেউ বলেছেন, এর দ্বারা মনের ভেতরের কথা ও কুমন্ত্রণা বোঝানো হয়েছে। মাকহুল থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, এর দ্বারা যৌন উত্তেজনা বোঝানো হয়েছে।

কেউ প্রশ্ন করল: যৌন উত্তেজনা কী? তিনি বললেন, তীব্র কামনা। ইবরাহিম বলেছেন, এর অর্থ ভালোবাসা। মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব বলেছেন, এর অর্থ প্রেমাসক্তি। ইবন জুরাইজ বলেছেন, এর অর্থ বানর ও শূকরে রূপান্তরিত হওয়া। কেউ বলেছেন, এর অর্থ শত্রুদের উল্লাস; আবার কেউ বলেছেন, বিচ্ছেদ ও সম্পর্কচ্ছেদ। আমরা আল্লাহর কাছে এগুলো থেকে আশ্রয় চাই।

“আমাদের অপরাধ মাফ করো”—অর্থাৎ আমাদের পাপ উপেক্ষা করো এবং মুছে দাও। “আমাদের ক্ষমা করো”—আমাদের পাপ ঢেকে রাখো, আমাদের লাঞ্ছিত কোরো না। “আমাদের প্রতি দয়া করো”—কারণ তোমার আনুগত্য ছাড়া আমরা সৎকর্ম করতে পারি না, আর তোমার রহমত ছাড়া তোমার অবাধ্যতা ত্যাগ করতে পারি না। “তুমিই আমাদের অভিভাবক”—আমাদের সাহায্যকারী, রক্ষক ও অভিভাবক। “অতএব, কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।”

সাঈদ ইবন জুবাইর, ইবন আব্বাস (রা.) থেকে আল্লাহর বাণী “তোমার ক্ষমা প্রার্থনা করি, হে আমাদের প্রতিপালক”—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ বলেছেন: “আমি তোমাদের ক্ষমা করেছি।” “আমরা যদি ভুলে যাই অথবা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করো না”—এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন: “আমি তোমাদের পাকড়াও করব না।” “হে আমাদের প্রতিপালক!

আমাদের ওপর ভার চাপিয়ে দিও না”—এ সম্পর্কে বলেছেন: “আমি তোমাদের ওপর কোনো ভার চাপাব না।” “আমাদের ওপর এমন ভার দিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই”—এ সম্পর্কে বলেছেন: “আমি তোমাদের ওপর তা চাপাব না।” “আমাদের অপরাধ মাফ করো” থেকে শেষ পর্যন্ত—এ সম্পর্কে বলেছেন: “আমি তোমাদের ক্ষমা করেছি, তোমাদের পাপ ঢেকে রেখেছি, তোমাদের প্রতি দয়া করেছি এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছি।” মুআয ইবন জাবাল সূরা আল-বাকারা শেষ করলে ‘আমীন’ বলতেন।

ইসমাঈল ইবন আবদুল কাহির আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: আবু গাফির ইবন মুহাম্মদ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: মুহাম্মদ ইবন ঈসা আল-জুলুদি আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: ইবরাহিম ইবন মুহাম্মদ ইবন সুফইয়ান আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: আবু বকর ইবন আবি শাইবা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন: আবু উসামা আমাদের বলেছেন: মালিক ইবন মিগওয়াল আমাকে বলেছেন, যুবাইর ইবন আদি থেকে, তিনি তালহা ইবন আলী ইবন মুসাররিফ থেকে, তিনি মুররা থেকে, তিনি আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ইসরা করানো হলে তাঁকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি ষষ্ঠ আসমানে অবস্থিত।

পৃথিবী থেকে যা ওপরে ওঠে, তা সেখানে পৌঁছে; এরপর তা সেখান থেকে গ্রহণ করা হয়। আর তার ওপর থেকে যা নিচে নামে, তা-ও সেখানে এসে পৌঁছে; এরপর তা সেখান থেকে গ্রহণ করা হয়। আল্লাহর বাণী “যখন সিদরাকে আচ্ছন্ন করেছিল, যা তাকে আচ্ছন্ন করেছিল”[সূরা আন-নাজম, ৫৩:১৬]—এ বিষয়ে তিনি বলেন: তা ছিল সোনার প্রজাপতি। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তিনটি জিনিস দেওয়া হয়েছিল: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সূরা আল-বাকারার শেষ আয়াতসমূহ, এবং তাঁর উম্মতের মধ্যে যারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করেনি, তাদের জন্য ধ্বংসকারী মহাপাপসমূহ ক্ষমা করা হয়েছে।

সমর্থনকারী হাদিস

সহিহ মুসলিমে (হাদিস নং ১২৬) ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: একজন ফেরেশতা আকাশ থেকে নেমে এসে নবী ﷺ-কে বললেন: “দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন… এগুলো হলো সূরা আল-ফাতিহা এবং সূরা আল-বাকারার শেষের আয়াতসমূহ।”

ট্যাগ
  • #ক্ষমা প্রার্থনা
  • #আল্লাহর প্রতি ঈমান
  • #সহজীকরণ
  • #দয়া
  • #তাওবা
  • #সূরা আল-বাকারা
  • #কাফিরদের বিরুদ্ধে সাহায্য

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →