যুদ্ধে ধৈর্য ও বিজয়ের প্রার্থনা
رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا، وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا، وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.
رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
যখন তারা জ্বালুত ও তার সৈন্যদের সম্মুখীন হল, তখন বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্যধারণের শক্তি দান কর এবং আমাদের পদগুলো দৃঢ় রেখ এবং কাফির দলের উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত কর’।
রূপকধর্মী ক্রিয়াপদ «আফরিগ» (أَفْرِغْ—প্রচুর পরিমাণে ঢেলে দাও, যেন প্রচণ্ড গরমে পানি ঢেলে দেওয়া হচ্ছে), «সাব্বিত» (ثَبِّتْ—অটল রাখো) এবং «উনসুর» (انْصُرْ—সাহায্য করো, বিজয় দাও) ব্যবহৃত হয়েছে। সংখ্যায় কম, কিন্তু ঈমানদার—এমন এক বাহিনী অধিক শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সময় এই দোয়া করেছিল।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
এ কারণেই, যখন তারা জালুত ও তার সৈন্যদের মুখোমুখি হলো, তখন তারা সবাই বলল: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দাও”—অর্থাৎ আমাদের অন্তরকে শক্তিশালী করো এবং আমাদের ধৈর্য ধারণের তাওফিক দাও। আর আমাদের পদক্ষেপকে টলমল করা ও পিছু হটা থেকে অটল রাখো এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
২৫০-২৫২ নং আয়াতের তাফসীর অর্থাৎ যেদিন মুসলমানদের এই ক্ষুদ্র সেনাদলটি কাফিরদের কাপুরুষ সেনাদলকে দেখলেন তখন তারা মহান আল্লাহর নিকট করজোড় প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে ধৈর্য ও অটলতার পাহাড় বানিয়ে দিন এবং যুদ্ধের সময় আমাদের পদগুলো অটল ও স্থির রাখুন! যুদ্ধের মাঠ থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন হতে আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং শত্রুদের উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন। তাদের এই বিনীত ও আন্তরিক প্রার্থনা আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং তাঁদের প্রতি সাহায্য অবতীর্ণ করেন।
ফলে এই ক্ষুদ্র দলটি কাফিরদের ঐ বিরাট দলটিকে তছনছ করে দেয় এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর হাতে বিরোধী দলের নেতা জালূত মারা পড়ে। ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহে এটাও রয়েছে যে, হযরত তালূত হযরত দাউদের (আঃ) সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, যদি তিনি জালুতকে হত্যা করতে পারেন তবে তিনি তার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেবেন এবং তাঁকে তাঁর অর্ধেক সম্পত্তিও দেবেন, আর অর্ধেক রাজত্বেরও অধিকারী করবেন। অতঃপর হযরত দাউদ (আঃ) জাতের প্রতি একটি পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তাতেই সে মারা যায়। হযরত তালুত তার অঙ্গীকার পূর্ণ করেন।
অবশেষে তিনি একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে যান এবং বিশ্বপ্রভুর পক্ষ হতে তাঁকে নবুওয়াতও দান করা হয় এবং হযরত শামভীল (আঃ)-এর পর তিনি নবী ও বাদশাহ দু'ই থাকেন। এখানে ‘হিকমত'-এর ভাবার্থ নবুওয়াত। মহান আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী তাকে গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বিদ্যাও শিক্ষা দেন। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-‘যেমন আল্লাহ বানী ইসরাঈলকে হযরত তালুতের মত সঠিক পরামর্শদাতা ও চিন্তাশীল বাদশাহ এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর মত মহাবীর সেনাপতি দান করে জাত ও তার অধীনস্থদেরকে অপসারিত করেছেন, এভাবে যদি তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা অপসারিত না করতেন।
তবে অবশ্যই মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যদি এরূপভাবে আল্লাহ মানুষের একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করতেন তবে উপাসনাগৃহ এবং যে মসজিদসমূহে খুব বেশী করে আল্লাহর যিকির করা হয়, সবই ভেঙ্গে দেয়া হতো।' (২২:৪০) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, একজন সৎ ও ঈমানদারের কারণে আল্লাহ তা'আলা তার আশে-পাশের শত শত পরিবার হতে বিপদসমূহ দূর করে থাকেন। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।
কিন্তু এই হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের আর একটি দুর্বল হাদীসে রয়েছে, ‘আল্লাহ তাআলা একজন খাঁটি মুসলমানের সততার কারণে তার সন্তানদেরকে সন্তানদের সন্তানদেরকে, তার পরিবারকে এবং আশে পাশের অধিবাসীদেরকে উপযুক্ত করে তোলেন এবং তার বিদ্যমানতায় তারা সবাই আল্লাহর হিফাযতে : থাকে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের একটি হাদীসে রয়েছে : ‘কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে তোমাদের মধ্যে সাত ব্যক্তি এমন থাকবে যাদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে।' তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থের অপর একটি হাদীসে রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ত্রিশজন লোক এমন থাকবে, যাদের কারণে তোমাদেরকে আহার্য দান করা হবে, তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হবে এবং তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে।' এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় হযরত হাসান বসরীও (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“এটা আল্লাহ তাআলার একটা নিয়ামত ও অনুগ্রহ যে, তিনি একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত করে থাকেন। তিনিই প্রকৃত হাকীম।
তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমাতে পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর দলীলসমূহ বান্দাদের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকেন এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবের উপর দয়া ও অনুগ্রহ করতে রয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন-“হে নবী (সঃ)! এই ঘটনাবলী এবং সমস্ত সত্য কথা আমি ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানিয়েছি।
তুমি আমার সত্য নবী। আমার এই কথাগুলো এবং স্বয়ং তোমার নবুওয়াতের সত্যতা সম্বন্ধেও ঐসব লোক পূর্ণভাবে অবগত রয়েছে, যাদের হাতে কিতাব রয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় শপথ করে স্বীয় নবীর (সঃ) নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করেছেন।
আল-বাগাভির তাফসির
“যখন তারা মুখোমুখি হলো”—অর্থাৎ তালুত ও তাঁর সৈন্যরা, অর্থাৎ মুমিনরা—“জালুত ও তার সৈন্যদের”, অর্থাৎ মুশরিকদের। «বারাযূ» (بَرَزُوا) শব্দের অর্থ, তারা খোলা প্রান্তরে এসে উপস্থিত হলো; এটি এমন ভূমি, যা উন্মুক্ত ও সমতল। “তারা বলল: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর ঢেলে দাও”—অর্থাৎ অবতীর্ণ করো, প্রবলভাবে বর্ষণ করো—“ধৈর্য; আর আমাদের পদক্ষেপ অটল রাখো”—অর্থাৎ আমাদের অন্তরকে দৃঢ় রাখো—“এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।”
সহিহ আল-বুখারি (হাদিস নং ২৯৬৬)-এ বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন শত্রুর মুখোমুখি হতেন, তখন বলতেন: “হে আল্লাহ! আপনিই আমার সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী; আপনার সাহায্যেই আমি যুদ্ধ করি!”