দোয়া 12 অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা 68 মিনিট পড়তে

সৃষ্টির নিদর্শন ও পরকালের মুক্তি

আল্লাহর কাছে প্রার্থনাকারী মুমিনরা 3:191–194
আরবি পাঠ

رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ، فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ. رَبَّنَا، إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ، فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ، وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ. رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ، أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ، فَآمَنَّا. رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا، وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا، وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ. رَبَّنَا وَآتِنَا مَا، وَعَدْتَنَا عَلَىٰ رُسُلِكَ، وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ.

رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَىٰ رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। آل عمران 3:191–194
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Rabbanā mā khalaqta hādhā bāṭilan subḥānaka faqinā ʿadhāban-nār. Rabbanā innaka man tudkhilin-nāra faqad akhzaytahu wa mā liẓ-ẓālimīna min anṣār. Rabbanā innanā samiʿnā munādiyan yunādī lil-īmāni an āminū birabbikum fa-āmannā. Rabbanā faghfir lanā dhunūbanā wa kaffir ʿannā sayyiʾātinā wa tawaffanā maʿal-abrār. Rabbanā wa ātinā mā waʿadtanā ʿalā rusulika wa lā tukhzinā yawmal-qiyāmati innaka lā tukhliful-mīʿād.
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

যারা আল্লাহকে দন্ডায়মান, উপবিষ্ট এবং শায়িত অবস্থায় স্মরণ করে থাকে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা করে (ও বলে) : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, সুতরাং আমাদেরকে অগ্নির শাস্তি হতে রক্ষা কর। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যাকে আগুনে নিক্ষেপ করবে, তাকে অবশ্যই তুমি অপমান করবে আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা একজন ঘোষণাকারীকে ঈমানের ঘোষণা করতে শুনেছি যে, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনো’। সে অনুযায়ী আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের গুনাহ্গুলো ক্ষমা কর এবং আমাদের থেকে আমাদের মন্দ কাজগুলো বিদূরিত কর আর নেক বান্দাদের সঙ্গে শামিল করে আমাদের মৃত্যু ঘটাও। ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি স্বীয় রসূলদের মারফত আমাদেরকে যেসব বস্তুর ওয়াদা শুনিয়েছ, তা আমাদেরকে দান কর এবং ক্বিয়ামাতের দিন আমাদেরকে লাঞ্ছিত করো না, নিশ্চয়ই তুমি ওয়া‘দা খেলাফ কর না।’

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

এ দোয়ায় স্রষ্টার পবিত্রতা ঘোষণা (তাসবিহ)-এর পর ‘আমাদের রক্ষা করো’ (قِنَا), ‘আমাদের ক্ষমা করো’ (اغْفِرْ), ‘আমাদের মন্দ কাজগুলো মুছে দাও’ (كَفِّرْ), ‘আমাদের মৃত্যু দাও’ (تَوَفَّنَا) এবং ‘আমাদের দান করো’ (آتِنَا)—এই প্রার্থনাগুলো এসেছে। কোরআনের পাঁচটি মহান সন্ধ্যা-রাতের আয়াত।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

তারা যখন ঈমানের প্রতি আল্লাহর তাওফিকের কথা উল্লেখ করল এবং তাঁর কাছে পূর্ণ নিয়ামত লাভের জন্য সেই ঈমানকে ওসিলা করল, তখন তারা এর প্রতিদান চাইল এবং তাঁর রাসূলদের মাধ্যমে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার আবেদন করল—দুনিয়ায় সাহায্য ও বিজয়, আর আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর জান্নাত লাভের প্রতিশ্রুতি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করলেন এবং তাদের বিনীত প্রার্থনা গ্রহণ করলেন। এ কারণে তিনি বলেন:

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি”—তিনি হলেন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। অর্থাৎ, তিনি মানুষকে ঈমানের দিকে ডাকতেন এবং এর প্রতি—এর মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখার প্রতি—তাদের আগ্রহী করতেন।

“অতঃপর আমরা ঈমান এনেছি”—অর্থাৎ, আমরা দ্রুত তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছি এবং ত্বরিতভাবে ঈমান গ্রহণ করেছি। এতে তারা নিজেদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা জানাচ্ছে, তাঁর নিয়ামতের জন্য আনন্দ প্রকাশ করছে এবং সেই নিয়ামতকে তাঁর কাছে ওসিলা করে প্রার্থনা করছে—যেন তিনি তাদের পাপ ক্ষমা করেন এবং তাদের মন্দ কাজগুলো মুছে দেন। কেননা, সৎকর্ম মন্দকর্ম দূর করে। যিনি তাদের ঈমানের অনুগ্রহ দিয়েছেন, তিনিই তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার অনুগ্রহও দান করবেন।

“আর সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আমাদের মৃত্যু দাও”—এই দোয়ার মধ্যে রয়েছে সৎকাজ করার এবং অসৎকাজ পরিহার করার তাওফিক চাওয়া; এর মাধ্যমেই বান্দা সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আরও রয়েছে সেই অবস্থায় অবিচল থাকা এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাতে দৃঢ় থাকার প্রার্থনা।

এরপর তিনি বুদ্ধিমানদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: “যারা আল্লাহকে স্মরণ করে”—তাদের সব অবস্থায়: “দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে।” এতে মুখে ও অন্তরে করা সব ধরনের যিকির অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করাও রয়েছে; তা সম্ভব না হলে বসে, আর তাও সম্ভব না হলে কাত হয়ে সালাত আদায় করা। তারা “আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে”—অর্থাৎ, এগুলো যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন তারা এর মাধ্যমে বুঝতে পারে।

এ থেকে বোঝা যায়, চিন্তা-ভাবনা করা আল্লাহর ওলিদের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি ইবাদত। তারা যখন এসব সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে, তখন বুঝতে পারে যে আল্লাহ এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি। তাই তারা বলে: “হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করোনি।

তুমি পবিত্র”—তোমার মহিমার সঙ্গে যা অসংগত, তা থেকে তুমি পবিত্র। বরং তুমি এগুলো সত্যের ভিত্তিতে ও সত্যের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছ; এগুলো সত্যকে ধারণ করে। “সুতরাং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো”—আমাদের মন্দকাজ থেকে বিরত রেখে এবং সৎকাজের তাওফিক দিয়ে, যাতে এর মাধ্যমে আমরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করি। এর মধ্যে জান্নাত চাওয়াও নিহিত রয়েছে; কারণ আল্লাহ যখন তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন, তখন তারা জান্নাত লাভ করবে।

তবে তাদের অন্তরে ভয় প্রবল হওয়ায় তারা আল্লাহর কাছে তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চেয়েছে:

“হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে, তাকে অবশ্যই অপমানিত করবে”—কারণ সে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ ও তাঁর প্রিয় বান্দাদের অসন্তুষ্টির পাত্র হবে এবং এমন লাঞ্ছনায় পতিত হবে, যেখান থেকে রক্ষা পাওয়ার বা উদ্ধার করার কেউ থাকবে না। এ কারণে তিনি বলেন: “আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই”—যারা তাদের আল্লাহর শাস্তি থেকে উদ্ধার করবে। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, তারা তাদের জুলুমের কারণেই জাহান্নামে প্রবেশ করেছে।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।'

নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে।

কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না?

আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত।

তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক।

এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম।

হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে।

লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।'

হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে।

এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর!

তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না।

খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না।

হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে।

হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু!

আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র।

হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু!

যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু!

আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি।

সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন।

কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন।

এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না।

আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন।

যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল।

কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!'

(আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন।

শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন।

সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন।

অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন।

অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও।

চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ!

আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো।

অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ!

তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল?

হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই।

সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান।

তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)!

আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।'

আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়।

হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।'

নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে।

কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না?

আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত।

তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক।

এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম।

হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে।

লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।'

হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে।

এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর!

তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না।

খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না।

হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে।

হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু!

আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র।

হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু!

যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু!

আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি।

সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন।

কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন।

এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না।

আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন।

যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল।

কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!'

(আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন।

শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন।

সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন।

অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন।

অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও।

চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ!

আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো।

অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ!

তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল?

হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই।

সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান।

তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)!

আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।'

আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়।

হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।'

নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে।

কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না?

আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত।

তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক।

এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম।

হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে।

লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।'

হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে।

এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর!

তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না।

খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না।

হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে।

হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু!

আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র।

হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু!

যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু!

আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি।

সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন।

কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন।

এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না।

আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন।

যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল।

কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!'

(আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন।

শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন।

সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন।

অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন।

অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও।

চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ!

আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো।

অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ!

তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল?

হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই।

সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান।

তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)!

আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।'

আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়।

হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

১৯০-১৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: তাবরানীর মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরায়েশরা ইয়াহূদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'হযরত মূসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি মুজিযা নিয়ে এসেছিলেন তারা বলেন, সর্পে পরিণত হয়ে যাওয়া লাঠি এবং দীপ্তিময় হস্ত। তার পরে তারা খ্রীষ্টানদের নিকট গমন করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, “হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের নিকট কি কি নিদর্শন এনেছিলেন? তারা উত্তরে বলে, ‘জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেত কুষ্ঠরোগীকে ভাল করে দেয়া এবং মৃতকে জীবিত করা।' তখন কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ‘সাফা পাহাড়কে সোনা করে দেন।'

নবী (সঃ) তখন প্রার্থনা করেন। সে সময় (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী দেখতে চায় তাদের জনন্য এগুলোর মধ্যেই বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। তারা এগুলোর মধ্যে চিন্তা গবেষণা করলেই সেই ক্ষমতাবান আল্লাহর সামনে তাদের মস্তক নুয়ে পড়বে।

কিন্তু এ বর্ণনায় জটিলতা এই রয়েছে যে, এ প্রশ্ন হয়েছিল মক্কা শরীফে, আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মদীনা শরীফে। আয়াতের ভাবার্থ এই যে, আকাশের মত সুউচ্চ ও প্রশস্ত সৃষ্টবস্তু, ভূমণ্ডলের মত নিম্ন, শক্ত ও লম্বা চওড়া সৃষ্টবস্তু, তারপরে আকাশের বড় বড় নিদর্শনাবলী, যেমন গতিশীল ও একই জায়গায় স্থিতিশীল তারকারাজি, ভূপৃষ্ঠর বড় বড় সৃষ্টি যেমন পাহাড়, জঙ্গল, বৃক্ষ ঘাস, ক্ষেত্র, ফল এবং বিভিন্ন প্রকারের জীব-জন্তু, খনিজ দ্রব্য, পৃথক পৃথক স্বাদ ও গন্ধযুক্ত ফলসমূহ ইত্যাদি, মহান আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার এসব নিদর্শন কি বিবেক সম্পন্ন মানুষকে তার পরিচয় প্রদান করতঃ তার পথে চালিত করতে পারে না?

আরও নিদর্শন অবলোকন করার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকবে কি? অতঃপর দিন-রাত্রির গমনাগমন এবং ঐ গুলোর হ্রাস-বৃদ্ধি। তারপরে সমান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এসব কিছু সেই মহান পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এ জন্যেই এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে-‘এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে যথেষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যাদের আত্মা পবিত্র এবং যারা প্রত্যেক জিনিসের মূল তত্ত্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অভ্যস্ত।

তারা নিরেটদের মত অন্ধ ও বধির নয়। যেমন অন্য জায়গায় ঐ নিরেটদের অবস্থার বর্ণনা হয়েছে – তারা আকাশ ও পৃথিবীর বহু নিদর্শন পদদলিত করে চলে যায় এবং কোন চিন্তা গবেষণা করে না। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহকে মান্য করা সত্ত্বেও অংশীস্থাপন হতে বাঁচতে পারে না।' এখন ঐ জ্ঞানবানদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা উঠতে, বসতে, শুইতে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘দাঁড়িয়ে নামায পড়। ক্ষমতা না হলে বসে পড়। এতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়।' অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন থেকো না। অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাক।

এ লোকগুলো আকাশ ও যমীনের উৎপাদনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং ঐগুলোর নিপুণতার বিষয়ে চিন্তা করে, যেগুলো সেই এক আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমতা, নিপুণতা, স্বেচ্ছারিতা ও করুণার পরিচয় দিয়ে থাকে। হযরত শায়েখ সুলাইমান দারানী বলেনঃ ‘বাড়ী হতে বেরিয়ে যে যে জিনিসের উপর আমার দৃষ্টি পতিত হয়, আমি দেখি যে, ওর মধ্যে আল্লাহর একটি নিয়ামত আমার জন্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং আমার জন্যে ওতে শিক্ষা রয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এক ঘন্টাকাল চিন্তা ও গবেষণা করা সারারাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করা হতে উত্তম।

হযরত ফাযীল (রঃ) বলেন, হযরত হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, চিন্তা, গবেষণা ও ধ্যান এমন একটি দর্পণ যা তোমার সামনে তোমার ভালমন্দ পেশ করে দেবে। হযরত সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন, “চিন্তা ও গবেষণা এমন একটি আলোক যা তোমার অন্তরের উপর স্বীয় প্রতিবিম্ব নিক্ষেপ করবে।' প্রায়ই তিনি নিম্নের পংক্তিটি পাঠ করতেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন মানুষের চিন্তা ও ধ্যানের অভ্যাস হয়ে যায় তখন প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে তার জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় বিদ্যমান থাকে। হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ ‘ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যার কথা বলার মধ্যে আল্লাহর যিকির ও উপদেশাবলী প্রকাশ পায়, নীরবতার মধ্যে চিন্তা ও ধ্যান প্রকাশিত হয় এবং দর্শনের মধ্যে শিক্ষা ও সতর্কতা বিরাজ করে।

লোকমান হাকীমের জ্ঞানপূর্ণ উক্তিটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ “নির্জনবাস যার যত বেশী হয় তার চিন্তা, ধ্যান পরিণামদর্শিতাও তত বেশী হয়। যে পরিমাণ এটা বেশী হয় ঐ পরিমাণ সেই রাস্তা মানুষের উপর খুলে যায় যা তাকে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, 'আল্লাহর ধ্যান যত বেশী হবে, বোধশক্তি তত প্রখর হবে, আর বোধশক্তি যত প্রখর হবে, জ্ঞান লাভ তত বেশী হবে এবং জ্ঞান যত বেশী হবে সকার্যাবলীও তত বৃদ্ধি পাবে।'

হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) বলেন, মহান সম্মানিত আল্লাহর স্মরণে রসনা চালনা করা অতি উত্তম কাজ এবং তাঁর নিয়ামতের উপর চিন্তা ও গবেষণা করা উত্তম ইবাদত।' হযরত মুগীস আসওয়াদ (রঃ) সভাস্থলে বসে বলতেন, “হে জনমণ্ডলী! প্রত্যহ গোরস্থানে গমন কর, তাহলে পরিণাম সম্বন্ধে তোমাদের একটা ধারণা পয়দা হবে। অতঃপর স্বীয় অন্তরে ঐ দৃশ্য হাযির কর যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান রয়েছে।

এরপর একটি লোককে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অপর একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করছে স্বীয় অন্তরকে ঐ অবস্থায় টেনে আন এবং স্বীয় দেহকেও তথায় বিদ্যমান মনে কর। জান্নাতকে তোমাদের সামনে হাযির দেখ। ওর হাতুড়ী এবং অগ্নির জেলখানাকে চক্ষুর সম্মুখে নিয়ে এসো! এ পর্যন্ত বলেই চীৎকার করে কেঁদে উঠেন এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যান।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন, একটি লোক একটি গোরস্থানে ও আবর্জনা ফেলার জায়গায় একজন দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, “হে দরবেশ! আপনার সামনে এখন দু'টি ভাণ্ডার রয়েছে। একটি হচ্ছে লোকদের ভাণ্ডার অর্থাৎ গোরস্থান এবং অপরটি হচ্ছে ধন ভাণ্ডার অর্থাৎ আবর্জনা, পায়খানা ও প্রস্রাব নিক্ষেপ করার জায়গা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার পার্শ্বে গমন করতেন এবং কোন ভাঙ্গাচুরা দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলতেন, “হে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর!

তোমার অবিশ্বাসী কোথায় রয়েছে?' অতঃপর নিজে নিজেই বলতেন‘সবাই মাটির নীচে চলে গেছে। সকলেই ধ্বংসের পেয়ালা পান করেছে। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সত্য সত্তা চির-বিদ্যমান থাকবে।' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্তরিকতার সাথে দু' রাকআত নামায পড়া ঐ সমুদয় নামায হতে উত্তম যেগুলোতে সারা রাত্রি কাটিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু আন্তরিকতা ছিল না।

খাজা হাসান বসরী (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তোমার পেটের এক তৃতীয়াংশে ভোজন কর এক তৃতীয়াংশে পানি পান কর এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ঐ শ্বাসের জন্যে রেখে দাও যার মধ্যে তুমি পরকালের কথার উপর, নিজ পরিণামের উপর এবং স্বীয় কার্যাবলীর উপর চিন্তা ও গবেষণা করতে পার। কোন বিজ্ঞ লোকের উক্তি এই যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জিনিসসমূহের উপর শিক্ষা গ্রহণ ছাড়াই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঐ উদাসীনতা অনুপাতে তার অন্তরের চক্ষু দুর্বল হয়ে পড়ে। হযরত বাশীর ইবনে হারিস হাঈ (রঃ) বলেন, মানুষ যদি আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তা করতো তবে কখনও তাদের দ্বারা অবাধ্যতা হতো না।

হযরত আমির ইবনে আবদ কায়েস (রঃ) বলেনঃ আমি বহু সাহাবীর নিকট শুনেছি যে, ঈমানের কিরণ হচ্ছে চিন্তা, গবেষণা এবং আল্লাহর ধ্যান।' হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আদম সন্তান! হে দুর্বল মানুষ! তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পৃথিবীতে বিনয় ও দারিদ্রের সাথে অবস্থান কর, মসজিদকে স্বীয় ঘর বানিয়ে নাও, নিজেদের চক্ষুগুলোকে ক্রন্দন শিখিয়ে দাও, দেহকে ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত কর, হৃয়দকে চিন্তা ও গবেষণাকারী বানিয়ে দাও এবং আগামীকালের রুযীর জন্যে আজকে চিন্তা করো না।”

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) একদা সভাস্থলে বসে ক্রন্দন করছিলেন। জনগণ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়া ও ওর উপভোগ এবং প্রবৃত্তির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেছি এবং তা হতে উপদেশ গ্রহণ করেছি। পরিণামে পৌছে আমার আশা ও আকাঙ্খা সব শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই ওতে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে।

হযরত হাসান ইবনে আবদুর রহমানও (রঃ) স্বীয় কবিতায় এ বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর ঐ বান্দাদের প্রশংসা করছেন যারা সৃষ্ট ও বিশ্বজগত হতে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে থাকে এবং তিনি ঐ লোকদেরকে নিন্দে করছেন যারা আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে চিন্তা করে না। মুমিনদের প্রশংসার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা উঠতে বসতে এবং শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করে থাকে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করতঃ বলে, হে আমাদের প্রভু!

আপনি এগুলোকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। বরং সত্যের সাথে সৃষ্টি করেছেন, যেন পাপীদেরকে তাদের পাপের পূর্ণ প্রতিদান এবং পুণ্যবানদেরকে তাদের পুণ্যের পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারেন। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনা করতঃ বলে, হে আল্লাহ! কোন কিছু বৃথা সৃষ্টি হতে আপনি পবিত্র।

হে সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং হে সারা বিশ্বের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী! হে দোষত্রুটি হতে মুক্ত সত্তা! আমাদেরকে স্বীয় ক্ষমতা বলে এমন কাজ করার তাওফীক প্রদান করুন যার ফলে আমরা আপনার কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেতে পারি এবং আমাদেরকে এমন দানে ভূষিত করুন যার ফলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করতে পারি। তারা আরও বলে, হে আমাদের প্রভু!

যাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তাকে তো আপনি ধ্বংস করে দেবেন, সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তাদেরকে না কেউ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, না কেউ শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারবে, আপনার ইচ্ছেকে টলাতে পারবে। হে আমাদের প্রভু!

আমরা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি যিনি ঈমানের দিকে ডেকেছেন।' এ আহ্বানকারী দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি মানবমণ্ডলীকে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।' তার কথায় আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং অনুগত হয়েছি।

সুতরাং আমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্যের কারণে আমাদের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দিন এবং আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত করতঃ আমাদেরকে পুণ্যবানদের সাথে মৃত্যু দান করুন। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন।' ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে, আপনি আপনার রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তা আমরা পুরো করেছি। সুতরাং আমাদেরকে তার প্রতিদান দান করুন।

কিন্তু পূর্ব ভাবার্থটি বেশী স্পষ্ট। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আসকালান’ হচ্ছে দুই ‘আরূসের মধ্যে একটি। এখান হতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার লোককে দাঁড় করাবেন যাদের হিসাব-নিকাশ কিছুই নেই। এখান হতেই পঞ্চাশ হাজার শহীদ উঠবেন এবং প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট গমন করবেন।

এখানে শহীদদের সারি হবে, যাদের কর্তিত মস্তক তাদের হাতে থাকবে। তাদের স্কন্ধের শিরা হতে রক্ত বইতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার রাসূলগণ যোগে আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করুন। কিয়ামতের দিন আমাদেরকে লজ্জিত করবেন না।

আপনি কখনও অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম করেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন‘আমার বান্দাগণ সত্য বলছে। তাদেরকে নাহারে বায়যায়’ গোসল করিয়ে দাও। তারা তথায় গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে বের হবে। সমস্ত জান্নাতেই তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে। যেখানে মনে করে সেখানেই তাঁরা যাতায়াত করতে পারবেন।

যা চাইবেন তাই খাবেন।' এ হাদীসটি গারীব। কেউ কেউ তো একে মাওযূ' বলেছেন। কিয়ামতের দিন সমস্ত মানবের সমাবেশে আমাদেরকে লজ্জিত ও অপমানিত করবেন না। আপনার অঙ্গীকার সত্য। আপনি স্বীয় রাসূলগণের মাধ্যমে যে সংবাদ আমাদেরকে দিয়েছেন তা সবই অটল।

কিয়ামতের দিন। অবশ্যই আসবে। কাজেই হে আমাদের প্রভু! সেদিন আমাদেরকে লজ্জা ও অপমান হতে রক্ষা করুন। রাসূলল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘বান্দার উপর লজ্জা, অপমান-শাসন-গর্জন এতো বেশী বর্ষিত হবে এবং আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে এমনভাবে অপদস্থ করা হবে যে, তারা কামনা করবে‘যদি আমাদেরকে জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হতো!'

(আবূ ইয়ালা) এ হাদীসটির সনদও গারীব। হাদীসসমূহ দ্বারা এও সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে গাত্রোত্থান করতেন তখন তিনি সূরাঃ আলে ইমরানের এ শেষ দশটি আয়াত পাঠ করতেন যেমন সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদা আমার খালা হযরত মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত্রি যাপন করি। হযরত মাইমুনা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার সাথে কথা-বার্তা বলেন।

শেষ এক ততীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে তিনি উঠে পড়েন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে মিসওয়াক করতঃ অযু করেন এবং এগারো রাকআত নামায আদায় করেন। হযরত বিলাল (রাঃ)-এর ফজরের আযান শুনে ফজরের দু' রাকআত সুন্নত পড়েন। অতঃপর মসজিদে গমন করতঃ জনগণকে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন।

সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি অন্য জায়গাতেও রয়েছে। তাতে রয়েছে। যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিছানার উপর আমি শয়ন করি এবং দৈর্ঘ্যের উপর শয়ন করেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহধর্মিণী হযরত মাইমুনা (রাঃ)। অর্ধেক রাত্রির কাছাকাছি, পূর্বে বা কিছু পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগে উঠেন এবং স্বীয় হস্তদ্বয় দ্বারা স্বীয় চক্ষু মলতে মলতে উল্লিখিত দশটি আয়াত পাঠ করেন।

অতঃপর লটকানো মশক হতে পানি নিয়ে ভালভাবে পূর্ণ অযু করেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আমিও ঐরকমই সবকিছু করে তাঁর বাম দিকে তাঁর অনুসরণে দাঁড়িয়ে যাই। রাসূলল্লাহ (সঃ) স্বীয় দক্ষিণ হস্ত আমার মাথায় রেখে আমার কান ধরে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নেন। অতঃপর দু'রাকআত করে করে ছয় বার অর্থাৎ বার রাকআত নামায পড়েন এবং তার পরে বের পড়ে শুয়ে পড়েন।

অতঃপর মুআযযিন এসে নামাযের জন্যে ডাক দেন। তিনি উঠে হালকা করে দু'রাকআত নামায পড়েন এবং বাইরে এসে ফজরের নামায পড়িয়ে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই-এর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমাকে আমার পিতা হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি আজকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবারের মধ্যে রাত্রি যাপন কর এবং তার রাত্রির নামাযের অবস্থা পরিদর্শন কর।' রাত্রে যখন সমস্ত লোক ইশার নামায পড়ে চলে যায়, আমি তখন বসে থাকি।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাবার সময় আমাকে দেখে বলেন, 'কে, আবদুল্লাহ?' আমি বলি জ্বি, হা! তিনি বলেনঃ “এখানে রয়ে গেছ কেন? আমি বলি, আব্বার নির্দেশ যে আমি যেন আপনার ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি বলেনঃ ‘বেশ ভাল কথা, এসো।' ঘরে এসে তিনি বলেনঃ “বিছানা বিছিয়ে দাও।

চটের বালিশ আছে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওর উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। অবশেষে আমি তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর তিনি জেগে উঠেন এবং আকাশের দিকে চেয়ে তিনবার (আরবী) পাঠ করতঃ সূরা আলে ইমরানের শেষের এ আয়াতগুলো পাঠ করেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এ আয়াতগুলো পাঠের পর তিনি নিম্নলিখিতে দু'আ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ!

আপনি আমার অন্তর আলোকিত করুন, আমার কর্ণে আলো সৃষ্টি করুন, আমার চক্ষে আলো পয়দা করুন, আমার দক্ষিণ দিক আলোকিত করুন, আমার বাম দিক আলোকিত করুন, আমার সামনের দিক আলোকিত করুন, আমার পিছনের দিক আলোকিত করুন, আমার উপরের দিক আলোকিত করুন, আমার নীচের দিক আলোকিত করুন এবং কিয়ামতের দিন আমার জন্যে আলোকরশ্মি বড় করে দিন। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) এ দুআটি কতক সঠিক পন্থাতেও বর্ণিত আছে। এ আয়াতের তাফসীরের প্রারম্ভে তাবরানীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তাতে তো জানা যায় যে, এটি মাক্কী আয়াত। কিন্তু প্রসিদ্ধি এর উল্টো।

অর্থাৎ এটি মাদানী আয়াত। এর দলীলরূপে তাফসীর-ই- ইবনে মিরদুওয়াই-এর নিমের হাদীসটি পেশ করা যেতে পারে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট হযরত আতা’ (রঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) আগমন করেন। তাঁর ও তাঁদের মধ্যে পর্দা ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘উবায়েদ!

তুমি আসনা কেন?” হযরত উবায়েদ (রঃ) উত্তরে বলেন, 'আম্মাজান! শুধুমাত্র কোন একজন কবির! (আরবী) অর্থাৎ ‘সাক্ষাৎ কম কর তাহলে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে’ এ উক্তির কারণে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, ‘এসব কথা ছেড়ে দিন। আম্মাজান! আপনার নিকট আমাদের আগমনের কারণ এই যে, আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন কাজটি আপনার নিকট বেশী বিস্ময়কর মনে হয়েছিল?

হযরত আয়েশা (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, তার সমস্ত কাজই অদ্ভুত ছিল। আচ্ছা, একটি ঘটনা শুন। একদা রাত্রে আমার পালায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং আমার সঙ্গে শয়ন করেন। অতঃপর তিনি আমাকে বলেনঃ হে আয়েশা! আমি আমার প্রভুর কিছু ইবাদত করতে চাই।

সূতরাং আমাকে যেতে দাও'। আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নৈকট্য কামনা করি এবং এও কামনা করি যে, আপনি যেন মহা সম্মানিত আল্লাহর ইবাদত করেন। তিনি উঠে পড়েন এবং একটি মশক হতে পানি নিয়ে হালকা অযু করেন। এরপর নামাযের জন্যে দাড়িয়ে যান।

তারপরে তিনি কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং এত কাঁদেন যে, তার শত্রু মুবারক সিক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং এত ক্রন্দন করেন যে, মাটি ভিজে যায়। তার পরে তিনি কাত হয়ে শুয়ে পড়েন এবং কাঁদতেই থাকেন। অবশেষে হযরত বিলাল (রাঃ) এসে নামাযের জন্যে আহ্বান করেন এবং তাঁর নয়নে অশ্রু দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর সত্য রাসূল (সঃ)!

আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বের ও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ “হে বিলাল! আমি কাঁদবো না কেন? আজ রাত্রে আমার উপর। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন :‘ঐ ব্যক্তির বড়ই দুর্ভাগ্য যে এটা পাঠ করে অথচ ঐ সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না।'

আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ)-এর তাফসীরেও এ হাদীসটি রয়েছে। ওতে এও রয়েছে। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করি তখন আমরা তাকে সালাম জানাই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কে?' আমরা আমাদের নাম বলি। শেষে এও রয়েছে-নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান কটে গণ্ডদেশের নীচে হাত রেখে শয়ন করেন এবং কাঁদতে থাকেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে যায়।

হযরত বিলাল (রাঃ)-এর কথার উত্তরে তিনি এও বলেনঃ “আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না’? আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার ব্যাপারে (আরবী) পর্যন্ত তিনি পাঠ করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি দুর্বল সনদবিশিষ্ট হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত প্রত্যহ রাত্রে পাঠ করতেন। ঐ বর্ণনায় মুযাহির ইবনে আসলাম নামক বর্ণনাকারী দুর্বল।

আল-বাগাভির তাফসির

“হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে, তাকে অবশ্যই অপমানিত করবে”—অর্থাৎ, তাকে লাঞ্ছিত করবে। কেউ বলেছেন: তাকে ধ্বংস করবে; আবার কেউ বলেছেন: তাকে অপদস্থ করবে। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী: “আর আমার অতিথিদের ব্যাপারে আমাকে লাঞ্ছিত করো না” (সূরা হূদ, ১১:৭৮)।

যদি বলা হয়, আল্লাহ তো বলেছেন: “সেদিন আল্লাহ নবীকে এবং তাঁর সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে, তাদের লাঞ্ছিত করবেন না” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৮); অথচ ঈমানদারদের কেউ কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর তিনি বলেছেন: “তুমি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে, তাকে অবশ্যই অপমানিত করবে”—তাহলে এর জবাব কী? বলা হয়েছে: আনাস ও কাতাদাহ বলেছেন, এর অর্থ—যাকে তুমি জাহান্নামে স্থায়ীভাবে রাখবে, তাকে অপমানিত করবে। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেছেন, এ বক্তব্য বিশেষভাবে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা জাহান্নাম থেকে বের হবে না।

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ একদল মানুষকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, তারপর তাদের সেখান থেকে বের করবেন।” “আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।”

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা একজন আহ্বানকারীকে শুনেছি”—অর্থাৎ, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। ইবনু মাসউদ ও ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং অধিকাংশ আলেম এ কথা বলেছেন। আল-কারাযি বলেছেন, এখানে আহ্বানকারী বলতে কোরআনকে বোঝানো হয়েছে; কারণ প্রত্যেকের পক্ষে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাক্ষাৎ লাভ করা সম্ভব হয়নি।

“যে ঈমানের দিকে আহ্বান করে”—অর্থাৎ, ঈমানের দিকে। “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনো। অতঃপর আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাপ ক্ষমা করো, আমাদের মন্দ কাজগুলো আমাদের থেকে দূর করো এবং সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আমাদের মৃত্যু দাও”—অর্থাৎ, সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত অবস্থায়।

“যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে এবং নিজেদের পার্শ্বদেশে শুয়ে”—আলী ইবনু আবি তালিব, ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা), আন-নাখাঈ ও কাতাদাহ বলেছেন: এখানে সালাতের কথা বলা হয়েছে—সক্ষম হলে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে; তা না পারলে বসে, আর তাও না পারলে কাত হয়ে।

আবু উসমান সাঈদ ইবনু ইসমাঈল আদ-দাব্বী আমাদের জানিয়েছেন; আবু মুহাম্মদ আবদুল জাব্বার ইবনু মুহাম্মদ আল-জারাহি আমাদের জানিয়েছেন; আবুল আব্বাস মুহাম্মদ ইবনু আহমদ আল-মাহবুবি আমাদের জানিয়েছেন; আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনু ঈসা আত-তিরমিযী আমাদের জানিয়েছেন; হান্নাদ আমাদের জানিয়েছেন; ওয়াকী‘, ইবরাহীম ইবনু তাহমানের সূত্রে, হুসাইন আল-মু‘আল্লিমের সূত্রে, আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদার সূত্রে, ইমরান ইবনু হুসাইন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অসুস্থ ব্যক্তির সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি বললেন: “দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করো; যদি সক্ষম না হও, তবে বসে; আর যদি তাও সক্ষম না হও, তবে কাত হয়ে।”

অন্য সব মুফাসসির বলেছেন, এর দ্বারা সব অবস্থায় নিয়মিত যিকির করাকে বোঝানো হয়েছে; কারণ মানুষ সাধারণত এই তিন অবস্থার কোনো একটি থেকে খুব কমই মুক্ত থাকে। এর অনুরূপ কথা সূরা আন-নিসায় রয়েছে: “অতঃপর যখন তোমরা সালাত শেষ করবে, তখন দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে” (সূরা আন-নিসা, ৪:১০৩)।

“আর তারা আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে”—এবং এ দুটিতে যা বিস্ময়করভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, তা নিয়ে; যাতে এগুলো তাদের আল্লাহর ক্ষমতার প্রমাণ দেখায় এবং তারা জানতে পারে যে এ সৃষ্টির একজন স্রষ্টা আছেন—তিনি সর্বশক্তিমান, পরিচালনাকারী ও প্রজ্ঞাময়। ইবনু আওন বলেছেন: চিন্তা-ভাবনা গাফিলতি দূর করে এবং হৃদয়ে ভয় সৃষ্টি করে, যেমন পানি উদ্ভিদ জন্মায়। দুঃখের মতো কিছুই হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে না, আর চিন্তা-ভাবনার মতো কিছুই তাকে আলোকিত করে না।

“হে আমাদের প্রতিপালক”—অর্থাৎ, তারা বলে: “হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব সৃষ্টি করোনি”—এখানে ইঙ্গিতটি সৃষ্টিগুলোর প্রতি, তাই ‘এগুলো’ না বলে ‘এটি’ বলা হয়েছে। “অনর্থক”—অর্থাৎ, খেলাচ্ছলে ও অর্থহীনভাবে নয়; বরং তুমি এগুলো মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছ। ‘অনর্থক’ শব্দটি ‘বা-’ অব্যয়টি উহ্য থাকার কারণে নসব অবস্থায় এসেছে; অর্থাৎ, ‘অনর্থকভাবে’।

“তুমি পবিত্র। অতএব আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।”

“হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার রাসূলদের মাধ্যমে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা আমাদের দান করো”—অর্থাৎ, তোমার রাসূলদের মুখে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ। “আর কিয়ামতের দিন আমাদের লাঞ্ছিত করো না”—অর্থাৎ, আমাদের শাস্তি দিও না, ধ্বংস করো না, অপদস্থ করো না এবং হেয় করো না। “নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।”

যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তারা “হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার রাসূলদের মাধ্যমে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা আমাদের দান করো” বলে কেন প্রার্থনা করল, অথচ তারা জানত যে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না? বলা হয়েছে: বাক্যটি দোয়ার রূপে এসেছে, কিন্তু এর অর্থ সংবাদ—অর্থাৎ, “তোমার রাসূলদের মাধ্যমে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা অবশ্যই আমাদের দান করবে।” এর ব্যাখ্যা হলো: “অতএব আমাদের পাপ ক্ষমা করো, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করো এবং কিয়ামতের দিন আমাদের লাঞ্ছিত করো না”—যাতে তুমি তোমার রাসূলদের মাধ্যমে আমাদের যে অনুগ্রহ ও রহমতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা আমাদের দান করো।

আরও বলা হয়েছে, এর অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যারা তোমার প্রতিদান পাওয়ার যোগ্য; আর তোমার রাসূলদের মুখে যাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা তাদের দান করো।” কারণ তারা নিশ্চিত ছিল না যে তারা সেই সম্মান লাভের যোগ্য। তাই তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, যেন তিনি তাদের সেই সম্মানের উপযুক্ত করে দেন।

কেউ বলেছেন, তারা শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয়ের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যই প্রার্থনা করেছিল। তারা বলেছিল: “আমরা জানি, তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না; কিন্তু তোমার সহনশীলতার অপেক্ষা করার ধৈর্য আমাদের নেই। অতএব তাদের লাঞ্ছনা দ্রুত ঘটাও এবং তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।”

সমর্থনকারী হাদিস

সহিহ আল-বুখারি (হাদিস নং ৪৫৬৯) এবং সহিহ মুসলিমে (হাদিস নং ২৫৬) বর্ণিত হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়ানোর জন্য যখনই ঘুম থেকে জাগতেন, তখন এই দশটি আয়াত পাঠ করতেন।

ট্যাগ
  • #তাসবিহ
  • #আখিরাত
  • #জাহান্নাম থেকে আশ্রয়
  • #ক্ষমা প্রার্থনা
  • #ঈমান
  • #সৎকর্মশীল
  • #কিয়ামত

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →