দোয়া 31 জ্ঞান ও সহজতা 6 মিনিট পড়তে

জ্ঞান বৃদ্ধির প্রার্থনা

নবী মুহাম্মদ ﷺ 20:114
আরবি পাঠ

رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا.

رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। طه 20:114
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Rabbi zidnī ʿilmā
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

আল্লাহ সর্বোচ্চ, প্রকৃত অধিপতি, তোমার প্রতি (আল্লাহর) ওয়াহী সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তুমি কুরআন বক্ষে ধারণের ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করো না। আর বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! জ্ঞানে আমায় সমৃদ্ধি দান করুন।’

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

«زِدْنِي» (যিদনী) আদেশসূচক ক্রিয়ারূপ; এর অর্থ, ‘আমার জন্য বৃদ্ধি করুন’। কুরআনে একমাত্র যে বিষয়টির বৃদ্ধি চাওয়ার জন্য আল্লাহ তাঁর নবীকে আদেশ করেছেন, তা হলো দ্বীনি জ্ঞান (ইলম)।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে প্রতিদানমূলক বিধান এবং তাঁর কিতাবে নাযিলকৃত ধর্মীয় আদেশমূলক বিধানের কথা উল্লেখ করলেন—যা তাঁর রাজত্বেরই নিদর্শন—তখন বললেন: «فَتَعَالَى اللَّهُ»—অতএব আল্লাহ মহান ও ঊর্ধ্বে। অর্থাৎ, তিনি সব ত্রুটি ও বিপদাপদ থেকে মহিমান্বিত, ঊর্ধ্বে এবং পবিত্র। «الْمَلِكُ»—সার্বভৌম অধিপতি; রাজত্ব তাঁরই গুণ, আর সমস্ত সৃষ্টি তাঁর অধীন। রাজাধিরাজের তাকদিরি ও শরয়ি বিধান তাদের ওপর কার্যকর।

«الْحَقُّ»—তিনি, তাঁর রাজত্ব এবং তাঁর পরিপূর্ণতা সত্য। পরিপূর্ণতার গুণাবলি প্রকৃত অর্থে কেবল মহিমাময় সত্তারই প্রাপ্য। রাজত্বও এর অন্তর্ভুক্ত। সৃষ্টির অন্য কেউ কোনো কোনো সময়ে কোনো কোনো বস্তুর ওপর রাজত্ব করলেও তা সীমাবদ্ধ ও অস্থায়ী; তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কিন্তু প্রতিপালকের রাজত্ব চিরস্থায়ী—তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক ও মহিমান্বিত; তাঁর রাজত্ব কখনো শেষ হয় না।

«وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ»—অর্থাৎ, জিবরীল যখন তোমাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনান, তখন তা দ্রুত গ্রহণ করতে উদ্যত হয়ো না; বরং তিনি তিলাওয়াত শেষ করা পর্যন্ত ধৈর্য ধরো। তিনি শেষ করলে তুমি তা পাঠ করো। আল্লাহ তোমার অন্তরে তা সংরক্ষণ করা এবং তোমাকে তা পাঠ করানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। আল্লাহ বলেন: «لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ»—‘এটিকে তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার জন্য তুমি এর সঙ্গে তোমার জিহ্বা নাড়বে না।

এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানো তো আমারই দায়িত্ব। সুতরাং আমি যখন তা পাঠ করি, তখন তুমি সেই পাঠের অনুসরণ করো। অতঃপর এর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্বও আমার।’

নবী ﷺ-এর ওহী দ্রুত গ্রহণের চেষ্টা তাঁর জ্ঞানের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও প্রবল আগ্রহের পরিচয় বহন করত। তাই আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করতে আদেশ করলেন। জ্ঞান কল্যাণকর, আর কল্যাণের আধিক্য কাম্য; তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। জ্ঞানের পথে রয়েছে সাধনা, জ্ঞানের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তাঁর সাহায্য চাওয়া এবং প্রতিটি সময়ে তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়া।

এই মহিমান্বিত আয়াত থেকে জ্ঞান গ্রহণের শিষ্টাচারও জানা যায়: যে ব্যক্তি জ্ঞান শোনে, তার উচিত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা—বক্তা ও শিক্ষক পরস্পর-সংযুক্ত বক্তব্য শেষ করা পর্যন্ত। তিনি শেষ করলে, প্রশ্ন থাকলে তা করা যায়। জ্ঞান পরিবেশনকারীর কথা কেটে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে প্রশ্ন করা উচিত নয়; তা বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে। একইভাবে, যাকে প্রশ্ন করা হয় তার উচিত প্রশ্নকারীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং উত্তর দেওয়ার আগে তার উদ্দেশ্য বুঝে নেওয়া; এতে সঠিক উত্তর দেওয়া সহজ হয়।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

১১৩-১১৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিয়ামতের দিন অবশ্যই আসবে এবং সেইদিন ভাল ও মন্দ কাজের প্রতিফল অবশ্যই পেতে হবে, তাই আমি লোকদেরকে সতর্ক করার জন্যে সুসংবাদ দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী আমার পবিত্র কালাম পরিষ্কার আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষ বুঝতে পারে। আমি তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে ভয় প্রদর্শন করেছি যাতে তারা পাপ থেকে বাঁচতে পারে, কল্যাণ লাভের কাজে লেগে যায়, তাদের অন্তরে চিন্তা ভাবনা ও উপদেশ এসে যায়, তারা আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ভাল কাজের চেষ্টায় লেগে পড়ে। সুতরাং মহান ও পবিত্র ঐ আল্লাহ যিনি প্রকৃত অধিপতি। এবং ইহজগত ও পরজগতের একচ্ছত্র মালিক।

তিনি স্বয়ং সত্য, তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য, তঁর ভয় প্রদর্শন সত্য, তাঁর রাসূলগণ সত্য এবং তার জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য। তাঁর ফরমান এবং তার পক্ষ হতে যা কিছু হয় সবই ন্যায় ও সত্য। তাঁর সত্ত্বা এর থেকে পবিত্র যে, তিনি পূর্বে সতর্ক না করেই কাউকেও শাস্তি প্রদান করবেন। তিনি সবারই ওজরের সুযোগ কেটে দেন এবং কারো সন্দেহ তিনি বাকী রাখেন না।

তিনি সত্য উদঘাটিত করেন। অতঃপর তিনি মুশরিকদেরকে ন্যায়ের সাথে শাস্তি প্রদান করে থাকেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমার প্রতি আমার ওয়াহী সম্পূর্ণ হবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করে না। প্রথমে ভাল রূপে শুনে নাও। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তাড়াতাড়ি ওয়াহী আয়ত্ত করার জন্যে তুমি তোমার জিহবা ওর সাথে সঞ্চালন করো না।

এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি তা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর। অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই।” হাদীসে আছে যে, প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈলের (আঃ) সাথে সাথেই পড়তেন। তাতে তার খুব কষ্ট হতো।

যখন উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তার থেকে ঐ কষ্ট দূর হয়ে যায় এবং তিনি প্রশান্তি লাভ করেন যে, আল্লাহ যতগুলিই ওয়াহী নাযিল করুন না কেন তার মুখস্থ। হবেই। একটা অক্ষরও তিনি ভুলবেন না। কেননা, আল্লাহ ওয়াদা করেছেন এবং তার ওয়াদা সত্য।

এখানেও একথাই বলা হচ্ছে যে, তিনি যেন ফেরেশতার কুরআন পাঠ শ্রবণ করেন এবং তাঁর পাঠ শেষে যেন তিনি পাঠ শুরু করেন। আর তাঁর কর্তব্য হবে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্যে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা। সুতরাং তিনি দুআ করেন এবং আল্লাহ তাআলা তার দুআ ককূল করেন। তাই, মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর ইলম বাড়তেই থাকে।

হাদীসে আছে যে, বরাবরই পর্যায়ক্রমে ওয়াহী আসতে থাকে, এমনকি যেদিন তিনি দুনিয়া হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন সেদিনও বহু সংখ্যক ওয়াহী অবতীর্ণ হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি যা আমাকে শিখিয়েছেন তা দ্বারা আমাকে উপকৃত করুন এবং আমাকে শিখিয়ে দিন যা আমার উপকার করে এবং আমার ইলম বৃদ্ধি করুন! আর সর্বাবস্থায় সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।

(এ হাদীসটি ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে নিম্নের কথাটুকু বেশী রয়েছে; (আরবী) অর্থাৎ “আমি জাহান্নামবাসী অবস্থা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি)

আল-বাগাভির তাফসির

«فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ»—আল্লাহ মহিমান্বিত; সত্য অস্বীকারকারীদের অবিশ্বাস এবং মুশরিকদের কথাবার্তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।

«وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ»—এখানে নবী ﷺ-কে উদ্দেশ করা হয়েছে। জিবরীল যখন তাঁর কাছে কুরআন নিয়ে অবতরণ করতেন, তখন জিবরীল তিলাওয়াত শেষ করার আগেই নবী ﷺ তাঁর সঙ্গে সঙ্গে পড়তে শুরু করতেন—পাঠের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায়। আল্লাহ তাঁকে তা থেকে নিষেধ করে বললেন:

«وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ»—অর্থাৎ, কুরআন পাঠে তাড়াহুড়ো কোরো না।

«مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ»—অর্থাৎ, জিবরীল তোমার কাছে ওহী পৌঁছে দেওয়া শেষ করার আগে নয়। এর দৃষ্টান্ত আল্লাহর বাণী: «لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ»—‘এটিকে তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার জন্য তুমি এর সঙ্গে তোমার জিহ্বা নাড়বে না’ (সূরা আল-কিয়ামাহ, ৭৫:১৬)। ইয়াকুব «نَقْضِي»—নূন ফাতহাসহ, দাদ কাসরাসহ এবং ইয়া ফাতহাসহ—পড়েছেন; আর «وَحْيَهُ» শব্দটি নসব অবস্থায় পড়েছেন। মুজাহিদ ও কাতাদাহ বলেছেন: এর অর্থ, এর অর্থ তোমার কাছে স্পষ্ট হওয়ার আগে তোমার সাহাবিদের তা পড়ে শোনাবে না এবং তাদের মুখস্থ করাবে না।

«وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا»—অর্থাৎ, কুরআন ও তার অর্থ সম্পর্কে আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। আরেকটি মত হলো: আমাকে যে জ্ঞান দিয়েছেন, তার সঙ্গে আরও জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। ইবন মাসউদ যখন এই আয়াত পড়তেন, তখন বলতেন: ‘হে আল্লাহ, হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান, ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস বৃদ্ধি করুন।’

সমর্থনকারী হাদিস

সুনান ইবন মাজাহ (হাদীস নং ৯২৫)-এ উম্মু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী ﷺ ফজরের নামাজের পর সর্বদা বলতেন: «হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিযিক এবং কবুলকৃত আমল প্রার্থনা করি!»

ট্যাগ
  • #দোয়া
  • #জ্ঞান
  • #কুরআন
  • #ওহী
  • #আদব
  • #নবী মুহাম্মদ

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →