দোয়া 26 জ্ঞান ও সহজতা 6 মিনিট পড়তে

সত্য ও সম্মানের প্রবেশ

নবী মুহাম্মদ ﷺ 17:80
আরবি পাঠ

رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ، وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ، وَاجْعَلْ لِي مِنْ لَدُنْكَ سُلْطَانًا نَصِيرًا.

رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِنْ لَدُنْكَ سُلْطَانًا نَصِيرًا

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। الإسراء 17:80
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Rabbi adkhilnī mudkhala ṣidqin wa-akhrijnī mukhraja ṣidqin waj‘al lī min ladunka sulṭānan naṣīrā
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে (যেখানেই) প্রবেশ করাও, (সেটা কর) সত্য ও সম্মানের প্রবেশ, আর আমাকে (যেখান হতেই) বের কর, (সেটা কর) সত্য ও সম্মানের বহির্গমন, আর তোমার নিকট হতে আমাকে এক সাহায্যকারী শক্তি দান কর।

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

রূপ: ‘আদখিলনী’ (أَدْخِلْنِي), ‘আখরিজনী’ (أَخْرِجْنِي) এবং ‘ইজ‘আল লী’ (اجْعَلْ لِي)—এই শব্দগুলো আদেশসূচক রূপে এসেছে। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের আগে নবী মুহাম্মদ ﷺ এই দোয়া করেছিলেন।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

“আর বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও এবং সত্যতার সঙ্গে বের করো।’” অর্থাৎ, আমার সব প্রবেশ ও প্রস্থানকে তোমার আনুগত্যে এবং তোমার সন্তুষ্টির পথে স্থির করো। কারণ, এর মধ্যে রয়েছে একনিষ্ঠতা এবং আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য।

“আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে এক সাহায্যকারী কর্তৃত্ব দান করো।” অর্থাৎ, আমি যা করি এবং যা বর্জন করি—সেসব বিষয়ে আমাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ ও অকাট্য দলিল দাও। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে যে সর্বোচ্চ অবস্থানে উন্নীত করেন, তা হলো—তার সব অবস্থা কল্যাণময় হবে এবং তাকে তার প্রতিপালকের নিকটবর্তী করবে; আর তার প্রতিটি অবস্থার জন্য থাকবে সুস্পষ্ট প্রমাণ। এর মধ্যে রয়েছে উপকারী জ্ঞান ও সৎকর্ম—বিষয়সমূহ এবং সেগুলোর প্রমাণ সম্পর্কে জ্ঞান।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) মক্কায় ছিলেন, অতঃপর তাঁর প্রতি হিজরতের হুকুম হয় এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি হাসান সহীহবলেছেন) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ মক্কার কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) হত্যা করার অথবা দেশ থেকে বের করে দেয়ার কিংবা বন্দী করার পরামর্শ করে। তখন আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসীকে তাদের দুষ্কর্যের স্বাদ গ্রহণ করাবার ইচ্ছা করেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন।

এই আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মক্কা হতে বের হওয়া ও মদীনায় প্রবেশ করা। এই উক্তিটিই সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ। ইবনু আইয়ায (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শুভ ও সন্তোষজনক ভাবে প্রবেশ দ্বারা মৃত্যু এবং শুভ ও সন্তোষজনকভাবে বের হওয়ার দ্বারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে বুঝানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে আরো উক্তি রয়েছে, কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটাকেই গ্রহণ করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ “বিজয় লাভ ও সাহায্যের জন্যে আমারই নিকট প্রার্থনা কর। এই প্রার্থনার কারণে আল্লাহ তাআলা পারস্য ও রোম দেশ বিজয় এবং সম্মান প্রদানের ওয়াদা করেন।

এটা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতেই পেরেছিলেন যে, বিজয় লাভ ছাড়া দ্বীনের প্রচার, প্রসার এবং শক্তিলাভ সম্ভবপর নয়। এ জন্যেই তিনি মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য ও বিজয় কামনা করেছিলেন যাতে তিনি আল্লাহর কিতাব, তাঁর হুদৃদ, শরীয়তের কর্তব্যসমূহ এবং দ্বীনের প্রতিষ্ঠা চালু করতে পারেন। এই বিজয় দানও আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ রহমত। এটা না হলে একে অপরকে খেয়ে ফেলতো এবং সবল দুর্বলকে শিকার করে নিতো।

কেউ কেউ বলেছেন যে, ‘সুলতান নাসীর' দ্বারা স্পষ্ট দলীল’ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। কেননা, সত্যের সাথে বিজয় ও শক্তিও জরুরী। যাতে সত্যের বিরোধীরা জব্দ থাকে। এই জন্যেই আল্লাহ তাআলা লোহা অবতীর্ণ করার অনুগ্রহকে কুরআন কারীমে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন।

একটি হাদীসে আছে যে, “সালতানাত বা রাজত্বের কারণে আল্লাহ তাআলা এমন বহু মন্দ কার্য বন্ধ করে দেন যা শুধুমাত্র কুরআনের মাধ্যমে বন্ধ করা যেতো না। এটা চরম সত্য কথা যে, কুরআন কারীমের উপদেশাবলী, ওর ওয়াদা, ভীতি প্রদর্শন তাদেরকে তাদের দুষ্কার্য হতে সরাতে পারতো না। কিন্তু ইসলামী শক্তি দেখে ভীত হয়ে তারা দুষ্কার্য হতে বিরত থাকে। এরপর কাফিরদের সতর্ক করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সত্যের আগমন ঘটেছে, যাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।

কুরআন,ঈমান এবং লাভজনক সত্য ইলম আল্লাহর পক্ষ হতে এসে গেছে এবং কুফরী ধ্বংস ও বিলুপ্ত হয়েছে। ওটা সত্যের মুকাবিলায় হাত পা হীন দুর্বল সাব্যস্ত হয়েছে। হক। বাতিলের মস্তক চূণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে। তাই বাতিলের কোন অস্তিত্বই নেই।

সহীহ বুখরীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় (বিজয়ী বেশে। প্রবেশ করেন। সেই সময় বায়তুল্লাহর আশে পাশে তিনশ ষাটটি প্রতিমা ছিল। তিনি তাঁর হাতের লাঠিটি দ্বারা ওগুলিকে আঘাত করেছিলেন এবং মুখে এই আয়াতটি উচ্চারণ করেছিলেন।

অর্থাৎ “সত্যের আগমন ঘটেছে এবং মিথ্যা বিদূরিত হয়েছে, মিথ্যা বিদূরিত হয়েই থাকে।” মুসনাদে আবি ইয়ালায় বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে মক্কায় আগমন করি। ঐ সময় বায়তুল্লাহর আশে পাশে তিন শ ষাটটি মূর্তি ছিল, যেগুলির পূজা অর্চনা করা হতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেনঃ “এগুলিকে উপুড় করে ফেলে দাও।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন।”

আল-বাগাভির তাফসির

আল্লাহ, পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত, বলেন: “আর বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও এবং সত্যতার সঙ্গে বের করো।’” এখানে প্রবেশ ও বের হওয়া বলতে প্রবেশ করানো ও বের করে দেওয়া বোঝানো হয়েছে। এ বিষয়ে তাফসিরকারদের বিভিন্ন মত রয়েছে।

ইবন আব্বাস, হাসান ও কাতাদাহ বলেছেন: “আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও”—অর্থাৎ মদিনায়; “আর আমাকে সত্যতার সঙ্গে বের করো”—অর্থাৎ মক্কা থেকে। নবী ﷺ-কে হিজরতের আদেশ দেওয়া হলে এই আয়াত নাজিল হয়। দাহহাক বলেছেন: “আমাকে সত্যতার সঙ্গে বের করো”—অর্থাৎ মুশরিকদের থেকে নিরাপদ অবস্থায় মক্কা থেকে বের করো; “আর আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও”—অর্থাৎ বিজয়ের মাধ্যমে মক্কায় প্রবেশ করাও।

মুজাহিদ বলেছেন: “আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও”—অর্থাৎ তুমি যে নবুওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছ, সেই দায়িত্বে আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও; আর “আমাকে সত্যতার সঙ্গে বের করো”—অর্থাৎ দুনিয়া থেকে বের করো, এমন অবস্থায় যে আমি তার ওপর আমার কর্তব্য পালন করেছি। হাসান থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: “আমাকে সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও”—অর্থাৎ জান্নাতে; “আর আমাকে সত্যতার সঙ্গে বের করো”—অর্থাৎ মক্কা থেকে। আরও বলা হয়েছে: তোমার আনুগত্যে আমাকে প্রবেশ করাও এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে আমাকে বের করে রাখো।

এর অর্থ এও বলা হয়েছে: তুমি আমাকে যেখানেই প্রবেশ করাও, সত্যতার সঙ্গে প্রবেশ করাও; আর যেখান থেকেই বের করো, সত্যতার সঙ্গে বের করো—অর্থাৎ আমাকে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত করো না, যারা এক মুখ নিয়ে প্রবেশ করে আর অন্য মুখ নিয়ে বের হয়। কারণ, দ্বিমুখী ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিরাপদ ও সম্মানিত হতে পারে না। প্রবেশ ও বের হওয়াকে ‘সত্যতা’ দ্বারা বিশেষিত করা হয়েছে, কারণ এর পরিণতি হলো সাহায্য, সম্মান ও দ্বীনের কর্তৃত্ব—যেমন পা-কে ‘সত্যতার’ সঙ্গে বিশেষিত করে বলা হয়েছে: “তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে সত্যতার এক অগ্রবর্তী মর্যাদা” (ইউনুস, ১০:২)।

“আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে এক সাহায্যকারী কর্তৃত্ব দান করো।” মুজাহিদ বলেছেন: সুস্পষ্ট প্রমাণ। হাসান বলেছেন: এমন শক্তিশালী রাজত্ব, যার মাধ্যমে তুমি আমার বিরোধীদের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করবে; এবং এমন প্রকাশ্য সম্মান, যার দ্বারা আমি তোমার দ্বীন প্রতিষ্ঠা করব। আল্লাহ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি পারস্য, রোম এবং অন্যদের রাজত্ব তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে তা দান করবেন।

কাতাদাহ বলেছেন: আল্লাহর নবী ﷺ জানতেন যে, কর্তৃত্ব ছাড়া এই দায়িত্ব পালনের শক্তি তাঁর নেই। তাই তিনি সাহায্যকারী কর্তৃত্ব চেয়েছিলেন—অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব, তার বিধানসমূহ এবং তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠা। ‘নসীর’ অর্থ সাহায্যকারী।

সমর্থনকারী হাদিস

‘সুনান আত-তিরমিযী’ (নং ৩১৩৯)-তে ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী ﷺ-কে যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার আদেশ দেওয়া হয়, তখন এই দোয়াটি নাজিল হয়।

ট্যাগ
  • #দোয়া
  • #হিজরত
  • #মদিনা
  • #সত্য
  • #আল্লাহর সাহায্য
  • #নবুওয়াত

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →