رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً، وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا.
رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
যুবকরা যখন গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করল তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তোমার নিকট হতে আমাদেরকে রহমত দান কর আর আমাদের ব্যাপারটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন কর।’
এখানে ব্যবহৃত ক্রিয়ারূপ দুটি হলো ‘আতিনা’ (آتِنَا — আমাদের দান করুন) এবং ‘হাইয়ি’ (هَيِّئْ — আমাদের জন্য প্রস্তুত বা সহজ করে দিন)। এটি ছিল মুশরিক শাসকের অত্যাচার থেকে নিজেদের ঈমান রক্ষার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাওয়া মুমিন যুবকদের দোয়া।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
এরপর আল্লাহ তাদের ঘটনা সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন; পরে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: «যখন যুবকেরা গুহায় আশ্রয় নিল»—অর্থাৎ, তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকদের দ্বারা ঈমানের পরীক্ষায় পড়া থেকে বাঁচতে এবং নিরাপদ থাকতে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল।
«তখন তারা বলল: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন»—অর্থাৎ, এমন রহমত, যার মাধ্যমে আপনি আমাদেরকে অবিচল রাখবেন, অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং কল্যাণের তাওফীক দেবেন। «আর আমাদের কাজকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করুন»—অর্থাৎ, সঠিক পথের দিকে নিয়ে যায় এমন প্রতিটি উপায় আমাদের জন্য সহজ করে দিন এবং আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয়গুলো সংশোধন করে দিন।
তারা ফিতনা থেকে পালিয়ে এমন স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিল, যেখানে আত্মগোপন করা সম্ভব; একই সঙ্গে তারা বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর কাছে নিজেদের বিষয়গুলো সহজ করার প্রার্থনা করেছিল। তারা নিজেদের ওপর কিংবা সৃষ্টির ওপর নির্ভর করেনি। এ কারণে আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেছিলেন।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
৯-১২ নং আয়াতের তাফসীর: আসহাবে কাহফের ঘটনা প্রথমে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হচ্ছে, পরে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হবে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আসহাবে কাহফের এই ঘটনাটি আমার ক্ষমতা প্রকাশের অসংখ্য ঘটনাবলীর মধ্যে একটি সাধারণ ঘটনা মাত্র। এর চেয়ে বড় বড় ঘটনা দৈনন্দিন তোমাদের চোখের সামনে ঘটতে রয়েছে। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি, দিবস ও রজনীর পরিবর্তন, সূর্য ও চন্দ্রের আনুগত্য ইত্যাদি হচ্ছে মহা ক্ষমতাবানের ক্ষমতার নিদর্শনসমূহ, যেগুলি এটাই প্রকাশ করছে যে, আল্লাহ তাআলা সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী।
তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তার কাছে কোন কিছুই কঠিন নয়। অসহাবে কাহফের চেয়ে তো বড় বড় বিস্ময়কর ঘটনা তোমাদের সামনেই বিদ্যমান রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কিতাব ও সুন্নাহর যে জ্ঞান আমি তোমাকে দান করেছি তার গুরুত্ব আসহাবে কাহফের ঘটনা অপেক্ষা অনেক বেশী।
অনেক হুজ্জত ও প্রমাণ আমি বান্দাদের উপর খুলে দিয়েছি যা আসহাবে কাহফের ঘটনা অপেক্ষা বেশী প্রকাশমান। কাহফ বলা হয় পাহাড়ের গর্তকে। সেখানে এই যুবকরা লুকিয়ে গিয়েছিলেন। রাকীম’ হয় ঈলা পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী একটি উপত্যকার নাম, না হয় ঐ জায়গায় একটি অট্টালিকার নাম, কিংবা কোন জনপদের নাম অথবা ঐ পাহাড়ের নাম।
ঐ পাহাড়ের নাম নাজলুসও বলা হয়েছে এবং গুহার নাম বলা হয়েছে হায়রূম। ঐ যুবকদের কুকুরটির নাম হামরান বলা হয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “সমস্ত কুরআন আমার জানা আছে, কিন্তু ‘হানান’ বা ‘আওয়াহ এবং রাকীম’ শব্দ সম্পর্কে আমার অবগতি নেই। আমার জানা নেই যে, রাকীম' কিতাবের নাম কি ঐ ভিত্তির নাম।
তার থেকে আর একটি রিওয়াইয়াত বর্ণিত আছে যে, রাকীম' হচ্ছে কিতাব। সাঈদ (রঃ) বলেন যে, ওটা পাথরের একটি ফলক ছিল যার উপর আসহাবে কাফের ঘটনা লিখে ঐ গুহার দরজার উপর লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমে (আরবী) রয়েছে অর্থাৎ চিহ্নিত লিখিত কিতাব। সুতরাং আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দ্বারা এরই পৃষ্ঠ পোষকতা করা হচ্ছে।
আর এটাই ইমাম ইবনু জারীরের (রঃ) পছন্দনীয় উক্তি (আরবী) এর ওযনে (আরবী) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবী) এবং (আরবী) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই যুবকরা তাদের দ্বীনকে রক্ষা করার জন্যে নিজেদের কওমের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের ভয় ছিল যে, না জানি তারা তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলে।
পালিয়ে গিয়ে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের উপর রহমত নাযিল করুন। আমাদেরকে আমাদের কওম হতে লুকিয়ে রাখুন এবং আমাদের এই কাজের পরিণতি ভাল করুন।” হাদীসে একটি দুআ’য় রয়েছে “হে আল্লাহ!
আমাদের ব্যাপারে আপনি যে ফায়সালা করবেন তার পরিণাম অমাদের জন্যে ভাল করুন।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রার্থনায় আরজ করতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সমস্ত কাজের পরিণাম ভাল করুন! আমাদেরকে দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিন।
ঐ গুহায় প্রবেশ করে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন এবং ঘুমের মধ্যেই বহু বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাগ্রত করেন। তাদের মধ্যে একজন দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) নিয়ে সওদা খরিদের উদ্দেশ্যে বাজাব্বে দিকে রওয়ানা হন, যেমন সামনে আসছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ“পরে আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম এটা জানবার জন্যে যে, দুই দলের।
মধ্যে কোন্টি তাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।( আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে, সংখ্যা ব্য গণনা। আবার এই কথাও বলা হয়েছে যে, এই শব্দটি (আরবী) (শেষ সীমা)-এর অর্থেও এসে থাকে। আরব কবিরা তাদের কবিতার মধ্যেও এটাকে' (আরবী) এর অর্থেই প্রয়োগ করেছেন।
আল-বাগাভির তাফসির
এরপর আল্লাহ আসহাবে কাহফের ঘটনা উল্লেখ করেছেন: «যখন যুবকেরা গুহায় আশ্রয় নিল»—অর্থাৎ, তারা গুহায় গিয়ে সেখানে অবস্থান করল। গুহায় যাওয়ার কারণ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ইবন ইয়াসার বলেন: ইনজিলের অনুসারীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের মধ্যে পাপ বেড়ে গিয়েছিল এবং শাসকেরা সীমালঙ্ঘন করেছিল; এমনকি তারা মূর্তিপূজা শুরু করেছিল এবং বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই করত। তাদের মধ্যে কিছু লোক তখনো ঈসা (আ.)-এর দ্বীনে অবিচল ছিল এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর একত্বে বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে ছিল। তাদের শাসকদের মধ্যে রোমের এক রাজা ছিল, যার নাম ছিল ‘দাকিয়ানুস’। সে মূর্তিপূজা করত, বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই করত এবং তার বিরোধিতাকারীদের হত্যা করত।
সে রোমের বিভিন্ন জনপদে যেত; যে জনপদেই অবতরণ করত, সেখানকার কাউকে বাদ দিত না—হয় তাকে মূর্তিপূজা ও বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই করতে বাধ্য করত, নয়তো হত্যা করত। অবশেষে সে আসহাবে কাহফের নগরী ‘আফসুস’-এ এসে পৌঁছল।
সে সেখানে অবতরণ করলে মুমিনদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠল। তারা তার ভয়ে আত্মগোপন করল এবং বিভিন্ন দিকে পালিয়ে গেল। দাকিয়ানুস সেখানে আসার পর আদেশ দিল, মুমিনদের খুঁজে এনে তার কাছে সমবেত করা হোক। সে নগরীর কাফিরদের মধ্য থেকে প্রহরী নিয়োগ করল, যারা মুমিনদের অবস্থান খুঁজে বের করে তাদের তার কাছে নিয়ে আসত।
তখন সে তাদের সামনে দুটি বিকল্প রাখত: হয় হত্যা, নয়তো মূর্তিপূজা ও বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই। তাদের কেউ জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তা মেনে নিত, আর কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করতে অস্বীকার করায় নিহত হতো।
আল্লাহর প্রতি ঈমানে দৃঢ় লোকদের অবস্থা দেখে তারা শাস্তি ও মৃত্যুর মুখে নিজেদের সমর্পণ করতে লাগল। তাদের হত্যা করা হতো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হতো; তারপর কাটা অঙ্গগুলো নগরীর দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ও প্রতিটি দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হতো। ফিতনা যখন ভয়াবহ রূপ নিল, তখন যুবকেরা খুব ব্যথিত হলো। তারা উঠে নামাজ, রোজা, সদকা, তাসবিহ ও দোয়ায় মশগুল হলো।
তারা ছিল রোমের অভিজাত পরিবারের লোক এবং সংখ্যায় ছিল আটজন। তারা কাঁদল, আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করল এবং বলতে লাগল: ‘আমাদের প্রতিপালক আসমানসমূহ ও জমিনের প্রতিপালক। আমরা তাঁকে ছাড়া আর কাউকে উপাস্য বলে ডাকব না। তা করলে নিশ্চয়ই সীমালঙ্ঘনমূলক কথা বলা হবে।
আমাদের মুমিন বান্দাদের থেকে এই ফিতনা দূর করুন এবং তাদের ওপর থেকে এই বিপদ উঠিয়ে নিন, যাতে তারা প্রকাশ্যে আপনার ইবাদত করতে পারে।’
এমন অবস্থায় তারা তাদের নামাজের স্থানে ছিল। প্রহরীরা এসে তাদের সিজদারত অবস্থায় পেল; তারা মুখমণ্ডল মাটিতে রেখে কাঁদছিল ও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিল। প্রহরীরা বলল: ‘রাজের আদেশ পালনে তোমাদের বিলম্ব হলো কেন? চলো, তার কাছে যাও।’
তারা বেরিয়ে গেল। প্রহরীরা দাকিয়ানুসকে তাদের খবর দিল: ‘আপনি আপনার দেবতাদের উদ্দেশে পশু জবাইয়ের জন্য লোকদের সমবেত করছেন, অথচ আপনার পরিবারের এই যুবকেরা আপনাকে উপহাস করছে এবং আপনার আদেশ অমান্য করছে!’
এ কথা শুনে রাজা তাদের ডেকে পাঠাল। তাদের আনা হলে তাদের চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল এবং মুখমণ্ডল ধুলায় মলিন ছিল। রাজা বলল: ‘পৃথিবীতে যেসব দেবতার উপাসনা করা হয়, তাদের উদ্দেশে জবাইয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তোমরা কেন আমাদের নগরীর নেতৃস্থানীয় লোকদের অনুসরণ করনি? বেছে নাও: আমাদের দেবতাদের উদ্দেশে জবাই করবে, নতুবা আমি তোমাদের হত্যা করব।’
তাদের মধ্যে বয়সে বড় মাকসালমিনা বলল: ‘আমাদের একজন রব আছেন, যাঁর মহিমা আসমানসমূহ ও জমিন পূর্ণ করে রেখেছে। আমরা কখনো তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য বলে ডাকব না। আমাদের অন্তর থেকে একনিষ্ঠভাবে চিরকাল তাঁরই প্রশংসা, মহত্ত্ব ঘোষণা ও পবিত্রতা বর্ণনা করি। আমরা তাঁরই ইবাদত করি এবং তাঁর কাছেই মুক্তি ও কল্যাণ চাই।
আর বাতিল উপাস্যদের আমরা কখনোই উপাসনা করব না। আপনি আমাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা করুন।’ মাকসালমিনার সঙ্গীরাও দাকিয়ানুসকে একই কথা বলল।
তারা এ কথা বললে রাজা আদেশ দিল, তাদের পরনের অভিজাত পোশাক খুলে নেওয়া হোক। তারপর বলল: ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে পরে ব্যবস্থা করব; তোমাদের শাস্তির যে হুমকি দিয়েছি, তা কার্যকর করব। তবে এখনই তা করছি না, কারণ তোমাদের বয়স কম। তোমাদের ধ্বংস করার আগে এমন কিছু সময় দিতে চাই, যাতে তোমরা ভেবে দেখো এবং বিবেচনা করে ফিরে আসো।’
এরপর তাদের পরনের সোনা-রুপার অলংকার খুলে নেওয়ার আদেশ দিয়ে তাদের সেখান থেকে বের করে দিল।
দাকিয়ানুস নিজের কিছু কাজের জন্য তাদের নগরীর কাছাকাছি অন্য এক নগরে চলে গেল। রাজা চলে গেছে দেখে যুবকেরা তার ফিরে আসার আগেই নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল। তারা স্থির করল, প্রত্যেকে বাবার ঘর থেকে কিছু খরচের টাকা নেবে, তা থেকে সদকা করবে এবং বাকি টাকা দিয়ে রসদ সংগ্রহ করবে। তারপর নগরীর কাছের ‘বাখলুস’ নামের পাহাড়ের গুহায় চলে যাবে এবং সেখানে আল্লাহর ইবাদত করবে।
দাকিয়ানুস ফিরে এলে তার সামনে হাজির হবে; এরপর সে তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা করুক।
তারা এ সিদ্ধান্ত নিলে প্রত্যেক যুবক নিজ নিজ বাবার ঘরে গিয়ে কিছু খরচের টাকা নিল, তার কিছু সদকা করল এবং বাকি টাকা সঙ্গে নিয়ে রওনা হলো। তাদের একটি কুকুরও পিছু নিল। তারা সেই গুহায় পৌঁছে সেখানে অবস্থান করল। কাব আল-আহবার বলেন: তারা একটি কুকুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল; কুকুরটি তাদের পিছু নিলে তারা তাকে তাড়িয়ে দিল।
সে বারবার একই কাজ করল। তখন কুকুরটি বলল: ‘হে লোকেরা, তোমরা আমার কাছ থেকে কী চাও? আমার দিক থেকে ভয় কোরো না। আমি আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসি। তোমরা ঘুমাও, আমি তোমাদের পাহারা দেব।’ ইবন আব্বাস বলেন: তারা রাতে দাকিয়ানুসের কাছ থেকে পালিয়েছিল।
তারা ছিল সাতজন। পথে এক রাখালের সঙ্গে তাদের দেখা হয়; তার একটি কুকুর ছিল। রাখাল তাদের দ্বীনের অনুসারী হয়ে তাদের সঙ্গে গেল, আর তার কুকুরটিও তাদের পিছু নিল। তারা নগরী থেকে বেরিয়ে নগরীর কাছের গুহায় পৌঁছল।
ইবন ইসহাক বলেন: গুহায় তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় নামাজ, রোজা, তাসবিহ, তাকবির ও তাহমিদ ছাড়া অন্য কোনো কাজে লিপ্ত ছিল না। নিজেদের রসদের দায়িত্ব তারা তাদের একজন যুবকের ওপর দিয়েছিল, যার নাম ছিল তামলিখা। সে ছিল তাদের মধ্যে সুদর্শন ও শক্তিশালী। নগরীতে প্রবেশের সময় সে নিজের সুন্দর পোশাক খুলে ভিক্ষা করে এমন দরিদ্রদের পোশাক পরত।
এরপর নিজের রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে নগরীতে গিয়ে তাদের জন্য খাবার ও পানীয় কিনত এবং সে ও তার সঙ্গীদের সম্পর্কে কোনো কথা হয়েছে কি না, তা গোপনে খোঁজ নিত। তারপর তাদের কাছে ফিরে আসত। তারা এভাবে কিছু সময় কাটাল। এরপর দাকিয়ানুস নগরীতে ফিরে এসে নগরীর নেতাদের বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই করার আদেশ দিল।
মুমিনেরা আতঙ্কিত হলো। তামলিখা তখন নগরীতে তার সঙ্গীদের জন্য খাবার কিনছিল। অল্প খাবার নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে তাদের কাছে ফিরে এসে জানাল, অত্যাচারী রাজা নগরীতে এসেছে, তাদের কথা বলা হয়েছে এবং নগরীর নেতাদের সঙ্গে তাদের খোঁজ করা হচ্ছে। তারা ভীত হয়ে পড়ল, সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া ও কাকুতি-মিনতি করল এবং ফিতনা থেকে আশ্রয় চাইল।
এরপর তামলিখা তাদের বলল: ‘হে আমার ভাইয়েরা, মাথা তুলুন, খাবার গ্রহণ করুন এবং আপনাদের রবের ওপর ভরসা করুন।’ তারা মাথা তুলল; তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। তারা খাবার খেল। তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। তারপর তারা বসে কথা বলল, একে অপরকে শিক্ষা দিল এবং স্মরণ করিয়ে দিল।
এমন সময় আল্লাহ গুহায় তাদের কানে ঘুম চাপিয়ে দিলেন। তাদের কুকুরটি গুহার দরজায় সামনের পা দুটো প্রসারিত করে ছিল; তাদের ওপর যা ঘটল, তার ওপরও তা ঘটল। তারা ছিল মুমিন ও দৃঢ়বিশ্বাসী। তাদের রসদ তাদের মাথার কাছে ছিল।
পরদিন দাকিয়ানুস তাদের না পেয়ে খোঁজ করল, কিন্তু পেল না। সে কাউকে বলল: ‘এই যুবকদের ব্যাপার আমাকে কষ্ট দিয়েছে। তারা অজ্ঞতাবশত ভেবেছে, আমি তাদের ওপর রাগ করেছি। তারা তওবা করে আমার দেবতাদের উপাসনা করলে আমি তাদের শাস্তি দিতাম না।’
নগরীর নেতারা বলল: ‘আপনি কি এমন পাপিষ্ঠ, বিদ্রোহী ও অবাধ্য লোকদের প্রতি দয়া দেখানোর যোগ্য? আপনি তো তাদের সময়সীমা দিয়েছিলেন। চাইলে সেই সময়ের মধ্যে তারা ফিরে আসতে পারত, কিন্তু তারা তওবা করেনি।’ তাদের কথা শুনে রাজা প্রচণ্ড রেগে গেল।
সে যুবকদের বাবাদের ডেকে এনে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল: ‘আমাকে বলো, আমার অবাধ্য বিদ্রোহী ছেলেরা কোথায়?’ তারা বলল: ‘আমরা তো আপনার অবাধ্য হইনি। যারা বিদ্রোহী, তারা আমাদের সম্পদ নিয়ে নগরীর বাজারে নষ্ট করেছে, তারপর ‘বাখলুস’ নামের পাহাড়ে উঠে গেছে। আপনি তাদের কারণে আমাদের হত্যা করবেন কেন?’
এ কথা শুনে রাজা তাদের ছেড়ে দিল। যুবকদের ব্যাপারে কী করবে, তা সে বুঝতে পারছিল না। আল্লাহ তার মনে এ কথা ঢেলে দিলেন যে, গুহাটি বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ চেয়েছিলেন, তাদের সম্মানিত করতে, তাদের পরবর্তীকালে আগত এক জাতির জন্য নিদর্শন করতে এবং তাদের কাছে স্পষ্ট করে দিতে যে, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী—এতে কোনো সন্দেহ নেই—এবং আল্লাহ কবরবাসীদের পুনরুত্থিত করবেন।
দাকিয়ানুস গুহাটি বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ দিল। সে বলল: ‘তাদের গুহার মধ্যে যেমন আছে, তেমনই থাকতে দাও। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তারা মারা যাবে; তাদের পছন্দ করা গুহাই তাদের কবর হবে।’ সে মনে করেছিল, তারা জেগে আছে এবং তাদের সঙ্গে কী করা হচ্ছে তা বুঝতে পারছে।
অথচ আল্লাহ তাদের আত্মাকে ঘুমের মতো অবস্থায় কবজ করেছিলেন। তাদের কুকুর গুহার দরজায় সামনের পা দুটো প্রসারিত করে ছিল। তাদের ওপর যা ঘটেছিল, তা-ই ঘটল; তারা ডান ও বাম পাশে কাত হতে থাকল।
এরপর রাজা দাকিয়ানুসের প্রাসাদে দুজন মুমিন ব্যক্তি ছিলেন, যারা নিজেদের ঈমান গোপন রাখতেন। একজনের নাম ‘ইয়ানদ্রুস’, অন্যজনের নাম ‘রুনাস’। তারা যুবকদের ঘটনা, বংশপরিচয়, নাম ও অবস্থা সীসার ফলকে লিখে তা তামার সিন্দুকে রেখে নির্মাণকাজের মধ্যে স্থাপন করার পরামর্শ করলেন। তারা বললেন: ‘হয়তো কিয়ামতের আগে আল্লাহ এই যুবকদের ব্যাপারে কোনো মুমিন সম্প্রদায়কে অবহিত করবেন।
যারা তাদের খুঁজে পাবে, তারা এই লেখা পড়ে তাদের কথা জানতে পারবে।’ তারা তা করলেন এবং তার ওপর নির্মাণ করে দিলেন। দাকিয়ানুস যত দিন বেঁচেছিল, তত দিন বেঁচে থাকল; তারপর সে ও তার জাতি মারা গেল। এরপর বহু প্রজন্ম পার হলো এবং একের পর এক রাজা ক্ষমতায় এল।
উবাইদ ইবন উমাইর বলেন: আসহাবে কাহফ ছিল অলংকার ও বালা পরিহিত, লম্বা চুলের যুবক। তাদের সঙ্গে শিকারের কুকুর ছিল। তারা এক মহা উৎসবে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ও শোভাযাত্রাসহ বের হয়েছিল এবং তাদের উপাস্য দেবতাদেরও সঙ্গে নিয়েছিল। আল্লাহ যুবকদের অন্তরে ঈমান নিক্ষেপ করেছিলেন।
তাদের একজন ছিল রাজার মন্ত্রী। তারা ঈমান আনল, তবে প্রত্যেকেই নিজের ঈমান গোপন রাখল। তারা মনে মনে বলল: ‘এই লোকদের মাঝখান থেকে বেরিয়ে যাই, যাতে তাদের অপরাধের কারণে আমাদের শাস্তি না হয়।’ তাদের একজন যুবক বেরিয়ে একটি গাছের ছায়ায় বসে পড়ল।
এরপর আরেকজন বেরিয়ে এসে তাকে একা বসে থাকতে দেখে আশা করল, সে-ও তার মতো একই মতের অনুসারী—যদিও তা প্রকাশ করল না। তারপর আরেকজন বেরিয়ে এলে তারা একত্র হলো। একজন আরেকজনকে বলল: ‘তোমরা এখানে কী কারণে একত্র হয়েছ?’ প্রত্যেকে নিজের নিরাপত্তার ভয়ে সঙ্গীর কাছে ঈমান গোপন রেখেছিল।
তারপর তারা বলল, প্রত্যেক যুবক যেন আলাদাভাবে কারও সঙ্গে নির্জনে কথা বলে এবং নিজের গোপন কথা তাকে জানায়। তারা তা করলে দেখা গেল, সবাই একই ঈমানের অনুসারী। তাদের কাছেই পাহাড়ে একটি গুহা ছিল। তাদের একজন বলল: ‘তাহলে গুহায় আশ্রয় নাও; তোমাদের রব তাঁর রহমত তোমাদের জন্য বিস্তৃত করে দেবেন।’
তারা তাদের শিকারি কুকুরসহ গুহায় প্রবেশ করল এবং সেখানে তিনশ বছর অবস্থান করল, আরও নয় বছর বেশি। তাদের সম্প্রদায় তাদের না পেয়ে খুঁজল, কিন্তু আল্লাহ তাদের চিহ্ন ও গুহার অবস্থান তাদের কাছ থেকে আড়াল করে দিলেন। তারা একটি ফলকে যুবকদের নাম ও বংশপরিচয় লিখল: ‘অমুক, অমুক ও অমুক—আমাদের রাজাদের সন্তান। অমুকের শাসনামলে অমুক মাসের অমুক দিনে তারা নিখোঁজ হয়েছে।’
তারা ফলকটি রাজার ভান্ডারে রেখে বলল: ‘নিশ্চয়ই একদিন এই ঘটনার তাৎপর্য প্রকাশ পাবে।’ সেই রাজা মারা গেল; তারপর একের পর এক প্রজন্ম এল।
ওহব ইবন মুনাব্বিহ বলেন: ঈসা (আ.)-এর একজন হাওয়ারি আসহাবে কাহফের নগরীতে এলেন এবং সেখানে প্রবেশ করতে চাইলেন। তাকে বলা হলো: ‘নগরীর দরজায় একটি মূর্তি আছে; যে-ই নগরীতে প্রবেশ করে, তাকে সেটির সামনে সিজদা করতে হয়।’ তিনি প্রবেশ করতে অপছন্দ করলেন। এরপর নগরীর কাছে একটি গোসলখানায় এলেন এবং সেখানে কাজ করার জন্য গোসলখানার মালিকের কাছে নিজেকে ভাড়া দিলেন।
গোসলখানার মালিক তার কাজে বরকত দেখতে পেল এবং নগরীর কয়েকজন যুবক তার সঙ্গে যুক্ত হলো। তিনি তাদের আসমান ও জমিনের সংবাদ এবং আখিরাতের কথা বলতে থাকলেন, ফলে তারা ঈমান আনল এবং তাকে সত্য বলে মানল। তিনি গোসলখানার মালিকের সঙ্গে শর্ত করেছিলেন: ‘রাত আমার; এই সময়ে কেউ আমার ও নামাজের মাঝে বাধা হবে না।’ এভাবেই চলছিল।
একদিন রাজার ছেলে এক নারীকে নিয়ে গোসলখানায় ঢুকল। হাওয়ারি তাকে ভর্ৎসনা করে বললেন: ‘তুমি রাজার ছেলে হয়ে এই নারীর সঙ্গে এখানে আসছ?’ সে লজ্জিত হয়ে চলে গেল। আরেকবার ফিরে এলে তিনি তাকে একই কথা বললেন। এবার সে তাকে গালমন্দ করল, ধমক দিল এবং কথায় কর্ণপাত করল না; তারপর দুজনে একসঙ্গে সেখানে প্রবেশ করে মারা গেল।
রাজাকে খবর দেওয়া হলো: ‘গোসলখানার মালিক আপনার ছেলেকে হত্যা করেছে।’ তাকে খুঁজতে গেলেও পাওয়া গেল না; সে পালিয়ে গিয়েছিল। রাজা জিজ্ঞেস করল: ‘তার সঙ্গী কারা ছিল?’ যুবকদের নাম বলা হলে তাদের খোঁজ করা হলো। তারা নগরী থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং পথে তাদের মতো ঈমানদার এক সঙ্গীর সঙ্গে দেখা হলো।
সে তাদের সঙ্গে চলল; তার সঙ্গে একটি কুকুরও ছিল। রাত তাদের গুহায় পৌঁছে দিল। তারা গুহায় প্রবেশ করে বলল: ‘ইনশাআল্লাহ, সকাল হলে তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্ত নেবে।’ আল্লাহ তাদের কানে ঘুম চাপিয়ে দিলেন। রাজা তার লোকদের নিয়ে তাদের খুঁজতে বেরিয়ে অবশেষে তাদের পেয়ে গেল।
তারা গুহায় প্রবেশ করতে চাইলে একজন ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল; কেউই ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না। তাদের একজন বলল: ‘তুমি যদি তাদের পেতে, তাহলে কি তাদের হত্যা করতে?’ রাজা বলল: ‘হ্যাঁ।’ সে বলল: ‘তাহলে গুহার প্রবেশপথ বন্ধ করে তাদের ওপর প্রাচীর তুলে দাও।’
এরপর বৃষ্টিতে এক রাখাল গুহার কাছে আশ্রয় নিল। সে বলল: ‘গুহাটি খুলে আমার ভেড়াগুলোকে বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখলে ভালো হতো।’ সে গুহাটি খোলার চেষ্টা করতে থাকল, শেষ পর্যন্ত তা খুলে ফেলল। পরদিন সকালে আল্লাহ তাদের আত্মা ফিরিয়ে দিলেন।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন: এরপর সেই অঞ্চলের রাজত্বে ‘বিদরুস’ নামের একজন সৎ রাজা অধিষ্ঠিত হলেন। তিনি আটষট্টি বছর রাজত্ব করার পর লোকেরা তাঁর রাজত্বকালে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একদল আল্লাহর প্রতি ঈমান আনত এবং জানত যে কিয়ামত সত্য; অন্যদল তা অস্বীকার করত। সৎ রাজা এতে অত্যন্ত কষ্ট পেলেন।
তিনি কাঁদলেন, আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করলেন এবং মিথ্যাপন্থীদের সংখ্যা ও প্রভাব বাড়তে দেখে গভীরভাবে দুঃখিত হলেন। তারা বলত: ‘দুনিয়ার জীবন ছাড়া আর কোনো জীবন নেই; আত্মার পুনরুত্থান হবে, দেহের নয়।’ বিদরুস যাদের ভালো মনে করতেন এবং মানুষের মধ্যে নেতা ছিলেন, তাদের কাছে লোক পাঠালেন। কিন্তু তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করতে লাগল; এমনকি তারা মানুষকে সত্য ও হাওয়ারিদের দ্বীন থেকে সরিয়ে দেওয়ার উপক্রম করল।
সৎ রাজা তা দেখে নিজের ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করলেন। তিনি মোটা চট পরলেন, তার নিচে ছাই বিছিয়ে তার ওপর বসলেন। দীর্ঘ সময় তিনি রাতদিন আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করলেন ও কাঁদলেন: ‘হে আমার রব, আপনি তো এদের মতবিরোধ দেখছেন। তাদের কাছে এমন একটি নিদর্শন পাঠান, যা তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট করবে।’
তখন পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহ—যিনি তাঁর বান্দাদের ধ্বংস চান না—আসহাবে কাহফকে প্রকাশ করার, মানুষের কাছে তাদের ঘটনা স্পষ্ট করার এবং তাদেরকে মানুষের বিরুদ্ধে নিদর্শন ও প্রমাণ করার ইচ্ছা করলেন, যাতে তারা জানতে পারে যে কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এভাবে তিনি তাঁর সৎ বান্দা বিদরুসের দোয়া কবুল করলেন, তার প্রতি অনুগ্রহ পূর্ণ করলেন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুমিনদের একত্র করলেন।
আল্লাহ সেই গুহাবিশিষ্ট নগরীর এক ব্যক্তির মনে এ কথা ঢেলে দিলেন যে, গুহার মুখের ওপর নির্মিত স্থাপনাটি ভেঙে তার পাথর দিয়ে ভেড়ার জন্য ঘের বানাবে। লোকটির নাম ছিল ‘আউলিয়ানুস’। সে দুজন শ্রমিক ভাড়া করল। তারা পাথর সরিয়ে ভেড়ার ঘের বানাতে লাগল, শেষ পর্যন্ত গুহার মুখের ওপরের সবকিছু সরিয়ে গুহার প্রবেশপথ খুলে দিল।
আল্লাহ ভয়ের মাধ্যমে তাদেরকে মানুষের চোখের আড়ালে রাখলেন। গুহার দরজা খুললে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী, মৃতদের জীবিতকারী আল্লাহ যুবকদের গুহার ভেতরে বসার অনুমতি দিলেন। তারা আনন্দিত অবস্থায়, উজ্জ্বল মুখ ও প্রশান্ত অন্তর নিয়ে বসল। তারা পরস্পরকে সালাম দিল।
তাদের মনে হলো, যেন আগের রাতের ঘুম থেকে এখনই জেগে উঠেছে। এরপর তারা নামাজে দাঁড়াল এবং আগের মতোই নামাজ পড়ল। তাদের মুখমণ্ডল কিংবা গায়ের রঙে এমন কিছু দেখা যাচ্ছিল না, যা তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়; ঘুমিয়ে পড়ার সময় যেমন ছিল, তেমনই ছিল। তারা মনে করছিল, দাকিয়ানুস এখনো তাদের খুঁজছে।
নামাজ শেষ হলে তারা নিজেদের খাবারের দায়িত্বে থাকা তামলিখাকে বলল: ‘গত সন্ধ্যায় এই অত্যাচারীর কাছে লোকেরা আমাদের ব্যাপারে কী বলেছিল, তা আমাদের জানাও।’ তারা মনে করছিল, অন্য সময়ের মতোই কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিল। তবে তাদের কাছে মনে হচ্ছিল, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ঘুমিয়েছে; তাই তারা নিজেদের মধ্যে জিজ্ঞেস করল: ‘তোমরা কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলে?’ তারা বলল: ‘এক দিন, অথবা দিনের কিছু অংশ।’
তারপর বলল: ‘তোমরা কতক্ষণ ছিলে, তা তোমাদের রবই ভালো জানেন।’ তাদের কাছে ব্যাপারটি সামান্য সময়ের মনে হচ্ছিল।
তামলিখা তাদের বলল: ‘নগরীতে তোমাদের খোঁজ করা হয়েছিল, কিন্তু তোমাদের পাওয়া যায়নি। আজ তোমাদের ধরে এনে বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে জবাই করা হবে, অথবা হত্যা করা হবে—এরপর আল্লাহ যা চান, তা-ই হবে।’ মাকসালমিনা তাদের বলল: ‘হে আমার ভাইয়েরা, জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। আল্লাহর শত্রু তোমাদের ডাকলে ঈমান আনার পর কুফরি কোরো না।’
এরপর তারা তামলিখাকে বলল: ‘নগরীতে যাও, আমাদের সম্পর্কে কী বলা হচ্ছে এবং দাকিয়ানুসের কাছে আমাদের কথা কীভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে, তা শুনে এসো। সতর্ক থেকো, কেউ যেন তোমাকে চিনতে না পারে। আমাদের জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসো। আমরা যে খাবার এনেছিলাম, তার চেয়ে আরও কিছু নিয়ে এসো; আমরা ক্ষুধার্ত।’
তামলিখা আগের মতোই কাজ করল। নিজের পোশাক খুলে ছদ্মবেশের পোশাক পরল এবং রৌপ্যমুদ্রা নিল। গুহার মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখল, প্রবেশপথের পাথর সরানো হয়েছে। এতে সে বিস্মিত হলো, কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে এগিয়ে গেল। নগরীর দরজায় সে গোপনে পৌঁছল; নগরীর কেউ তাকে চিনে ফেলবে—এই ভয়ে সে পথ এড়িয়ে চলছিল।
তার জানা ছিল না, দাকিয়ানুস ও তার লোকেরা তিনশ বছর আগেই মারা গেছে। নগরীর দরজায় পৌঁছে সে চোখ তুলে দরজার ওপর ঈমানদারদের জন্য ব্যবহৃত একটি চিহ্ন দেখল। ঈমান যখন প্রকাশ্যে থাকে, তখন এই চিহ্নও প্রকাশ্যে থাকে। তা দেখে সে বিস্মিত হলো।
গোপনে তাকিয়ে ডানে-বামে চাইল, তারপর সেই দরজা ছেড়ে নগরীর অন্য একটি দরজায় গেল; সেখানেও একই চিহ্ন দেখল। তখন তার মনে হলো, নগরীটি তার পরিচিত নগরী নয়। সে অনেক নতুন লোক দেখল, যাদের আগে কখনো দেখেনি। সে হাঁটতে হাঁটতে বিস্মিত হলো; তার মনে হচ্ছিল, সে দিশেহারা হয়ে গেছে।
তারপর যে দরজা দিয়ে এসেছিল, সেখানে ফিরে এসে মনে মনে বলল: ‘আশ্চর্য! গতকাল সন্ধ্যায় মুসলমানেরা এই চিহ্ন লুকিয়ে রাখত এবং গোপন করত; আর আজ তা প্রকাশ্যে! আমি কি ঘুমিয়ে আছি?’ কিন্তু সে নিজেকে ঘুমন্ত মনে করল না। সে নিজের চাদর মাথায় দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করল।
বাজারের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনল, লোকেরা ঈসা ইবন মারইয়ামের নামে শপথ করছে। এতে তার বিভ্রান্তি আরও বেড়ে গেল। সে নগরীর একটি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল: ‘আল্লাহর কসম, আমি বুঝতে পারছি না—গতকাল সন্ধ্যায় পৃথিবীর বুকে ঈসা ইবন মারইয়ামের নাম উল্লেখ করলেই তাকে হত্যা করা হতো; আর আজ সকালে শুনছি, প্রত্যেকে তাঁর নাম বলছে, কেউ ভয়ও করছে না! হয়তো এটি সেই নগরী নয়, যা আমি চিনি।
আমাদের নগরীর আশেপাশে তো আমি আর কোনো নগরী চিনি না।’ সে দিশেহারার মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর এক যুবকের সঙ্গে দেখা হলে তাকে জিজ্ঞেস করল: ‘হে যুবক, এই নগরীর নাম কী?’ সে বলল: ‘এর নাম আফসুস।’ তামলিখা মনে মনে বলল: ‘হয়তো আমার ওপর কোনো বিপদ এসেছে কিংবা আমার বুদ্ধি হারিয়ে গেছে।
এখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়াই উচিত, নইলে লাঞ্ছিত হব, বিপদে পড়ব এবং ধ্বংস হব।’ তারপর সে নিজেকে সামলে বলল: ‘লোকেরা আমার ব্যাপারটি বুঝে ফেলার আগে নগরী থেকে বেরিয়ে গেলে আমার জন্য সহজ হবে।’
সে খাবার বিক্রেতাদের কাছে গিয়ে নিজের রৌপ্যমুদ্রা বের করে একজনকে দিয়ে বলল: ‘এই মুদ্রার বিনিময়ে আমাকে খাবার দিন।’ লোকটি মুদ্রার ধরন ও খোদাই দেখে বিস্মিত হলো। সে মুদ্রাটি তার এক সঙ্গীর হাতে দিল। সেও তা দেখে বিস্মিত হলো। এরপর তারা মুদ্রাটি একে অপরের হাতে দিতে লাগল এবং পরস্পরকে বলল: ‘এই যুবক অনেক কাল আগে মাটির নিচে লুকানো কোনো গুপ্তধন পেয়েছে।’
তামলিখা তাদের পরামর্শ করতে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে কাঁপতে লাগল। সে ভাবল, তারা তাকে চিনে ফেলেছে এবং দাকিয়ানুসের কাছে নিয়ে যেতে চায়। অন্য লোকেরাও তার কাছে এসে তাকে চিনে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। সে ভয়ে বলল: ‘আমার প্রতি দয়া করুন।
আপনারা আমার মুদ্রা নিয়ে রেখেছেন; খাবার আমার আর দরকার নেই।’ তারা বলল: ‘হে যুবক, তুমি কে? তোমার ব্যাপার কী? আল্লাহর কসম, তুমি প্রাচীনদের কোনো গুপ্তধন পেয়েছ, অথচ তা আমাদের কাছ থেকে লুকাতে চাইছ। আমাদের সঙ্গে চলো, তা দেখাও এবং আমাদের অংশ দাও; তাহলে তুমি যা পেয়েছ, তা তোমার জন্য সহজ হবে।
তা না করলে আমরা তোমাকে শাসকের কাছে নিয়ে যাব, তিনি তোমাকে হত্যা করবেন।’ তাদের কথা শুনে তামলিখা মনে মনে বলল: ‘আমি তো সেই সব বিপদেই পড়েছি, যা থেকে সতর্ক ছিলাম।’ তারা বলল: ‘হে যুবক, তুমি যা পেয়েছ তা গোপন রাখতে পারবে না।’ তামলিখা কী বলবে বুঝতে পারল না; ভয়ে তাদের কিছুই বলতে পারছিল না।
তাকে কথা বলতে না দেখে তারা তার চাদর গলায় ফেলে নগরীর গলি দিয়ে টেনে নিয়ে চলল। নগরীর লোকেরা শুনে জড়ো হলো—তাদের বলা হয়েছিল, এই লোকের কাছে গুপ্তধন আছে। ছোট-বড় সবাই তার দিকে তাকিয়ে বলল: ‘আল্লাহর কসম, এই যুবক এই নগরীর লোক নয়। তাকে আমরা এখানে কখনো দেখিনি, চিনি না।’
তামলিখা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। নগরীর লোকেরা জড়ো হলে সে ভয়ে চুপ করে রইল। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, তার বাবা ও ভাইয়েরা নগরীতে আছে; তার বংশপরিচয় নগরীর অভিজাতদের সঙ্গে যুক্ত, তাই তার খবর পেলে তারা নিশ্চয়ই এসে তাকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করবে। সে দিশেহারার মতো দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল, কখন তার পরিবারের কেউ এসে তাকে মুক্ত করবে।
এমন সময় লোকেরা তাকে ধরে নগরীর দুই শাসক ও প্রশাসকের কাছে নিয়ে গেল। তারা ছিলেন দুজন সৎ ব্যক্তি; একজনের নাম ‘আরিয়ুস’ এবং অন্যজনের নাম ‘তানতিয়ুস’।
তামলিখাকে তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে সে ভাবল, তাকে দাকিয়ানুস অত্যাচারীর কাছে নেওয়া হচ্ছে। সে ডানে-বামে তাকাতে লাগল। লোকেরা তাকে পাগলের মতো উপহাস করছিল। তামলিখা কাঁদতে লাগল এবং আকাশের দিকে মাথা তুলে মনে মনে বলল: ‘হে আসমান ও জমিনের রব, আজ আমাকে ধৈর্য দিন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে এমন এক সাহায্যকারী আত্মা পাঠান, যার মাধ্যমে এই অত্যাচারীর সামনে আমাকে শক্তি দেবেন।’
সে কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে বলল: ‘আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছে! হায়, তারা যদি জানত, আমি কী কষ্ট পেয়েছি! তারা জানলে আমার কাছে আসত; আমরা সবাই এই অত্যাচারীর সামনে দাঁড়াতাম। আমরা পরস্পর অঙ্গীকার করেছিলাম, আমরা একসঙ্গে থাকব, আল্লাহকে অস্বীকার করব না এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করব না।
আমার ও তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছে; তারা আর আমাকে দেখবে না, আমিও তাদের দেখতে পাব না। আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম, জীবনে কিংবা মৃত্যুতেও কখনো বিচ্ছিন্ন হব না।’ আরিয়ুস ও তানতিয়ুসের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত তামলিখা মনে মনে এসব কথা ভাবছিল। পরে সে গুহায় ফিরে এসে তার সঙ্গীদের এ কথা জানিয়েছিল।
তামলিখা যখন বুঝল, তাকে দাকিয়ানুসের কাছে নেওয়া হচ্ছে না, তখন তার কান্না থেমে গেল এবং সে শান্ত হলো। আরিয়ুস মুদ্রাটি হাতে নিয়ে দেখলেন; তিনিও বিস্মিত হলেন। তাদের একজন তাকে বললেন: ‘হে যুবক, তুমি যে গুপ্তধন পেয়েছ, তা কোথায়?’ তামলিখা বলল: ‘আমি কোনো গুপ্তধন পাইনি।
এগুলো আমার বাবাদের মুদ্রা, আর এগুলোর খোদাই ও ধরন এই নগরীরই। কিন্তু আমার কী হয়েছে, তা আমি বুঝতে পারছি না; আপনাদের কী বলব, তাও জানি না।’ তাদের একজন বললেন: ‘তাহলে তুমি কে?’ তামলিখা বলল: ‘আমি তো জানতাম, আমি এই নগরীরই লোক।’ তারা বললেন: ‘তোমার বাবা কে?
এখানে কে তোমাকে চেনে?’ সে তার বাবার নাম বলল; কিন্তু এমন কাউকে পাওয়া গেল না, যে তাকে কিংবা তার বাবাকে চিনত। তাদের একজন বললেন: ‘তুমি মিথ্যাবাদী; সত্য কথা বলছ না।’ তামলিখা কী বলবে বুঝতে না পেরে মাথা নিচু করল। তার আশপাশের কেউ বলল: ‘লোকটি পাগল।’
আরেকজন বলল: ‘সে পাগল নয়; ইচ্ছা করে নিজেকে বোকা সাজাচ্ছে, যাতে তোমাদের হাত থেকে পালাতে পারে।’ তাদের একজন তার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন: ‘তুমি কি মনে করো, আমরা তোমাকে ছেড়ে দেব এবং বিশ্বাস করব যে, এই সম্পদ তোমার বাবার, আর এই মুদ্রার খোদাই ও ধরন তিনশ বছরেরও বেশি পুরোনো? তুমি তো যুবক। মনে করো, আমাদের প্রতারণা করবে ও উপহাস করবে?
অথচ আমরা বৃদ্ধ, তোমার চারপাশে নগরীর নেতৃস্থানীয় লোক ও প্রশাসকরা উপস্থিত, আর এই নগরীর ভান্ডার আমাদের হাতে। আমাদের কাছে এই ধরনের এক দিরহাম বা দিনারও নেই। আমার ধারণা, আমি তোমাকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার আদেশ দেব, তারপর বেঁধে রাখব—যতক্ষণ না তুমি এই গুপ্তধনের কথা স্বীকার করো।’
তিনি এ কথা বললে তামলিখা বলল: ‘আপনাদের কাছে একটি কথা জানতে চাই। আপনারা যদি তার উত্তর দেন, তাহলে আমার ব্যাপারে যা জানি, তা সত্য করে বলব।’ তারা বললেন: ‘জিজ্ঞেস করো; আমরা কিছু গোপন করব না।’ তামলিখা বলল: ‘রাজা দাকিয়ানুসের কী হয়েছে?’
তারা বললেন: ‘পৃথিবীতে এখন দাকিয়ানুস নামে কোনো রাজা আছে বলে আমরা জানি না। সে তো বহু কাল আগে রাজত্ব করা এক রাজা; সে মারা গেছে এবং তার পর বহু প্রজন্মও অতিবাহিত হয়েছে।’ তামলিখা বলল: ‘তাহলে আমি সত্যিই দিশেহারা, আর মানুষ আমার কথা বিশ্বাস করবে না। আমরা কয়েকজন যুবক ছিলাম।
রাজা আমাদের মূর্তিপূজা ও বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই করতে বাধ্য করেছিল। গতকাল সন্ধ্যায় আমরা তার কাছ থেকে পালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জেগে উঠে আমি তাদের জন্য খাবার কিনতে এবং খবর জানতে বের হলাম; এখন আমাকে আপনারা যেমন দেখছেন, আমি তেমনই অবস্থায় আছি। আপনারা আমার সঙ্গে ‘বনজালুস’ পাহাড়ের গুহায় চলুন; আমি আপনাদের আমার সঙ্গীদের দেখাব।’
তামলিখার কথা শুনে আরিয়ুস বললেন: ‘হে লোকেরা, হয়তো এই যুবকের মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি প্রকাশ করেছেন। চলো, সে আমাদের তার সঙ্গীদের দেখাক।’
আরিয়ুস, আস্তিয়ুস এবং নগরীর ছোট-বড় লোকেরা তার সঙ্গে আসহাবে কাহফের কাছে গেল। তারা তাদের দেখতে চাইছিল। আসহাবে কাহফ তামলিখাকে খাবার ও পানীয় নিয়ে ফিরতে দেরি করতে দেখে এবং সে যে পরিমাণ খাবার নিয়ে আসত, তা না পেয়ে ভাবল, তাকে ধরে নিয়ে তাদের রাজা দাকিয়ানুসের কাছে নেওয়া হয়েছে। তারা যখন এ নিয়ে ভয় ও আশঙ্কায় ছিল, তখন ঘোড়ার আওয়াজ এবং তাদের দিকে এগিয়ে আসা মানুষের কোলাহল শুনতে পেল।
তারা ভাবল, অত্যাচারী দাকিয়ানুসের দূতেরা এসে গেছে; তাদের তার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা নামাজে দাঁড়াল এবং একে অপরকে সালাম দিয়ে উপদেশ দিল। তারা বলল: ‘চলো, আমাদের ভাই তামলিখার কাছে যাই; সে এখন অত্যাচারীর সামনে আছে, আমরা পৌঁছানো পর্যন্ত তার অপেক্ষা করছে।’ তারা গুহার ভেতরে বসে এসব বলছিল; তখন তারা আরিয়ুস ও তার সঙ্গীদের গুহার মুখে দাঁড়ানো ছাড়া আর কিছুই দেখেনি।
তামলিখা সবার আগে ভেতরে প্রবেশ করল। সে কাঁদছিল। তাকে কাঁদতে দেখে অন্যরাও তার সঙ্গে কাঁদল। তারপর তারা তার অবস্থা জানতে চাইলে সে সব ঘটনা জানাল। তখন তারা বুঝতে পারল, আল্লাহর আদেশে তারা এত দিন ঘুমিয়ে ছিল; আল্লাহরই আদেশে তাদের জাগানো হয়েছে, যাতে তারা মানুষের জন্য নিদর্শন এবং পুনরুত্থানের সত্যতার প্রমাণ হয় এবং মানুষ জানতে পারে যে কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তামলিখার পেছন পেছন আরিয়ুস গুহায় প্রবেশ করলেন। তিনি তামার একটি সিন্দুক দেখতে পেলেন, যা রুপার মোহর দিয়ে বন্ধ ছিল। তিনি গুহার দরজায় দাঁড়িয়ে নগরীর একজন নেতৃস্থানীয় লোককে ডাকলেন। তাদের সামনে সিন্দুকটি খোলা হলে তার ভেতরে সীসার দুটি ফলক পাওয়া গেল।
তাতে লেখা ছিল: ‘মাকসালমিনা, মাখশালমিনা, তামলিখা, মারতুনুস, কাশতুনুস, ইয়াবরুনুস, দিমুস, বাতিয়ুস ও হালুশ—এরা ছিল একদল যুবক। তাদের দ্বীন থেকে সরিয়ে ফিতনায় ফেলবে—এ ভয়ে তারা নিজেদের অত্যাচারী রাজা দাকিয়ানুসের কাছ থেকে পালিয়ে এই গুহায় প্রবেশ করেছে। তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানানো হলে রাজা গুহাটি পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিল। আমরা তাদের ঘটনা ও বিবরণ লিখে রাখলাম, যাতে পরে কেউ তাদের খুঁজে পেলে জানতে পারে।’
লেখাটি পড়ে লোকেরা বিস্মিত হলো এবং তাদের মধ্যে পুনরুত্থানের নিদর্শন দেখানোর জন্য আল্লাহর প্রশংসা করল। তারা উচ্চস্বরে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করল। তারপর গুহার ভেতরে যুবকদের কাছে গেল। তারা উজ্জ্বল মুখে বসে ছিল; তাদের পোশাক জীর্ণ হয়নি।
আরিয়ুস ও তার সঙ্গীরা সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন, যিনি তাদের তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি দেখিয়েছেন। তারপর তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বললেন। যুবকেরা তাদের রাজা দাকিয়ানুসের কাছ থেকে যে নির্যাতন ভোগ করেছিল, তা জানাল।
এরপর আরিয়ুস ও তার সঙ্গীরা তাদের সৎ রাজা বিদরুসের কাছে একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে লিখলেন: ‘দ্রুত আমাদের কাছে আসুন। হয়তো আপনি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর একটি দেখতে পাবেন, যা তিনি আপনার রাজত্বে প্রকাশ করেছেন এবং বিশ্ববাসীর জন্য নিদর্শন করেছেন—যাতে তা তাদের জন্য আলো, দীপ্তি এবং পুনরুত্থানের সত্যতার প্রমাণ হয়। দ্রুত আসুন; আল্লাহর মহিমা ও মর্যাদা এই যুবকদের পুনরুজ্জীবিত করেছেন, যাদের তিনি তিনশ বছরেরও বেশি আগে মৃত্যুবরণ করিয়েছিলেন।’ খবরটি রাজার কাছে পৌঁছলে তার বুদ্ধি ফিরে এল এবং দুশ্চিন্তা দূর হলো।
সে বলল: ‘হে আসমানসমূহ ও জমিনের রব, আপনার প্রশংসা করি, আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি। আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন ও দয়া করেছেন; আমার পূর্বপুরুষদের জন্য যে আলো আপনি সৎ রাজা কনস্তান্তিনুসের মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন, তা নিভিয়ে দেননি।’
নগরীর লোকেরা খবর পেয়ে রাজাকে সঙ্গী করে রওনা হলো। তারা আফসুস নগরীতে পৌঁছালে নগরীর লোকেরা তাদের অভ্যর্থনা জানাল। সবাই রাজার সঙ্গে গুহার দিকে এগিয়ে গেল। যুবকেরা বিদরুসকে দেখে আনন্দিত হলো এবং মুখমণ্ডল মাটিতে রেখে সিজদা করল।
বিদরুস দাঁড়িয়ে তাদের আলিঙ্গন করলেন ও কাঁদলেন। তারা মাটিতে বসে তাঁর সামনে আল্লাহর তাসবিহ ও তাহমিদ করছিল। এরপর যুবকেরা বিদরুসকে বলল: ‘আমরা আপনাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি। আপনার ওপর সালাম এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আল্লাহ আপনাকে ও আপনার রাজত্বকে হেফাজত করুন।
মানুষ ও জিনের অনিষ্ট থেকে আমরা আপনার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।’ রাজা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তারা আবার নিজেদের শয্যাস্থলে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল; আল্লাহ তাদের প্রাণ কবজ করলেন। রাজা তাদের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের গায়ে পোশাক পরিয়ে দিলেন এবং প্রত্যেককে সোনার সিন্দুকে রাখার আদেশ দিলেন। সন্ধ্যায় রাজা ঘুমালে তারা স্বপ্নে এসে বলল: ‘আমাদের সোনা বা রুপার তৈরি করা হয়নি; আমাদের মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর আমরা মাটিতেই ফিরে যাব।
আমাদের গুহায় যেমন মাটির ওপর ছিলাম, তেমনই থাকতে দিন, যাতে আল্লাহ আমাদের সেখান থেকে পুনরুত্থিত করেন।’ তখন রাজা সেগুলোকে সেগুন কাঠের একটি সিন্দুকে রাখার আদেশ দিলেন। আল্লাহ তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসা লোকদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে তাদের আড়াল করলেন; ফলে কেউ তাদের কাছে প্রবেশ করতে পারল না। রাজা গুহার দরজায় একটি মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিলেন, যেখানে নামাজ পড়া হবে।
তিনি তাদের জন্য একটি মহা উৎসব নির্ধারণ করলেন এবং প্রতি বছর সেখানে আসার আদেশ দিলেন।
আরও বলা হয়েছে, তামলিখাকে সৎ রাজার কাছে নিয়ে যাওয়ার পর রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘তুমি কে?’ সে বলল: ‘আমি এই নগরীর একজন লোক।’ সে বলল, গতকাল কিংবা কয়েক দিন আগে সে বেরিয়েছিল এবং নিজের বাড়ি ও এমন কিছু লোকের কথা বলল, যাদের কেউ চিনতে পারল না। রাজা শুনেছিলেন, প্রাচীনকালে কয়েকজন যুবক নিখোঁজ হয়েছিল এবং তাদের নাম ভান্ডারের একটি ফলকে লেখা আছে।
তিনি ফলকটি আনালেন এবং সেখানে নামগুলো দেখলেন; তামলিখা তাদেরই একজন। সে অন্যদের নামও উল্লেখ করলে তামলিখা বলল: ‘তারা আমার সঙ্গী।’ এ কথা শুনে রাজা এবং তার সঙ্গে থাকা লোকেরা রওনা হলেন। তারা গুহার দরজায় পৌঁছলে তামলিখা বলল: ‘আমাকে আমার সঙ্গীদের কাছে যেতে দিন, যাতে তাদের সুসংবাদ দিই।
তারা যদি আমাকে আপনাদের সঙ্গে দেখে, তাহলে ভয়ে আতঙ্কিত হবে।’ সে ভেতরে গিয়ে তাদের সুসংবাদ দিল। তখন আল্লাহ তাদের প্রাণ কবজ করলেন এবং তাদের চিহ্ন লোকদের কাছ থেকে আড়াল করে দিলেন; লোকেরা তাদের কাছে পৌঁছানোর পথ খুঁজে পেল না।
আল্লাহর বাণী, «যখন যুবকেরা গুহায় আশ্রয় নিল»—অর্থাৎ, তারা গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিল। আরবি ভাষায় বলা হয়: ‘অমুক ব্যক্তি অমুক স্থানে আশ্রয় নিয়েছে’—অর্থাৎ, সে স্থানটিকে নিজের আবাস করেছে। গুহাটি ছিল ‘বনজালুস’ পাহাড়ের একটি গুহা। গুহাটির নাম ছিল ‘খাইরাম’।
«তখন তারা বলল: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন»—এখানে রহমতের অর্থ দ্বীনের হিদায়াত। আরেকটি মত হলো, এর অর্থ রিযিক।
«আর আমাদের জন্য সহজ করে দিন»—অর্থাৎ, আমাদের জন্য সহজ করে দিন।
«আমাদের কাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন»—অর্থাৎ, আপনার সন্তুষ্টির যে বিষয় আমরা কামনা করি এবং যে বিষয় আমাদের কল্যাণের পথ দেখায়, তা আমাদের জন্য সহজ করুন। ইবন আব্বাস বলেন: ‘রুশদা’ অর্থ, নিরাপদে গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পথ।
আরও বলা হয়েছে: রাজা তাদের শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল; তাদের ঘটনা জানানো হয়েছিল; তারা বলেছিল, ‘আমরা রাত পর্যন্ত এখানে থাকব’; আর সে তাদের সেখানে রেখে দিতে চেয়েছিল, যাতে তারা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মারা যায়—এবং সে তা করেছিল। ওহব বলেন: দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল। তারা যে মুদ্রা সঙ্গে নিয়েছিল, তা দাকিয়ানুসের সিলমোহরযুক্ত ছিল এবং ছোট উটের খুরের মতো ছিল। তামলিখা বাইরে বেরোল, কিন্তু লোকেরা তাকে চিনতে পারল না; ছোট-বড় সবাই তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘খবর কী?’—এরপর বর্ণনায় আরিয়ুস ও তানতিয়ুসের কথা এসেছে।
সে দৃষ্টি নিচু করল। তারা এক দ্বীনের অনুসারী ছিল, ইসলাম—অর্থাৎ মূর্তিপূজা ও বাতিল উপাস্যদের উদ্দেশে পশু জবাই করতে বাধ্য হওয়া, রাজা থেকে নিজেদের ঈমান গোপন রাখা এবং গুহায় পালিয়ে যাওয়ার আগের সেই দ্বীন। ‘তোমার ঈমান ও তোমার আমলের পরিণতি’—অর্থাৎ, তোমার ঈমান এবং তোমার কাজের শেষ পরিণতি।
সহিহ মুসলিমে (হাদিস নং ৮০৯) দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার জন্য সূরা আল-কাহফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করার ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।