হিদায়াত ও আল্লাহর ওপর ভরসা
عَسَىٰ، أَنْ يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَٰذَا رَشَدًا.
عَسَىٰ أَنْ يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَٰذَا رَشَدًا
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
‘আল্লাহ ইচ্ছে করলে’ বলা ছাড়া। যদি ভুলে যাও (তবে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে) তোমার প্রতিপালককে স্মরণ কর আর বল, ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্যের নিকটবর্তী পথে পরিচালিত করবেন। (কেননা এক ব্যক্তি যেভাবেই সঠিক পথে চলুক না কেন, তার চেয়েও উত্তমভাবে পথ চলা যেতে পারে)।
আশা ও প্রার্থনার রূপ: ‘আসা আন ইয়াহদিয়ানি’। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সময় এবং ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার ক্ষেত্রে মুসলিমদের আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখানো হয়েছে।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
আয়াত ২৩ ও ২৪-এর তাফসির:
এই নিষেধাজ্ঞা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার মতোই। যদিও এর পেছনে একটি বিশেষ কারণ ছিল এবং সম্বোধন করা হয়েছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে, তবু এর নির্দেশনা সকল শরিয়তের বিধানপ্রাপ্ত মানুষের জন্য ব্যাপক। আল্লাহ নিষেধ করেছেন, বান্দা যেন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না বলে, “আমি এটা করব”—আল্লাহর ইচ্ছার কথা এর সঙ্গে যুক্ত না করে। কারণ এতে এমন কিছু বিপদ রয়েছে: ভবিষ্যতের অদৃশ্য বিষয় নিয়ে কথা বলা, অথচ সে জানে না, কাজটি করবে কি না কিংবা তা সংঘটিত হবে কি না।
এর মধ্যে বান্দার ইচ্ছাকে স্বতন্ত্রভাবে কার্যকর বলে ধরে নেওয়াও রয়েছে, যা নিষিদ্ধ ও অনুচিত। কারণ সমস্ত ইচ্ছাই আল্লাহর অধীন: “আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যদি না সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করেন।”
আল্লাহর ইচ্ছার কথা উল্লেখ করলে কাজ সহজ ও সুগম হয়, তাতে বরকত লাভ হয় এবং বান্দা তার প্রতিপালকের সাহায্য প্রার্থনা করে। বান্দা যেহেতু মানুষ, তাই তার ভুলে গিয়ে আল্লাহর ইচ্ছার কথা উল্লেখ না করাই স্বাভাবিক। তাই পরে যখন তার মনে পড়বে, তখন আল্লাহ তাকে ইস্তিসনা [‘ইনশাআল্লাহ’ বলা] করতে আদেশ করেছেন, যেন কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি অর্জিত হয় এবং নিষিদ্ধ বিষয়টি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
“আর যখন ভুলে যাও, তখন তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করো”—এই ব্যাপক নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, ভুলে গেলে আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ রয়েছে। এতে ভুল দূর হয় এবং বান্দা যা ভুলে গিয়েছিল তা মনে করতে পারে। একইভাবে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হয়ে পড়া ও ভুলে যাওয়া ব্যক্তিকেও তার প্রতিপালককে স্মরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়; সে যেন উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত না হয়।
বান্দা তার কথা ও কাজে সঠিক হওয়া এবং ভুল থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর তাওফিকের মুখাপেক্ষী। তাই আল্লাহ তাকে বলতে আদেশ করেছেন: “আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্যের নিকটবর্তী পথে পরিচালিত করবেন।” অর্থাৎ, তিনি তাকে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে, তাঁর কাছে আশা রাখতে এবং তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে বলেছেন—যেন আল্লাহ তাকে এমন পথের দিশা দেন, যা সঠিকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও নিকটবর্তী। যে বান্দার অবস্থা এমন, তারপরও সে সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে এবং হিদায়াত ও সঠিক পথের সন্ধানে সর্বশক্তি নিয়োগ করে, তার জন্য তাওফিক লাভ করা, প্রতিপালকের সাহায্য পাওয়া এবং সব কাজে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়াই প্রত্যাশিত।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে (সঃ) নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যে কাজ তুমি কাল করতে চাও ঐ ব্যাপারে তুমি বলো না? আমি কাল এটা করবো। বরং এর সাথে ইনশা আল্লাহ বলো। কেননা, কাল কি হবে, তার জ্ঞান শুধু আল্লাহ তাআলারই রয়েছে।
একমাত্র তিনিই ভবিষ্যতের খবর রাখেন এবং সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই। সুতরাং তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত সুলাইমান ইবনু দাউদের (আঃ) নব্বইটি স্ত্রী ছিল। একটি রিওয়াইয়াতে একশ' টি এবং অন্য একটি রিওয়াইয়াতে বাহাত্তরটির কথা রয়েছে।
তিনি একদা বলেনঃ “আজ রাত্রে আমি আমার সমস্ত স্ত্রীর কাছে যাবো (তাদের সাথে সহবাস করবো) প্রত্যেক স্ত্রীর সন্তান হবে এবং তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।” ঐ সময় ফেরেশতা তাঁকে বলেছিলেনঃ “ইনশা আল্লাহ বলুন।” কিন্তু তিনি তা না বলে নিজের ইচ্ছানুযায়ী ঐ সব স্ত্রীর নিকট গমন করেন। কিন্তু একটি স্ত্রী ছাড়া আর কারো সন্তান হয় নাই।
যার সন্তান হয় সেই সন্তানটিও আবার অর্ধ দেহ বিশিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ সময় “ইনশা আল্লাহ' বলতেন, তবে তাঁর মনোবাসনাপূর্ণ হতো এবং তার প্রয়োজনও পুরো হয়ে যেতো। তাঁর ঐ সব সন্তান যুবক হয়ে আল্লাহর পথের মুজাহিদ হয়ে যেতো।"
(এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে)এই সূরার তাফসীরের শুরুতেই এই আয়াতের শানে নুযুল বর্ণিত হয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) আসহাবে কাহফের ঘটনা জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আগামীকাল আমি তোমাদেরকে এর উত্তর দেবো।” কিন্তু তিনি ইনশা আল্লাহ বলেন নাই। এরপর পনেরো দিন পর্যন্ত তার উপর কোন ওয়াহী অবতীর্ণ হয় নাই। এই হাদীসটিকে আমরা এই সূরার তাফসীরের শুরুতে পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি।
সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “যখন তুমি ভুলে যাবে তখন আল্লাহকে স্মরণ করবে। অর্থাৎ যদি যথাস্থানে ইনশা আল্লাহ বলতে ভুলে যাও তবে যখনই স্মরণ হবে তখনই ইনশা আল্লাহ বলবে।” হযরত ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কেউ যদি কোন বিষয়ে শপথ।
করার সময় ইনশা আল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তবে পরেও তার ইনশা আল্লাহ বলে নেয়ার অধিকার রয়েছে। যদিও এক বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। ভাবার্থ এই যে, কেউ যদি তার কথায় বা কসমে ইনশা আল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তবে যখনই স্মরণ হবে তখনই ইনশা আল্লাহ বলে নেবে; যদিও বহু দিন অতীত হয়ে যায় বা এর বিপরীতও ঘটে যায়। এর ভাবার্থ এটা নয় যে, তখন তার কসমের কাফফারা থাকবে না এবং তার ঐ কসম ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার থাকবে।
ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এই উক্তির ভাবার্থ এটাই বর্ণনা করেছেন এবং এটা সঠিকও বটে। এরই উপর হযরত ইবনু আব্বাসের (রাঃ) উক্তি স্থাপন করা যেতে পারে। তার থেকে এবং মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা ইনশা আল্লাহ বলতে ভুলে যাওয়াই বুঝানো হয়েছে। অন্য রিওয়াইয়াতে এরপরে এও রয়েছে যে, এটা রাসুলুল্লাহর (সঃ) সাথেই।
খস। অন্য কেউ যদি তার কসমের সাথে ইনশা আল্লাহ বলে তবেই সেটা ধর্তব্য হবে। এর এটাও একটা ভাবার্থঃ যদি কোন কথা ভুলে যাও তবে আল্লাহকে স্মরণ করো। কেননা, ভুলে যাওয়া শয়তানী ক্রিয়া, আর আল্লাহর যির স্মরণে আসার মাধ্যম। তারপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাকে যদি এমন কোন প্রশ্ন করা হয়, যা তোমার জানা নেই, তবে তুমি তা আল্লাহকেই জিজ্ঞেস করো এবং তাঁর দিকেই মনোনিবেশ কর, যাতে তিনি তোমাকে সঠিক কথা বলে দেন এবং হিদায়াত লাভের পথ বাতলিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে আরো বহু উক্তি রয়েছে। এ সব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
আল-বাগাভির তাফসির
“আর যখন ভুলে যাও, তখন তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করো”—ইবন আব্বাস, মুজাহিদ ও হাসান বলেছেন: এর অর্থ, ইস্তিসনা [‘ইনশাআল্লাহ’ বলা] করতে ভুলে গেলে পরে মনে পড়ার সময় তা বলো। ইবন আব্বাস এক বছর পর্যন্ত সময় পেরিয়ে গেলেও পরে ইস্তিসনা করাকে বৈধ বলেছেন। হাসান বলেছেন, যতক্ষণ একই বৈঠকে থাকা হয়, ততক্ষণ তা করা যায়। কেউ কেউ বলেছেন, সময়ের ব্যবধান কম হলে তা বৈধ; ব্যবধান বেশি হলে আর তা সহিহ হবে না। একদল আলিমের মতে, ইস্তিসনা কথার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া আবশ্যক।
ইকরিমা বলেছেন: আয়াতটির অর্থ, “যখন রাগান্বিত হও, তখন তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করো।” ওয়াহব বলেছেন: ইঞ্জিলে লেখা আছে, “হে আদম সন্তান! তুমি যখন রাগান্বিত হও, তখন আমাকে স্মরণ করো; আমি যখন রাগান্বিত হব, তখন তোমাকে স্মরণ করব।” দাহহাক ও সুদ্দি বলেছেন: এই নির্দেশ সালাত সম্পর্কে।
আমাদের কাছে আবদুল ওয়াহিদ আল-মুলাইহি বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমাদের কাছে আল-হাসান ইবন আহমদ আল-মাখলাদি বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমাদের কাছে আবু আল-আব্বাস আস-সাররাজ বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমাদের কাছে কুতাইবা বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমাদের কাছে আবু আওয়ানা কাতাদা থেকে, আর তিনি আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো সালাত ভুলে যায়, সে যখন তা স্মরণ করবে, তখন তা আদায় করবে।”
“আর বলো, ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্যের নিকটবর্তী পথে পরিচালিত করবেন’”—অর্থাৎ, তিনি আমাকে এমন পথে অবিচল রাখবেন, যা এর চেয়ে নিকটবর্তী এবং অধিক সঠিক।
আরও বলা হয়েছে: নবীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো কিছু ভুলে গেলে তিনি যেন আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং যা ভুলে গেছেন তা স্মরণ করার চেয়ে তাঁর জন্য উত্তম বিষয়ের দিকে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।
আরও বলা হয়, লোকেরা যখন বিরোধিতা করে গুহাবাসীদের ঘটনা সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, তখন আল্লাহ তাঁকে তাদের জানাতে আদেশ করেন যে, আল্লাহ তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার পক্ষে এমন প্রমাণ দেবেন, যা তাদের কাছে গুহাবাসীদের ঘটনার চেয়ে অধিক স্পষ্ট। বাস্তবেও তা-ই হয়েছে: আল্লাহ তাঁকে রাসূলদের জন্য নির্দিষ্ট অদৃশ্য জ্ঞানের এমন কিছু দিয়েছিলেন, যা প্রমাণের দিক থেকে তাদের কাছে আরও স্পষ্ট এবং গুহাবাসীদের ঘটনার সংবাদ অপেক্ষা সঠিকতার নিকটবর্তী ছিল।
কেউ কেউ বলেছেন: ভুলে যাওয়ার পর ইস্তিসনা স্মরণ হলে “ইনশাআল্লাহ” বলার সঙ্গে এই বাক্যটিও বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষ ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলে তার তওবা হলো, সে বলবে: “আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্যের নিকটবর্তী পথে পরিচালিত করবেন।” ইস্তিসনা করা বৈধ।
সহিহ আল-বুখারি (নং ৩৪২৪)-তে নবী সুলাইমানের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। এ ঘটনা স্রষ্টার ওপর সর্বদা ভরসা রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।