رَبِّ إِنِّي، وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي، وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ. رَبِّ شَقِيًّا، وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ، وَرَائِي، وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا، فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ، وَلِيًّا يَرِثُنِي، وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ، وَاجْعَلْهُ. رَبِّ رَضِيًّا.
رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
সে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে, আর বার্ধক্যে আমার মস্তক সাদা হয়ে গেছে, হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে ডেকে আমি কখনো বিফল হইনি। আমার পরে আমার স্বগোত্রীয়রা (কী করবে) সে সম্পর্কে আমি আশঙ্কাবোধ করছি, আর আমার স্ত্রী হল বন্ধ্যা, কাজেই তুমি তোমার তরফ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান কর যে আমার উত্তরাধিকারী হবে আর উত্তরাধিকারী হবে ইয়া‘কুব পরিবারের; আর হে আমার প্রতিপালক! তাকে করুন আপনার সন্তুষ্টির পাত্র।
এ দোয়ায় নিজের দুর্বলতার অবস্থা বর্ণনা করে (লিসানুল-হাল) ‘হাব লী’ (هَبْ لِي—আমাকে দান করুন) এবং ‘ইজ‘আলহু’ (اجْعَلْهُ—তাকে করুন) বলে প্রার্থনা করা হয়েছে। শারীরিক অক্ষমতা ও বার্ধক্যের মধ্যেও সৎ সন্তান চাওয়ার এটি একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
(يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا) অর্থাৎ, এমন একজন সৎ বান্দা, যাকে আপনি পছন্দ করেন এবং আপনার বান্দাদের কাছেও প্রিয় করে দেন। সারকথা, তিনি আল্লাহর কাছে একটি পুত্রসন্তান চেয়েছিলেন—যে সৎ হবে, তাঁর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকবে, তাঁর পরে দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির কাছে সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত নবী হবে। সন্তানদের মধ্যে এটিই সর্বোত্তম। বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের একটি দিক হলো, তিনি তাকে এমন সৎ সন্তান দান করেন, যার মধ্যে মহৎ চরিত্র ও প্রশংসনীয় স্বভাবের সমাবেশ ঘটে।
অতঃপর তাঁর প্রতিপালক তাঁর প্রতি দয়া করলেন এবং তাঁর দোয়া কবুল করলেন।
(رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي) অর্থাৎ, আমার হাড় দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে গেছে। দেহের ভিত্তি যে হাড়, তা দুর্বল হলে দেহের অন্যান্য অঙ্গও দুর্বল হয়ে যায়। (وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا) অর্থাৎ, আমার মাথা বার্ধক্যের পক্ককেশে ভরে গেছে। কারণ, পক্ককেশ দুর্বলতা ও বার্ধক্যের নিদর্শন; এটি মৃত্যুর দূত, অগ্রদূত ও সতর্কবার্তা।
তিনি নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতাকে সামনে রেখে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। এটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় উপায়গুলোর একটি; কেননা তা নিজের শক্তি ও সামর্থ্য থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে, অন্তরকে আল্লাহর শক্তি ও সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করার কথা প্রকাশ করে। (وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا) অর্থাৎ, হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে কখনো ফিরিয়ে দেননি, জবাব থেকে বঞ্চিত করেননি; বরং আপনি সর্বদা আমার প্রতি অনুগ্রহশীল ছিলেন এবং আমার দোয়ার জবাব দিয়েছেন। আপনার অনুগ্রহ একের পর এক আমার কাছে এসেছে এবং আপনার দয়া আমার কাছে পৌঁছেছে।
এভাবে তিনি আল্লাহর পূর্ববর্তী অনুগ্রহ ও তাঁর আগের দোয়াগুলো কবুল করার কথা উল্লেখ করে তাঁর কাছে প্রার্থনা করলেন—যিনি আগে তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তিনি যেন পরেও সেই অনুগ্রহ পূর্ণ করেন।
(وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَائِي) অর্থাৎ, আমার মৃত্যুর পর বনী ইসরাঈলের যারা দায়িত্ব নেবে, তারা আপনার দ্বীনের যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে না এবং আপনার বান্দাদের আপনার দিকে আহ্বান করবে না—এ আশঙ্কা আমার হচ্ছে। বাহ্যত, তিনি তাদের মধ্যে কাউকেই দ্বীনের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য মনে করেননি। এতে যাকারিয়া (আ.)-এর স্নেহ ও কল্যাণকামিতা প্রকাশ পায়। তাঁর সন্তান চাওয়া অন্যদের মতো কেবল পার্থিব স্বার্থের জন্য ছিল না; বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনের কল্যাণ এবং দ্বীন নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা করা।
তিনি অন্য কাউকে এ কাজের উপযুক্ত মনে করেননি। তাঁর পরিবার ছিল দ্বীনের জন্য প্রসিদ্ধ, রিসালাতের কেন্দ্র এবং কল্যাণের প্রত্যাশাস্থল। তাই তিনি আল্লাহর কাছে এমন সন্তান চাইলেন, যে তাঁর পরে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করবে। তিনি আরও বললেন, তাঁর স্ত্রী বন্ধ্যা—অর্থাৎ, তাঁর সন্তান হয় না—এবং তিনি বার্ধক্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছেন; এমন বয়সে কামনা-বাসনা ও সন্তানলাভ খুবই বিরল।
(فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا) এই অভিভাবকত্ব হলো দ্বীনের অভিভাবকত্ব এবং নবুওয়াত, জ্ঞান ও আমলের উত্তরাধিকার।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে।
(আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে।
খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক!
হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে।
এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে। তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই।
বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।" কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়।
এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ!
আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে।
দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না।
আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"
যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা।
এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।"
মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন।
সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে। মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন!
তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।"
(কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ!
তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে।
(আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে।
খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক!
হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে।
এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে। তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই।
বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।" কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়।
এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ!
আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে।
দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না।
আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"
যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা।
এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।"
মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন।
সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে। মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন!
তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।"
(কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ!
তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে।
(আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে।
খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক!
হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে।
এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে। তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই।
বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।" কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়।
এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ!
আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে।
দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না।
আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"
যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা।
এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।"
মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন।
সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে। মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন!
তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।"
(কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ!
তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
আল-বাগাভির তাফসির
(قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ) দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে গেছে (الْعَظْمُ مِنِّي) বার্ধক্যের কারণে। কাতাদাহ বলেছেন: তিনি দাঁত পড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। (وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ) অর্থাৎ, মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে। (شَيْبًا) অর্থাৎ, পক্ককেশে ভরে গেছে।
(وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا) তিনি বলেন: অতীতে আপনি আমাকে জবাব দেওয়ার অভ্যাস করিয়েছেন, আমাকে হতাশ করেননি। আরেকটি মত হলো, এর অর্থ: আপনি যখন আমাকে ঈমানের দিকে আহ্বান করেছিলেন, তখন আমি ঈমান এনেছিলাম; ঈমান পরিত্যাগ করে আমি হতভাগা হইনি।
(يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ) আবু আমর ও কিসাঈ উভয় স্থানে ‘থা’ অক্ষরে সুকুন দিয়ে পড়েছেন—দোয়ার জবাব হিসেবে; অন্যরা ‘থা’ অক্ষরে পেশ দিয়ে পড়েছেন—অবস্থা বা বিশেষণ হিসেবে; অর্থাৎ, এমন উত্তরাধিকারী অভিভাবক। এই উত্তরাধিকার কী—এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। হাসান বলেছেন: এর অর্থ, সে আমার সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়াকুব-পরিবারের নবুওয়াত ও ধর্মীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী হবে। আরেকটি মত হলো, উদ্দেশ্য নবুওয়াত ও জ্ঞানের উত্তরাধিকার।
কেউ বলেছেন, উদ্দেশ্য ধর্মীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকার; কারণ যাকারিয়া ছিলেন ধর্মীয় পণ্ডিতদের প্রধান। যাজ্জাজ বলেছেন: এটিকে সম্পদ ছাড়া অন্য কিছুর উত্তরাধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করাই অধিক উপযুক্ত। কেননা, নবীদের একজন যাকারিয়া তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা তাঁর সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে—এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন, তা দূরবর্তী মনে হয়। এর অর্থ হলো, তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা আল্লাহর দ্বীন নষ্ট করবে এবং এর বিধান পাল্টে দেবে।
তিনি বনী ইসরাঈলের মধ্যে দ্বীন পরিবর্তন ও নবীদের হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে একজন সৎ অভিভাবক চাইলেন, যার হাতে তিনি তাঁর উম্মতকে নিরাপদে রাখতে পারবেন এবং যে তাঁর নবুওয়াত ও জ্ঞানের উত্তরাধিকারী হবে, যাতে দ্বীন নষ্ট না হয়। ইবন আব্বাস (রা.) থেকে আতা-র বর্ণিত বক্তব্যেরও এটাই মর্ম।
(وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا) অর্থাৎ, তাকে সৎ, মুত্তাকি ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত করুন।
(وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ) ‘মাওয়ালী’ বলতে চাচাতো ভাইদের বোঝানো হয়েছে। মুজাহিদ বলেছেন: আসাবা [পিতৃসূত্রের পুরুষ আত্মীয়গণ]। আবু সালিহ বলেছেন: কালালা [নিকটবর্তী ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উত্তরাধিকারী ছাড়া অন্য আত্মীয়গণ]। কালবি বলেছেন: উত্তরাধিকারীগণ।
(مِنْ وَرَائِي) অর্থাৎ, আমার মৃত্যুর পর। ইবন কাসির ‘ورائي’ শব্দের ইয়া-তে যবর দিয়ে পড়েছেন; অন্যরা সুকুন দিয়ে পড়েছেন। (وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا) অর্থাৎ, আমার স্ত্রী সন্তান জন্ম দেন না। (فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ) অর্থাৎ, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে দান করুন। (وَلِيًّا) অর্থাৎ, একজন পুত্রসন্তান।
সহিহ আল-বুখারি (নং ৩০৮৭)-তে নবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: “আমরা নবীগণ উত্তরাধিকার রেখে যাই না। আমরা যা রেখে যাই, তা সদকা (সাদাকাহ)।”