أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ، وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ.
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
আমি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছি, তুমি তো দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।
এটি দুরবস্থার অবস্থা বর্ণনার রূপ (الحَالِ لِسَانُ)। নবুওয়তের আদবের সর্বোচ্চ নিদর্শন: আইয়ূব (আ.) কোনো দাবি পেশ করেননি; বরং বিনয়ের সঙ্গে নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে আল্লাহর রহমতের প্রশংসা করেছেন।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
অর্থাৎ, আমাদের বান্দা ও রাসূল আইয়ূবকে স্মরণ করুন—তাঁর প্রশংসা ও সম্মান করে এবং তাঁর মর্যাদা উঁচু করে—যখন আল্লাহ তাঁকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল ও আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট। আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও যাচাই হিসেবে শয়তানকে তাঁর দেহের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সে তাঁর দেহে ফুঁ দিয়েছিল, ফলে তাতে বড় বড় ঘা দেখা দেয়।
তিনি দীর্ঘকাল এ অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর বিপদ চরমে পৌঁছেছিল; তাঁর পরিবার মারা গিয়েছিল এবং তাঁর সম্পদ চলে গিয়েছিল। তখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকে বললেন: ‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।’ তিনি নিজের অবস্থা জানিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন—বিপদ তাঁকে সর্বতোভাবে গ্রাস করেছে।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
৮৩-৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআ'লা হযরত আইয়ুবের (আঃ) কষ্ট ও বিপদাপদের বর্ণনা দিচ্ছেন। আর তা ছিল আর্থিক, দৈহিক এবং সন্তানগত। তার বহু প্রকারের জীবজন্তু, ক্ষেত খামার বাগ-বাগিচা ইত্যাদি ছিল। তার আল্লাহ প্রদত্ত সন্তান সন্ততিসমূহ দাস-দাসী, ধন সম্পদ ইত্যাদি সবকিছুই বিদ্যমান ছিল।
অতঃপর তার উপর আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা আসে এবং সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি তাঁর দেহেও কুষ্ঠরোগ প্রকাশ পায়। শুধুমাত্র অন্তর ও যুবান ছাড়া তার দেহের কোন অংশই এই রোগ হতে রক্ষা পায় নাই। শেষ পর্যন্ত আশে পাশের লোকদের কাছে তিনি ঘৃণার পাত্র হয়ে যান।
বাধ্য হয়ে তাঁকে শহরের এক জনমানবহীন প্রান্তে অবস্থান করতে হয়। তার একটি মাত্র স্ত্রী ছাড়া সবাই তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই বিপদের সময় তার থেকে সবাই সরে পড়ে। এই একটি মাত্র স্ত্রী সদা তাঁর সেবার কাজে লেগে থাকতেন। সাথে সাথে মজুরী খেটে খেটে তার পানাহারেরও ব্যবস্থা করতেন।
নবী (সাঃ) বলেছেনঃ “ সবচয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নবীদের উপর। তারপর সৎলোকদের উপর এরপর তাদের চেয়ে কম মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের উপর এবং এরপরে আরো নিম্নমানের লোকদের উপর আল্লাহর পরীক্ষা এসে থাকে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রত্যেকের পরীক্ষা তার দ্বীনের পরিমাণ হিসেবে হয়ে থাকে। যদি কেউ দ্বীনের ব্যাপারে দৃঢ় হয় তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়।
হযরত আইয়ুব (আঃ) বড়ই ধৈর্যশীল ছিলেন এমনকি তার ধৈর্যশীলতার কথা সর্বসাধারণের মুখে মুখে রয়েছে। হযরত ইয়াযীদ ইবনু মাইসারা (রাঃ) বলেন যে, যখন হযরত আইয়ুবের (আঃ) পরীক্ষা শুরু হয় তখন তাঁর সন্তান সন্ততি মারা যায়, ধন- সম্পদ ধ্বংস হয় এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে রিক্ত হস্ত হয়ে পড়েন। এতে তিনি আরো বেশী আল্লাহর যিকরে লিপ্ত থাকেন। তিনি বলতে থাকেনঃ “হে সকল পলিনকারীদের পালনকর্তা!
আমাকে আপনি বহু ধন মাল ও সন্তান সন্ততি দান করেছিলেন। ঐ সময় আমি ঐগুলিতে সদা লিপ্ত থাকতাম। অতঃপর আপনি ঐগুলি আমার থেকে নিয়ে নেয়ার ফলে আমার অন্তর ঐ সবের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়েছে। এখন আমার অন্তরের মধ্যে ও আপনার মধ্যে কোনই প্রতিবন্ধকতা নেই।
যদি আমার শত্রু ইবলীস আমার প্রতি আপনার এই মেহেরবানীর কথা জানতে পারতো তবে সে আমার প্রতি হিংসায় ফেটে পড়তো।” ইবলীস তার এই কথায় এবং তাঁর ঐ সময়ের ঐ প্রশংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনাও করেনঃ “হে আমর প্রতিপালক! আপনি আমাকে ধন সম্পদ, সন্তান সন্ততি এবং পরিবার পরিজনের অধিকারী করেছিলেন।
আপনি খুব ভাল জানেন যে, ঐ সময় আমি কখনো অহংকার করি নাই এবং কারো প্রতি জুলুম ও অবিচারও করি নাই। হে আল্লাহ! এটা আপনার অজানা নেই যে, আমার। জন্যে নরম বিছানা প্রস্তুত থাকতো। কিন্তু আমি তা পরিত্যাগ করে আপনার ইবাদতে রাত্রি কাটিয়ে দিতাম এবং আমার নসকে ধমকের সুরে বলতামঃ তুমি নরম বিছানাতে আরাম করার জন্যে সৃষ্ট হও নাই।
হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমি সুখ শান্তি ও আরাম আয়েশ বিসর্জন দিতাম।" (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু জারীর (রাঃ) ও ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) একটি খুব দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যা পর যুগীয় বহু মুফাসৃসিরও রিওয়াইয়াত করেছেন। কিন্তু তাতে অস্বাভাবিকতা রয়েছে এবং ওটা খুবই দীর্ঘ হওয়ার কারণে আমরা ছেড়ে দিয়েছি।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই বিপদে জড়িত ছিলেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, তিনি সাত বছর ও কয়েক মাস এই কষ্ট ভোগ করেছিলেন। বানী ইসরাঈলের আবর্জনা ফেলার জায়গায় তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার দেহ পোকা হয়ে গিয়েছিল।
অতঃপর মহান আল্লাহ তার প্রতি দয়াপরবশ হন এবং তাঁকে সমস্ত বিপদ ও কষ্ট হতে মুক্তি দান করেন। আর তাকে তিনি পুরস্কৃত করেন ও তার উত্তম প্রশংসা করেন। অহবি ইবনু মুনাব্বাহ্ (রাঃ) বলেন যে, তিনি পুর্ণ তিন বছর এই কষ্টের মধ্যে পতিত ছিলেন। তাঁর দেহের সমস্ত মাংস খসে পড়েছিল।
শুধু অস্থি ও চর্ম অবশিষ্ট ছিল। তিনি ছাই এর উপর পড়ে থাকতেন। তাঁর কাছে শুধু তার একজন স্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘযুগ এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর একদা তিনি তাঁর স্বামীকে বলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি মহান আল্লাহর নিকট কেন প্রার্থনা করেন না যাতে তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন?”
উত্তরে তিনি বলেনঃ “দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাকে সত্তর বছর সুস্থ শরীরে রেখেছিলেন। সুতরাং তিনি যদি আমাকে সত্তর বছর এই অবস্থায় রাখেন এবং আমি ধৈর্য ধারণ করি আল্লাহর জন্যে তবে এটা তো আল্লাহর জন্যে খুবই অল্প (সময়)।" একথা শুনে তাঁর স্ত্রী কেঁপে ওঠেন। তিনি তাঁর স্বামীর জন্যে শহরে বেরিয়ে যেতেন এবং এর ওর বাড়ীতে কাজকাম করে যা পেতেন তাই এনে স্বামীকে খাওয়াতেন।
ফিলিস্তিনবাসী দু’জন লোক হযরত আইয়ুবের (আঃ) ভাই ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। তাদের কাছে শয়তান গিয়ে বলেঃ “তোমাদের ভাই আইয়ূব (আঃ) ভীষণ বিপদ গ্রস্ত ও কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তোমরা গিয়ে তার খবরা খবর নাও এবং তোমাদের এখান থেকে কিছু মদ সঙ্গে নিয়ে যাও। ওটা তাঁকে পান করালেই তিনি আরোগ্য লাভ করবেন।
তার কথা মত তারা দু'জন হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট আগমন করে এবং তার অবস্থা দেখা মাত্রই তঁাদের চক্ষু অশ্রু সিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কে?” তারা নিজেদের পরিচয় দান করে। তিনি খুবই খুশী হন এবং তাদেরকে মুবারকবাদ জানান।
তারা বলেঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! সম্বতঃ আপনি ভিতরে কিছু গোপন রাখতেন এবং বাইরেও বিপরীত প্রকাশ করতেন। এজন্যেই আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন।” তাদের কথা শুনে হযরত আইয়ূব (আঃ) দৃষ্টি আকাশের দিকে উঠিয়ে বলেনঃ “আমি কি গোপন রাখতাম ওর বিপরীত কি প্রকাশ করতাম তা তিনি (আল্লাহ) জানেন।
তিনি বরং আমাকে এই বিপদে জড়িয়ে ফেলেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, আমি ধৈর্য ধারণ করি কি অধৈর্য হয়ে পড়ি তা তিনি দেখতে চান। অতঃপর তারা দু'জন বলেঃ “আমরা আপনার জন্যে ওষুধ এনেছি, আপনি তা পান করে নিন। এতে আপনি আরোগ্য লাভ করবেন। ওটা হলো মদ, যা অমিরা আমাদের ওখান থেকে আনয়ন করেছি।”
তাদের একথা শোনা মাত্রই তিনি কঠিন রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “কলুষিত শয়তান তোমাদেরকে আমার নিকট আনয়ন করেছে। তোমাদের সাথে কথা বলা এবং তোমাদের খাদ্য ও পানীয় আমার জন্যে হারাম।" তখন তারা দু'জন তার নিকট থেকে চলে যায়। একদিনের ঘটনা, তাঁর স্ত্রী এক বাড়ীতে রুটি পাকিয়ে দিচ্ছিলেন।
তাদের একটি শিশু ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন বাড়ীর মালিক ঐ শিশুর অংশের ছোট রুটি তাকে দিয়ে দেয়। তিনি রুটিটি নিয়ে হযরত আইয়ুবের (আঃ) কিট আসেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এরুটি তুমি কোথা হতে আনলেঃ উত্তরে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। এ ঘটনা শুনে তিনি তার স্ত্রীকে বলেনঃ “তুমি এখনই রুটি নিয়ে ফিরে যাও।
খুব সম্ভ শিশুটি এখন জেগে উঠেছে এবং এই ছোট রুটিটির জন্যে জি ধরেছে এবং কেঁদে কেঁদে সারা বাড়ীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। বাধ্য হয়ে তার স্ত্রী রুটি ফিরিয়ে নিয়ে চললেন। ঐ বাড়ীর বারান্দায় একটি ছাগল বাধা ছিল। ছাগলটি তাকে জোরে এক টক্কর মারে।
ফলে তাঁর মখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে যায়ঃ “দেখো, হযরত আইয়র (আঃ) কত বড় ভুল ধারণা করে বসেছেন?" অতঃপর তিনি উপরে উঠে গিয়ে দেখেন যে, সত্যি সত্যিই শিশুটি রুটির জন্য কান্না জুড়ে দিয়েছে এবং বাড়ীর লোকদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলেছে। এদেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুবের (আঃ) উপর দয়া করুন!” অতঃপর তিনি রুটিটি তাদেরকে দিয়ে দেন এবং ফিরে আসেন।
পথে শয়তান ডাক্তারের রূপ ধরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বলেঃ “তোমার স্বামী অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছেন। দীর্ঘ দিন ধরে কঠিন রোগে ভুগছেন। তুমি তাকে বুঝিয়ে বল যে, তিনি যেন অমুক গোত্রের প্রতিমার নামে একটি মাছি মারেন। এটা করলেই তিনি আরোগ্য লাভ করবেন।"
হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট পৌঁছে তিনি তাঁকে এই কথা বলেন। তিনি তখন তাকে বলেনঃ “তোমার উপর কলুষিত শয়তানের যাদু লেগে গেছে। সুস্থ হলে আমি তোমাকে একশ চাবুক মারবো।” একদা তাঁর স্ত্রী অভ্যাসমত জীবিকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। বাড়ী বাড়ী যান কিন্তু কাজ কাম পেলেন না।
কাজেই তিনি নিরাশ হয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় ঘনিয়ে আসলে হযরত আইয়ুবের (আঃ) ক্ষুধার চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন। সুতরাং তিনি নিরুপায় হয়ে তার চুলের এক খোপা কেটে নিয়ে এক সম্ভ্রান্ত লোকের কন্যার নিকট বিক্রী করেন। মেয়েটি পানাহারের অনেক কিছু জিনিস তাকে প্রদান করে।
তা নিয়ে তিনি হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট পৌঁছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি এতগুলো ভাল ভাল খাদ্য পেলে কোথায়?" তাঁর স্ত্রী উত্তরে বলেঃ “এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাড়ীতে কাজ করে দিয়ে ওর বিনিময়ে এগুলো পেয়েছি।" হযরত আইয়ুব (আঃ) তখন তা খেয়ে নেন।
ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় দিনও এরূপই ঘটে। সেদিনও তিনি তাঁর চুলের অপর খোপাটি কেটে নিয়ে বিক্রী করে দেন এবং ওর বিনিময়ে প্রাপ্ত খাদ্য নিয়ে স্বামীর নিকট হাযির হন। আজকেও ঐ খাদ্যই দেখে হযরত আইয়ূব (আঃ) তার স্ত্রীকে বলেনঃ “আল্লার কসম! আজকে আমি কিছুতেই এ খাদ্য খাবো না যে পর্যন্ত না তুমি আমাকে খবর দেবে যে, তুমি এ খাদ্য কিরূপে পেলে?"
তখন তিনি তাঁর মাথা হতে ওড়না সরিয়ে দেন। ফলে হযরত আইয়ুব (আঃ) দেখতে পান যে, তাঁর মাথার চুল সবই কর্তিত হয়েছে। এ দেখে তিনি অত্যন্ত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। ঐ সময় তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক!
আমি দুঃখ কষ্টে পড়েছি, আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!" (২১৪ ৮৩) হযরত নাওফ (রাঃ) বলেন যে, যে শয়তান হযরত আইয়ুবের (আঃ) পিছনে লেগেছিল তার নাম ছিল মাবসূত। হযরত আইয়ুবকে (আঃ) তার স্ত্রী প্রায়ই বলতেনঃ “আপনি রোগ মুক্তির জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করুন।” কিন্তু তিনি প্রার্থনা করতেন না।
একদা বানী ইসরাঈলের কতকগুলি লোক তার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাকে দেখে তারা মন্তব্য করেঃ “এ লোকটি অবশ্যই কোন পাপের কারণে এই কষ্টে পতিত হয়েছেন। ঐ সময় হঠাৎ তার মুখ দিয়ে এই প্রার্থনা বেরিয়ে পড়ে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবায়েদ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত আইয়ুবের (আঃ) দুটি ভাই ছিল।
একদিন তারা তাকে দেখতে আসে। কিন্তু তার শরীরের দুর্গন্ধের কারণে তারা তাঁর নিকটে যেতে পারে নাই। দূরে দাড়িয়ে বলাবলি করেঃ “যদি এর মধ্যে সততা থাকতো তবে সে এই কঠিন বিপদে পতিত হতো না।" তাদের একথায় হযরত আইয়ুবের (আঃ) এতো দুঃখ হয় যে, এরপূর্বে কোন কিছুতেই তিনি এতো দুঃখ পান নাই।
ঐসময় তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনার জানা থাকে যে, এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হয় নাই যে রাত্রিতে আমার জানা মতে কেউ ক্ষুর্ধাত অবস্থায় থেকেছে এবং আমি পেট পুরে খাদ্য খেয়েছি। হে আল্লাহ! যদি আমি আমার একথায় আপনার নিকট সত্যবাদী হই তবে আপনি আমাকে সত্যায়িত করুন।
তৎক্ষণাৎ আকাশ হতে তাকে সত্যায়িত করা হয় এবং ঐ দুজন তা শুনতে পায়। আবার তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! কখনও এমন ঘটে নাই যে, আমার কাছে অতিরিক্ত কাপড় থেকেছে এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তিকে আমি তা প্রদান করি নাই। যদি আমি এতে সত্যবাদী হই তবে আপনি আমাকে আকাশ হতে সত্যায়িত করুন।
এবারেও তাদেরকে শুনিয়েই তাঁকে সত্যায়িত করা হয়। পুনরায় তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনা করতে করতে সিজদায় পড়ে যানঃ “হে আল্লাহ! আমি ঐ পর্যন্ত সিজদা হতে মাথা উঠাবো না যে পর্যন্ত না আপনি আমার উপর আপতিত সমস্ত বিপদ দূর করবেন।" তঁর এই প্রার্থনা কবুল হয়ে যায় এবং তিনি সিজদা হতে মাথা উঠানোর পূর্বেই তার সমস্ত বিপদ ও রোগ দূর হয়ে যায়।
হযরত আনাস ইবনু মালিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “হযরত আইয়ূব (আঃ) আঠারো বছর পর্যন্ত ঐ রোগে পরিবেষ্টিত থাকেন। তাঁর নিকটের ও দূরের সব আত্মীয় স্বজন তাঁর থেকে সরে পড়ে। শুধুমাত্র তার দুই বিশিষ্ট ভাই তার কাছে সকাল সন্ধ্যায় আসতো। তাদের একজন অপরজনকে বলেঃ “জেনে রেখো যে, অবশ্যই আইয়ূব (আঃ) এমন পাপ করেছেন, যে পাপ সারা বিশ্বে কেউ করে নাই।
তার একথা শুনে তার সঙ্গী তাকে বলে, তুমি এটা কি করে বললে?” সে উত্তরে বলেঃ “তাই যদি না হবে তবে সুদীর্ঘ আঠারো বছর গত হয়ে গেল তুবও আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাঁর রোগ হতে তাকে আরোগ্য দান করছেন না কেন?" অতঃপর সন্ধ্যায় যখন তারা দু'জন তার কাছে আসলো তখন ঐ লোকটি আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। বরং তাঁর কাছে ঐ লোকটির কথা বর্ণনা করে দিলো।
তখন হযরত আইয়ূব (আঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি যা বলছে তা আমি জানি না। তবে মহামহিমান্বিত আল্লাহ জানেন যে, রাস্তায় চলার সময় যখন আমি দু’জন লোককে ঝগড়া করতে দেখতাম এবং তাদের কাউকেও আল্লাহর নামে শপথ করতে শুনতাম তখন আমি এই কাজটি অবশ্যই করতাম যে, বাড়ী গিয়ে তার কসমের কাফফারা আমি নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দিতাম। তা আমি এই আশংকায় করতাম যে, সে হয় তো অন্যায়ভাবে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে থাকবে। (এ হাদীসটি ইবনু হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আইয়ুব (আঃ) এই রোগে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর হাত ধরে প্রস্রাব ও পায়খানার জন্যে যেতেন।
একদা তাঁর (প্রস্রাব বা পায়খানার) প্রয়োজন হয়। তিনি স্বীয় স্ত্রীকে ডাক দেন। কিন্তু তার আসতে বিলম্ব হয়। ফলে তাঁর অত্যন্ত কষ্ট হয়। তৎক্ষণাৎ আকাশ থেকে শব্দ আসেঃ “তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়।
তুমি এই পানি পান কর এবং তাতে গোসলও কর। (এ হাদীসটি মার’ হওয়া খুবই গরীব)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখনই আল্লাহ তাআলা জান্নাত হতে তাঁর জন্যে হুল্লা (পোষাক বিশেষ) পাঠিয়ে দেন। ওটা পরিধান করে তিনি এক প্রান্তে একাকী বসে পড়েন। যখন তার স্ত্রী আগমন করেন তখন তিনি তাকে চিনতে না পেরে তাকেই জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা!
এখানে একজন রুগ্ন, দুর্বল ও শক্তিহীন ব্যক্তি ছিলেন। তার কি হলো তা আপনি বলতে পারেন কি? তাঁকে বাঘে খেয়ে ফেলে নাইতো? অথবা কুকুরে নিয়ে যায় নাই তো?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, না। ঐ রুগ্ন ব্যক্তি আইয়ুব (আঃ) আমিই তো।" আপনি আমার সাথে রসিকতা করছেন কেন?”
তিনি বলেনঃ “না, না। আমিই আইয়ূব (আঃ)। আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তিনি আমাকে আমার প্রকৃত রূপ ও ঔজ্জ্বল্যও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মাল ধনও তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাঁর সন্তানদেরকে এবং তাদের সাথে অপরাপর সম্পদগুলিও তিনি ফিরিয়ে পান।
ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছিল ও বলা হয়েছিলঃ “তুমি তোমার সহচর ও পরিবার পরিজনদের পক্ষ হতে কুরবানী এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। কেননা, তারা তোমার ব্যাপারে আমার নাফরমানী করেছিল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আইয়ূবকে (আঃ) আরোগ্য দান করেন তখন তিনি তার উপর সোনার ফড়িং সমূহ বর্ষণ করেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) তখনও গুলি হাতে ধরে ধরে কাপড়ে জমা করতে শুরু করেন।
ঐ সময় তাকে বলা হয়ঃ “হে আইয়ুব (আঃ)! এখনও তুমি পরিতৃপ্ত হওনি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার রহমত হতে কে পরিতৃপ্ত হতে পারে। (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) কান করেছেন। এর মৃণা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে তার পরিবার পরিজন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তে বলেন যে, ঐ লোকদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। কারো কারো ধারণামতে তার স্ত্রীর নাম ছিল রহমত। এই উক্তি যদি এই আয়াত দ্বারা বুঝা হয়ে থাকে তবে তো এটা বহু দূরের বিষয়। আর যদি আহলে কিতাব হতে নেয়া হয়ে থাকে তবে এটা সত্য বা মিথ্যা কোনটাই বলা যাবে না।
ইবনু আসাকির (রাঃ) তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে হযরত আইয়ুবের (আঃ) স্ত্রীর নাম বলেছেনঃ লাইয়া। তিনি হলেন লাইয়া বিতে মীশা’ ইবনু ইউসুফ ইবনু ইয়াকূব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (আঃ)। একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত লাইয়া ছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কন্যা এবং হযরত আইয়ুবের (আঃ) স্ত্রী। তিনি হযরত আইয়ুবের (আঃ) সাথে সানিয়া নামক স্থানে ছিলেন।
হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, তাকে বলা হয়ঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! তোমার আহ্ল (পরিবার পরিজন) সব জান্নাতী। তুমি যদি চাও তবে তাদের সবাইকে দুনিয়ায় এনে দিই, আর যদি চাও তবে তাদেরকে তোমার জন্যে জান্নাতেই রেখে দিই এবং প্রতিদান হিসেবে দুনিয়ায় তোমার তাদের অনুরূপ প্রদান করি।” তিনি বললেনঃ ‘না, বরং তাদেরকে জান্নাতেই রেখে দিন।
তখন তাদেরকে জান্নাতেই রেখে দেয়া হয় এবং দুনিয়ায় তাঁকে তাদের অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা ছিল আমার বিশেষ রহমত এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ। এসব কিছু এজন্যেই হলো যে, বিপদে পতিত ব্যক্তিরা যেন হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ধৈর্য হারা হয়ে যেন অকৃতজ্ঞ না হয়ে যায়। আর লোকেরা তাদেরকে খারাপ বান্দা বলে ধারনা না করে।
হযরত আইয়ূব (আঃ) ছিলেন ধৈর্যের পর্বত স্বরূপ এবং স্থিরতার নুমনা ছিলেন। আল্লাহর তাকদীরের লিখন ও তাঁর পরীক্ষার উপর মানুষের ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এতে যে তাঁর কি হিকমত বা রহস্য নিহিত রয়েছে তা মানুষের জানা নেই।
আল-বাগাভির তাফসির
আল্লাহর বাণী: “আর আইয়ূবের কথা স্মরণ করো, যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকেছিলেন”—অর্থাৎ, তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে দুআ করেছিলেন। ওহব ইবন মুনাব্বিহ বলেন: আইয়ূব (আ.) ছিলেন রোমের অধিবাসী। তাঁর নাম ছিল আইয়ূব ইবন আমূস ইবন রাযিখ ইবন রূম ইবন ঈস ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম।
তাঁর মা ছিলেন হারান-তনয় লূত (আ.)-এর বংশধর। আল্লাহ তাঁকে মনোনীত ও নবী করেছিলেন, আর দুনিয়ার প্রাচুর্য দিয়েছিলেন। শামের বাথানিয়ার সমতল ও পাহাড়ি সমগ্র অঞ্চল তাঁর অধীনে ছিল। সেখানে তাঁর কাছে গরু, উট, ভেড়া, ঘোড়া ও গাধাসহ নানা প্রকারের এত সম্পদ ছিল, যা সংখ্যায় ও সরঞ্জামে তাঁর চেয়ে বেশি কারও ছিল না।
তাঁর ছিল পাঁচশত জমি; প্রত্যেক জমির দেখাশোনার জন্য ছিল পাঁচশত দাস। প্রত্যেক দাসের ছিল স্ত্রী, সন্তান ও সম্পদ। প্রত্যেক জমির সরঞ্জাম বহনের জন্য ছিল একটি করে গাধী; কোনো গাধীর দুটি, তিনটি, চারটি, পাঁচটি কিংবা তারও বেশি বাচ্চা ছিল। আল্লাহ তাঁকে পুরুষ ও নারী—উভয় ধরনের পরিবার-পরিজন ও সন্তানসন্ততি দান করেছিলেন।
তিনি ছিলেন সৎ, আল্লাহভীরু এবং দরিদ্রদের প্রতি দয়ালু। দরিদ্রদের আহার দিতেন, বিধবা ও এতিমদের দায়িত্ব নিতেন, অতিথির সম্মান করতেন এবং পথিককে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করতেন। আল্লাহর নিয়ামতের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং আল্লাহর হক আদায় করতেন। তাঁর দুনিয়াবি প্রাচুর্য তাঁকে আল্লাহর আদেশ থেকে অমনোযোগী করেনি; ইবলিসও তাঁর মধ্যে ধনীদের যে আত্মতুষ্টি, উদাসীনতা এবং দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে আল্লাহর আদেশ ভুলে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে, তা সৃষ্টি করতে পারেনি।
তাঁর সঙ্গে তিনজন লোক ছিলেন, যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং তাঁকে সত্য বলে মেনেছিলেন। ইয়েমেনের এক ব্যক্তি, যার নাম ছিল ইয়াকিন; আর তাঁর নিজের এলাকার দুই ব্যক্তি—একজনের নাম ইলদাদ, অন্যজনের নাম সাফির। তাঁরা ছিলেন মধ্যবয়স্ক। ইবলিস আসমানসমূহের কোনো কিছু থেকে আড়াল ছিল না; যেখানে ইচ্ছা সে সেখানেই অবস্থান করত।
আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে আসমানে তুলে নেওয়ার পর তাকে চার আসমান থেকে আড়াল করা হলো। মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণের পর অবশিষ্ট তিনটি থেকেও তাকে আড়াল করা হলো। ইবলিস ফেরেশতাদের আইয়ূবের জন্য দরুদ পাঠ করতে শুনল। আল্লাহ যখন আইয়ূবের কথা উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করলেন, তখন ইবলিসের মনে বিদ্বেষ ও হিংসা জাগল।
সে দ্রুত আসমানে উঠে তার নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে বলল: ‘হে আমার রব! আমি তোমার বান্দা আইয়ূবের বিষয়টি দেখেছি। তুমি তাকে নিয়ামত দিয়েছ, আর সে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে; তুমি তাকে সুস্থ রেখেছ, আর সে তোমার প্রশংসা করেছে। তুমি তাকে যা দিয়েছ, তা যদি তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে তাকে পরীক্ষা করতে, তাহলে সে তোমার কৃতজ্ঞতা ও ইবাদতে অবিচল থাকত না এবং তোমার আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যেত।’
আল্লাহ বললেন: ‘যাও, আমি তোমাকে তার সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব দিলাম।’ আল্লাহর শত্রু ইবলিস দ্রুত পৃথিবীতে নেমে এলো। সে জিনদের দুষ্ট ও বিদ্রোহী শয়তানদের একত্র করে বলল: ‘তোমাদের কী শক্তি আছে? আইয়ূবের সম্পদের ওপর আমাকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।
এটি এক বড় বিপর্যয় এবং এমন এক পরীক্ষা, যা পুরুষেরা সহ্য করতে পারে না।’ এক শয়তান বলল: ‘আমাকে এমন শক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ইচ্ছা করলে আমি আগুনের ঘূর্ণিবায়ুতে রূপান্তরিত হয়ে আমার নাগালের সবকিছু পুড়িয়ে দিতে পারি।’ ইবলিস বলল: ‘তুমি উট ও তাদের রাখালদের কাছে যাও।’
সে উটগুলোর কাছে গেল। উটগুলো তখন মাথা নিচু করে চারণভূমিতে স্থির হয়ে ছিল। লোকেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাটির নিচ থেকে আগুনের এক ঘূর্ণিবায়ু উঠে এল। কেউ তার কাছে গেলে পুড়ে যেত। তা উট ও তাদের রাখালদের পুড়িয়ে ফেলল, শেষ উটটি পর্যন্ত।
এরপর আল্লাহর শত্রু ইবলিস একটি কুৎসিত চেহারায়, একটি উটের ওপর চড়ে আইয়ূবের কাছে এল। সে তাঁকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখে বলল: ‘হে আইয়ূব! আগুন এসে তোমার উটগুলোকে গ্রাস করে পুড়িয়ে দিয়েছে; উট ও তাদের লোকদের মধ্যে আমি ছাড়া আর কেউ বাঁচেনি।’ আইয়ূব বললেন: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এগুলো দিয়েছিলেন এবং তিনিই তা নিয়ে নিয়েছেন।
বহু আগে থেকেই আমি আমার সম্পদ ও নিজেকে বিলীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছি।’ ইবলিস বলল: ‘তোমার রব আকাশ থেকে আগুন পাঠিয়েছিলেন, তাই সেগুলো পুড়ে গেছে।’ লোকেরা হতবুদ্ধি হয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তাদের কেউ বলল: ‘আইয়ূব কিছুই উপাসনা করতেন না; তিনি তো ভ্রান্তির মধ্যেই ছিলেন।’
কেউ বলল: ‘আইয়ূবের উপাস্য যদি কিছু করতে সক্ষম হতেন, তবে তাঁকে রক্ষা করতেন।’ আর কেউ বলল: ‘বরং তিনিই এমন করেছেন, যাতে তাঁর শত্রু আনন্দিত হয় এবং তাঁর বন্ধুরা বিপদে পড়ে।’ আইয়ূব বললেন: ‘যখন তিনি আমাকে দিয়েছিলেন, তখনও আল্লাহর প্রশংসা; আর যখন আমার কাছ থেকে নিয়ে নিয়েছেন, তখনও আল্লাহর প্রশংসা। আমি মায়ের গর্ভ থেকে নগ্ন হয়ে বেরিয়েছিলাম; নগ্ন অবস্থায়ই মাটিতে ফিরে যাব এবং নগ্ন অবস্থায়ই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হব।
আল্লাহ তোমার চেয়ে তোমার ও তোমাকে যা দিয়েছেন তার অধিক হকদার। হে বান্দা! আল্লাহ যদি তোমার মধ্যে কল্যাণ জানতেন, তবে তোমার প্রাণও ওই প্রাণগুলোর সঙ্গে নিয়ে নিতেন এবং তোমাকে শহীদ করতেন। কিন্তু তিনি তোমার মধ্যে মন্দ জানেন, তাই তোমাকে অবকাশ দিয়েছেন।’ ইবলিস লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল।
সে তাদের বলল: ‘তোমাদের কী শক্তি আছে? আমি তো তাঁর হৃদয়ে পৌঁছাতে পারিনি।’ এক শয়তান বলল: ‘আমার এমন শক্তি আছে যে, আমি এমন চিৎকার করতে পারি, যা কোনো প্রাণধারী শুনলে তার প্রাণ বেরিয়ে যাবে।’ ইবলিস বলল: ‘তুমি ভেড়া ও তাদের রাখালদের কাছে যাও।’
সে ভেড়ার পালের মাঝখানে গিয়ে এমন চিৎকার করল যে, সব ভেড়া ও তাদের রাখাল মরে লুটিয়ে পড়ল। তারপর ইবলিস রাখালদের ব্যবস্থাপকের বেশে আইয়ূবের কাছে এল। তিনি তখন নামাজ পড়ছিলেন। ইবলিস তাঁকে আগের কথাই বলল, আর আইয়ূব আগের মতোই জবাব দিলেন।
ইবলিস তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল: ‘তোমাদের কী শক্তি আছে? আমি তো আইয়ূবের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারিনি।’ এক শয়তান বলল: ‘ইচ্ছা করলে আমি এমন প্রবল ঝড়ে রূপ নিতে পারি, যা তার নাগালের সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়।’ ইবলিস বলল: ‘তুমি জমি চাষ করা লোকদের ও তাদের ফসলের কাছে যাও।’
লোকেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবল ঝড় বয়ে গেল এবং সেখানে যা কিছু ছিল, সব উড়িয়ে নিয়ে গেল—যেন কিছুই ছিল না। এরপর ইবলিস চাষের জমির ব্যবস্থাপকের রূপে আইয়ূবের কাছে এল। তিনি তখনও দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন। ইবলিস আগের কথাই বলল, আর আইয়ূব আগের মতোই জবাব দিলেন।
তাঁর সম্পদের যে অংশই ধ্বংস হতো, তিনি আল্লাহর প্রশংসা করতেন, তাঁর যথোচিত প্রশংসা করতেন, তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকতেন এবং বিপদে ধৈর্য ধরার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। এভাবে তাঁর আর কোনো সম্পদ অবশিষ্ট রইল না।
ইবলিস যখন দেখল, সে আইয়ূবের সব সম্পদ শেষ করে দিয়েছে, তখন আসমানে উঠে বলল: ‘হে আমার রব! আইয়ূব মনে করে, তুমি তাকে সন্তান দিয়ে রেখেছ বলে সম্পদও তাকে দাও। তুমি কি আমাকে তার সন্তানদের ওপর কর্তৃত্ব দেবে? এটাই এমন বিপদ, যা পুরুষদের হৃদয় সহ্য করতে পারে না।’
আল্লাহ বললেন: ‘যাও, আমি তোমাকে তার সন্তানদের ওপর কর্তৃত্ব দিলাম।’ আল্লাহর শত্রু দ্রুত নেমে আইয়ূবের সন্তানদের কাছে গেল। তারা তখন তাদের প্রাসাদে ছিল। সে প্রাসাদটিকে কাঁপাতে থাকল, শেষ পর্যন্ত তার ভিত্তিগুলো ধসে পড়ল। তারপর দেয়ালগুলোকে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা দিতে লাগল এবং তাদের ওপর কাঠ ও পাথর নিক্ষেপ করল।
তাদের ভয়াবহভাবে আঘাত করার পর প্রাসাদটি তুলে উল্টে দিল; তারা মাথার ওপর ভর করে নিচের দিকে পড়ে রইল। এরপর সে আইয়ূবের কাছে এমন একজন শিক্ষকের রূপে গেল, যিনি তাদের প্রজ্ঞা শেখাতেন। তার মুখ ছিল ক্ষতবিক্ষত, রক্ত ও মগজ ঝরছিল। সে তাঁকে জানাল: ‘যদি তুমি দেখতে, তোমার সন্তানদের কীভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং উল্টে ফেলা হয়েছে—তারা মাথা নিচের দিকে করে পড়ে আছে, তাদের রক্ত ও মগজ ঝরছে!
যদি তুমি দেখতে, তাদের পেট কীভাবে ফেটে গেছে এবং নাড়িভুঁড়ি ছড়িয়ে পড়েছে, তাহলে তোমার হৃদয় ভেঙে যেত।’ সে এ ধরনের কথা বলতে থাকল, যতক্ষণ না আইয়ূবের মন নরম হয়ে গেল। তিনি কেঁদে একমুঠো মাটি তুলে মাথায় দিলেন এবং বললেন: ‘হায়, আমার মা যদি আমাকে জন্ম না দিতেন!’ ইবলিস এ সুযোগ নিয়ে দ্রুত আনন্দিত হয়ে আসমানে উঠে গেল—আইয়ূবের কষ্ট প্রকাশ পেয়েছে ভেবে সে খুশি হয়েছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আইয়ূব নিজেকে সামলে নিলেন, সচেতন হলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তাঁর সঙ্গী ফেরেশতারা তাঁর তওবা নিয়ে আসমানে উঠলেন। আল্লাহ তা আগেই জানতেন। ইবলিস লাঞ্ছিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে বলল: ‘হে আমার রব! সম্পদ ও সন্তান নিয়ে আইয়ূবের কষ্ট সহজ ছিল, কারণ সে মনে করে তুমি তাকে তার প্রাণসহ জীবিত রেখেছ বলে তার সম্পদ ও সন্তান ফিরিয়ে দেবে।
তুমি কি আমাকে তার দেহের ওপর কর্তৃত্ব দেবে?’ আল্লাহ বললেন: ‘যাও, আমি তোমাকে তার দেহের ওপর কর্তৃত্ব দিলাম; তবে তার জিহ্বা ও হৃদয়ের ওপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না।’ আল্লাহ তার অবস্থা ভালোভাবেই জানতেন। তাঁর ওপর ইবলিসকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিল কেবল আইয়ূবের প্রতি রহমতস্বরূপ, যাতে তাঁর সওয়াব মহিমান্বিত হয় এবং তাঁকে ধৈর্যশীলদের জন্য দৃষ্টান্ত ও ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ করা হয়।
তাদের ওপর যে বিপদই নেমে আসুক, তারা যেন ধৈর্যে তাঁর অনুসরণ করে এবং সওয়াবের আশা রাখে।
আল্লাহর শত্রু দ্রুত নেমে এসে আইয়ূবকে সিজদারত অবস্থায় পেল। তিনি মাথা তোলার আগেই তাকে আক্রমণ করল। সামনে থেকে তাঁর কাছে এসে তাঁর নাসারন্ধ্রে ফুঁ দিল। তাতে তাঁর দেহ জ্বলে উঠল এবং মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভেড়ার বাঁটের মতো বড় বড় ফোড়া বেরিয়ে এল।
তাঁর দেহে চুলকানি শুরু হলো। তিনি নখ দিয়ে চুলকাতে থাকলেন, যতক্ষণ না সব নখ পড়ে গেল। তারপর খসখসে চট দিয়ে চুলকাতে লাগলেন, তাতে চামড়া ছিঁড়ে গেল। এরপর মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরা ও খসখসে পাথর দিয়ে চুলকাতে থাকলেন, যতক্ষণ না তাঁর মাংস পচে গেল, ছিঁড়ে গেল, রং বদলে গেল এবং দুর্গন্ধ ছড়াল।
গ্রামের লোকেরা তাঁকে বের করে দিয়ে আবর্জনার স্তূপে ফেলে রাখল এবং তাঁর জন্য একটি ছাউনি তৈরি করল। তাঁর স্ত্রী ছাড়া আল্লাহর সৃষ্টির সবাই তাঁকে ত্যাগ করল। তাঁর স্ত্রী ছিলেন রহমা বিনত আফরাথীম ইবন ইউসুফ ইবন ইয়াকুব। তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বারবার তাঁর কাছে যেতেন এবং তাঁর সঙ্গেই থাকতেন।
আইয়ূবের তিন সঙ্গী—ইয়াকিন, ইলদাদ ও সাফির—তাঁর ওপর আল্লাহর পরীক্ষা নেমে আসতে দেখে তাঁকে সন্দেহ করল এবং তাঁর ধর্ম ত্যাগ না করলেও তাঁকে পরিত্যাগ করল। বিপদ দীর্ঘস্থায়ী হলে তারা তাঁর কাছে এসে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করে বলল: ‘যে পাপের শাস্তিতে তুমি পড়েছ, সে পাপের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করো।’ তাদের সঙ্গে এক তরুণও ছিল। সে আইয়ূবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাঁকে সত্য বলে মেনেছিল।
সে বলল: ‘হে বয়োজ্যেষ্ঠরা! তোমরা কথা বলেছ। বয়সে বড় হওয়ায় কথা বলার অধিকার তোমাদেরই বেশি ছিল; কিন্তু তোমরা তোমাদের কথার চেয়ে উত্তম কথা, তোমাদের মতের চেয়ে অধিক সঠিক মত এবং তোমাদের কাজের চেয়ে সুন্দর কাজ পরিত্যাগ করেছ। আইয়ূবের তোমাদের ওপর যে অধিকার ও দায়িত্ব ছিল, তা তোমরা যা বলেছ তার চেয়ে অনেক বড়।
হে বয়োজ্যেষ্ঠরা, তোমরা কি জানো কাকে তোমরা হেয় করেছ, কার মর্যাদা লঙ্ঘন করেছ এবং কাকে দোষারোপ ও অভিযুক্ত করেছ? তোমরা কি জানো না, আইয়ূব আল্লাহর নবী, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে মনোনীত ও পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে বাছাইকৃত—তোমাদের এই সময় পর্যন্ত? তোমরা জানো না, আর আল্লাহও তোমাদের তাঁর বিষয়ের এমন কিছু জানাননি যে, তিনি তাঁকে যা দিয়েছিলেন, তা দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর কোনো কাজের জন্য অসন্তুষ্ট হয়েছেন; কিংবা তাঁর সম্মান থেকে কিছু কেড়ে নিয়েছেন; অথবা আইয়ূব আল্লাহ সম্পর্কে কোনো অসত্য কথা বলেছেন—তোমরা তাঁর সঙ্গে এতকাল কাটানোর পরও।
যদি বিপদই তাঁকে তোমাদের চোখে হেয় করে থাকে এবং তোমাদের মনে তাঁর মর্যাদা কমিয়ে দিয়ে থাকে, তবে তোমরা তো জানো, আল্লাহ মুমিন, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের পরীক্ষা করেন। তাঁদের ওপর পরীক্ষা নেমে আসা তাদের প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টি বা অবজ্ঞার প্রমাণ নয়; বরং তা তাদের জন্য সম্মান ও মনোনয়ন। আইয়ূব যদি তোমাদের কাছে আল্লাহর কাছে এই মর্যাদার অধিকারী না-ও হতেন, কেবল বন্ধুত্বের কারণে তোমাদের প্রিয় ভাই হতেন, তবুও কোনো সহনশীল মানুষের পক্ষে বিপদে পড়া ভাইকে হেয় করা, বিপদের জন্য দোষারোপ করা কিংবা সে বিষয়ে অজ্ঞ থেকে তাকে নিন্দা করা শোভন হতো না।
বরং তাকে দয়া করা, তার সঙ্গে কাঁদা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তার দুঃখে দুঃখিত হওয়া এবং সঠিক পথ দেখানো উচিত। যে এসব জানে না, সে সহনশীলও নয়, সঠিক পথপ্রাপ্তও নয়। হে বয়োজ্যেষ্ঠরা, আল্লাহর মহিমা ও গাম্ভীর্য এবং মৃত্যুর স্মরণই তো তোমাদের জিহ্বা স্তব্ধ ও হৃদয় ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! তোমরা কি জানো না, আল্লাহর এমন বান্দা আছেন, যাঁদেরকে আল্লাহর ভয়ে নীরব করে রাখা হয়েছে—অক্ষমতা বা বাকশক্তির অভাবে নয়।
তাঁরা বাগ্মী, প্রাঞ্জলভাষী, মর্যাদাবান, বুদ্ধিমান এবং আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী। কিন্তু আল্লাহর মহিমা স্মরণ করা হলে তাঁদের জিহ্বা থেমে যায়, শরীর কেঁপে ওঠে, হৃদয় ভেঙে যায় এবং আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা ও মহিমাবোধে তাঁদের বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে স্বাভাবিক হলে তাঁরা পবিত্র আমলের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে দ্রুত এগিয়ে যান। তাঁরা নিজেদেরকে জালিম ও অপরাধীদের দলে গণ্য করেন, অথচ তাঁরা সৎ ও নির্দোষ; নিজেদেরকে ত্রুটিপূর্ণ ও অবহেলাকারীদের মধ্যে গণ্য করেন, অথচ তাঁরা প্রখর বুদ্ধিমান ও শক্তিমান।’
আইয়ূব বললেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রহমতের মাধ্যমে ছোট-বড় সবার হৃদয়ে প্রজ্ঞা সৃষ্টি করেন। যখন তা হৃদয়ে গজিয়ে ওঠে, আল্লাহ তা জিহ্বায় প্রকাশ করেন। বয়স, বার্ধক্য কিংবা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেই প্রজ্ঞা আসে না। আল্লাহ কোনো বান্দাকে শৈশবে প্রজ্ঞা দিলে জ্ঞানীরা তার মর্যাদা কম মনে করেন না; বরং তারা তার মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মানের আলো দেখতে পান।’
এরপর আইয়ূব তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে তাঁর রবের দিকে ফিরে সাহায্য চেয়ে বিনয়ভরে বললেন: ‘হে আমার রব! তুমি আমাকে কেন সৃষ্টি করেছিলে? যদি তুমি আমাকে অপছন্দই করতে, তবে আমাকে সৃষ্টি না করলেই ভালো হতো! হায়, আমি যদি সেই পাপটি জানতে পারতাম, যা আমি করেছি, অথবা সেই কাজটি জানতে পারতাম, যার কারণে তুমি আমার দিক থেকে তোমার সম্মানিত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ!
তুমি যদি আমাকে মৃত্যু দিতে এবং আমার সম্মানিত পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে! মৃত্যু তো আমার জন্য আরও ভালো হতো। আমি কি অপরিচিতের আশ্রয়, দরিদ্রের আশ্রয়স্থল, এতিমের অভিভাবক ও বিধবার সহায় ছিলাম না? হে আমার ইলাহ! আমি তোমার বান্দা।
ভালো কাজ করলে তার অনুগ্রহ তোমারই; আর মন্দ করলে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও তোমার হাতে। তুমি আমাকে বিপদের লক্ষ্যবস্তু এবং পরীক্ষার পাত্র করে দিয়েছ। আমার ওপর এমন বিপদ এসেছে, যা কোনো পাহাড়ের ওপর চাপালে পাহাড়ও তা বহন করতে অক্ষম হতো—তবে আমার দুর্বলতা কীভাবে তা বহন করবে? তোমার ফয়সালাই আমাকে হেয় করেছে, তোমার কর্তৃত্বই আমাকে অসুস্থ ও দুর্বল করেছে।
আমার বুকে যে ভীতি আছে, তা যদি আমার রব সরিয়ে দিতেন এবং আমার জিহ্বা খুলে দিতেন, যাতে একজন বান্দার নিজের পক্ষে যেভাবে যুক্তি পেশ করা উচিত, সেভাবে আমি পূর্ণভাবে নিজের পক্ষে বলতে পারতাম, তবে আশা করতাম, তখন তিনি আমাকে এ বিপদ থেকে সুস্থ করে দেবেন। কিন্তু তিনি আমাকে পরিত্যাগ করেছেন এবং আমার থেকে দূরে হয়েছেন। তিনি আমাকে দেখেন, অথচ আমি তাঁকে দেখি না; আমার কথা শোনেন, অথচ আমি তাঁকে শুনি না। তিনি আমার দিকে তাকান না, যাতে আমার প্রতি দয়া করেন; আমার কাছে আসেন না, আমাকে তাঁর কাছে আসতে দেন না, যাতে আমি আমার অজুহাত পেশ করি, নির্দোষিতা প্রকাশ করি এবং নিজের পক্ষে তর্ক করি।’
আইয়ূব এসব কথা বলার পর তাঁর সঙ্গীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তখন তাদের ওপর মেঘ ছায়া ফেলল; তাঁরা মনে করলেন, বুঝি কঠিন শাস্তি নেমে এসেছে। এরপর আহ্বান করা হলো: ‘হে আইয়ূব! আল্লাহ বলেন: “আমি তোমার কাছে এসেছি; আমি কখনোই তোমার থেকে দূরে ছিলাম না।
ওঠো, তোমার অজুহাত পেশ করো, নির্দোষিতা প্রকাশ করো এবং নিজের পক্ষে যুক্তি দাও। তোমার কোমর বেঁধে নাও; এমন এক পরাক্রমশালীর সামনে দাঁড়াও, যে আরেক পরাক্রমশালীর সঙ্গে বিতর্ক করে—যদি তোমার সামর্থ্য থাকে। আমার সঙ্গে বিতর্ক করার যোগ্য কেবল আমার মতো পরাক্রমশালীরই আছে। হে আইয়ূব, তোমার মন তোমাকে এমন এক ব্যাপারের আশা দিয়েছে, যা তোমার শক্তিতে অর্জন করা সম্ভব নয়।
পৃথিবী সৃষ্টি করে তার ভিত্তির ওপর স্থাপন করার দিন তুমি কোথায় ছিলে? তুমি কি আমার সঙ্গে থেকে তার প্রান্তগুলো বিস্তৃত করেছিলে? কী পরিমাণে তার মাপ নির্ধারণ করেছি, তা কি জানতে? অথবা তার দিকগুলো কোন বস্তুর ওপর স্থাপন করেছি, তা কি জানতে?
তোমার আনুগত্যের কারণে কি পানি পৃথিবীকে বহন করছে? অথবা তোমার প্রজ্ঞায় কি পৃথিবী পানির জন্য আচ্ছাদন হয়েছে? বাতাসে কোনো ওপরের অবলম্বন ছাড়া এবং নিচের কোনো ঠেকনা ছাড়াই আকাশকে ছাদরূপে উঁচু করার দিন তুমি কোথায় ছিলে? তোমার প্রজ্ঞা কি এতদূর পৌঁছেছে যে, তুমি তার আলোকে প্রবাহিত করবে, তার নক্ষত্রগুলোকে চালাবে, অথবা তোমার আদেশে তার রাত ও দিনকে পাল্টাবে?
নদী উৎসারিত করা ও সমুদ্রকে আবদ্ধ করার দিন তুমি কোথায় ছিলে? তোমার কর্তৃত্ব কি সমুদ্রের ঢেউগুলোকে তার সীমানায় আটকে রেখেছে? অথবা তোমার শক্তি কি গর্ভাশয়গুলোকে তার নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলে খুলে দিয়েছে? মাটির ওপর পানি ঢেলে উঁচু উঁচু পাহাড় স্থাপন করার সময় তুমি কোথায় ছিলে?
জানো কি, কোন কিছুর ওপর সেগুলো স্থাপন করেছি? কোন ওজনে সেগুলো পরিমাপ করেছি? তোমার কি এমন কোনো বাহু আছে, যা সেগুলো বহন করতে পারে? আকাশ থেকে যে পানি নামিয়েছি, তা কোথা থেকে আসে—জানো কি? মেঘ কীভাবে সৃষ্টি হয়—জানো কি? তুষারের ভাণ্ডার কোথায়, শিলার পাহাড় কোথায়, রাতের ভাণ্ডার দিনের সঙ্গে কোথায়, আর বাতাসের ভাণ্ডার কোথায়—জানো কি?
গাছেরা কোন ভাষায় কথা বলে? পুরুষদের অন্তরে বুদ্ধি কে রেখেছেন? শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কে সৃষ্টি করেছেন? ফেরেশতাদের তাঁর রাজত্বের কাছে কে নত করেছেন? পরাক্রমশালীদের তাঁর পরাক্রমে কে পরাভূত করেছেন? তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে রিজিক কে বণ্টন করেছেন?”’
আল্লাহ তাঁর ক্ষমতার আরও বহু নিদর্শন আইয়ূবের কাছে উল্লেখ করলেন।
আইয়ূব বললেন: ‘হে আমার ইলাহ! আমার অবস্থান তুচ্ছ, আমার জিহ্বা ও বুদ্ধি অসহায়, আর আমার শক্তি এই বিষয়ের কাছে দুর্বল—যা তুমি আমার সামনে তুলে ধরেছ। হে আমার ইলাহ! আমি জানি, তুমি যা কিছু উল্লেখ করেছ, সবই তোমার হাতের সৃষ্টি ও তোমার প্রজ্ঞার পরিচালনা; আর তুমি চাইলে এর চেয়েও মহান ও বিস্ময়কর সৃষ্টি করতে।
কোনো কিছুই তোমাকে অক্ষম করতে পারে না, কোনো গোপন বিষয়ও তোমার অজানা নয়। বিপদ যখন আমাকে গ্রাস করেছিল, তখন আমি কথা বলেছিলাম এবং আমার জিহ্বাকে সামলাতে পারিনি; বিপদই আমাকে কথা বলিয়েছিল। হায়, পৃথিবী যদি আমার জন্য বিদীর্ণ হয়ে যেত, আমি তাতে চলে যেতাম এবং এমন কোনো কথা বলতাম না, যা আমার রবকে অসন্তুষ্ট করে! এর আগেই যদি আমার চরম বিপদের সময় দুঃখে আমার মৃত্যু হতো!
আমি যখন কথা বলেছিলাম, তখন শুধু এ আশায় বলেছিলাম যে, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে; আর যখন নীরব ছিলাম, তখন তোমার রহমতের আশায় নীরব ছিলাম। আমার মুখ থেকে একটি কথা ভুলক্রমে বেরিয়ে গেছে; আমি আর তা করব না। আমি মুখে হাত রেখেছি, জিহ্বায় দাঁত চেপেছি এবং গাল মাটিতে ঠেকিয়েছি। আজ আমি তোমার কাছেই তোমার থেকে আশ্রয় চাই; কঠিন বিপদ থেকে তোমার কাছে নিরাপত্তা চাই—আমাকে নিরাপদ রাখো।
তোমার শাস্তি থেকে তোমার কাছেই সাহায্য চাই—আমাকে সাহায্য করো। আমার ব্যাপারে তোমারই সাহায্য চাই—আমাকে সাহায্য করো। তোমার ওপর ভরসা করি—আমার জন্য যথেষ্ট হও। তোমার আশ্রয় গ্রহণ করি—আমাকে রক্ষা করো। তোমার কাছে ক্ষমা চাই—আমাকে ক্ষমা করো।
আমার কাছ থেকে তুমি অপছন্দ করো এমন কোনো কাজ আমি আর করব না।’ আল্লাহ বললেন: ‘হে আইয়ূব! তোমার ব্যাপারে আমার জ্ঞান কার্যকর হয়েছে এবং আমার রহমত আমার ক্রোধের আগে এসেছে। আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম, তোমার পরিবার ও সম্পদ তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম, আর সেগুলোর সমপরিমাণ আরও দিলাম—যাতে তুমি আমার সৃষ্টির জন্য নিদর্শন হও, বিপদগ্রস্তদের জন্য শিক্ষা এবং ধৈর্যশীলদের জন্য সান্ত্বনা হও।
তোমার পা দিয়ে আঘাত করো—এটি শীতল গোসলের পানি এবং পানীয়; এতে তোমার আরোগ্য রয়েছে। তোমার সঙ্গীদের জন্য কুরবানি করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো, কারণ তারা তোমার ব্যাপারে আমার অবাধ্য হয়েছে।’ আইয়ূব পা দিয়ে আঘাত করলেন, তখন তাঁর জন্য একটি ঝরনা প্রবাহিত হলো। তিনি তাতে প্রবেশ করে গোসল করলেন, আর আল্লাহ তাঁর সব বিপদ দূর করে দিলেন।
এরপর তিনি বেরিয়ে এসে বসলেন। তাঁর স্ত্রী বিছানায় তাঁকে খুঁজতে এলেন, কিন্তু তাঁকে পেলেন না। উদ্বিগ্ন ও দিশেহারা হয়ে তিনি এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন। তারপর বললেন: ‘হে আল্লাহর বান্দা! এখানে যে বিপদগ্রস্ত লোকটি ছিল, তার কোনো খবর জানো?’
তিনি বললেন: ‘তাকে দেখলে চিনতে পারবে?’ তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, কেন চিনতে পারব না?’ তিনি হেসে বললেন: ‘আমি সেই লোক।’ তাঁর হাসি দেখে তিনি তাঁকে চিনে ফেললেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। ইবন আব্বাস বলেন: ‘যাঁর হাতে আবদুল্লাহর প্রাণ, তাঁর শপথ!
তাঁদের সেই আলিঙ্গন শেষ হওয়ার আগেই তাঁদের সব সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তাঁদের কাছে ফিরে এসেছিল।’ এটাই আল্লাহর বাণীর অর্থ: “আর আইয়ূবের কথা স্মরণ করো, যখন তিনি তাঁর রবকে ডেকেছিলেন: নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে…”
আইয়ূব কখন দুআ করেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে”—কেন এ কথা বলেছিলেন এবং তাঁর পরীক্ষা কতকাল স্থায়ী হয়েছিল, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইবন শিহাব আনাসের সূত্রে মারফূ হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, আইয়ূব আঠারো বছর তাঁর বিপদে ছিলেন। ওহব বলেন, আইয়ূব তিন বছর বিপদে ছিলেন, এক দিনও বেশি নয়। কাব বলেন, তিনি সাত বছর, সাত মাস ও সাত দিন বিপদে ছিলেন।
হাসান বলেন, আইয়ূব বনি ইসরাঈলের আবর্জনার স্তূপে সাত বছর ও কয়েক মাস পড়ে ছিলেন। পশুরা তাঁর ওপর দিয়ে চলাচল করত; রহমা ছাড়া কেউ তাঁর কাছে আসত না। তিনি তাঁর সঙ্গে সত্যনিষ্ঠভাবে ধৈর্য ধরেছিলেন, তাঁর জন্য খাবার নিয়ে আসতেন এবং আইয়ূব আল্লাহর প্রশংসা করলে তিনিও আল্লাহর প্রশংসা করতেন। এ অবস্থায়ও আইয়ূব আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর পরীক্ষায় ধৈর্য ধরা থেকে বিরত হননি।
ইবলিস একবার চিৎকার করে পৃথিবীর সব দিক থেকে তার সৈন্যদের একত্র করল। তারা জড়ো হলে সে বলল: ‘তোমরা কি জানো, আমার দুঃখ কী?’ তারা বলল: ‘না।’ সে বলল: ‘এই বান্দা আমাকে অসহায় করে দিয়েছে। আমি তার সম্পদ ও সন্তানসন্ততি কিছুই অবশিষ্ট রাখিনি, তবুও সে শুধু ধৈর্যই বাড়িয়েছে।
তারপর তার দেহের ওপর কর্তৃত্ব পেয়ে তাকে এমন এক ক্ষতবিক্ষত দেহে আবর্জনার স্তূপে ফেলে রেখেছি, যার কাছে তার স্ত্রী ছাড়া কেউ আসে না। তোমাদের সাহায্য নেওয়ার জন্যই আমি তোমাদের ডেকেছি।’ তারা বলল: ‘আগের লোকদের ধ্বংস করার জন্য যে কৌশল ব্যবহার করেছিলে, তা কোথায়?’ সে বলল: ‘আইয়ূবের ক্ষেত্রে সেসব সব ব্যর্থ হয়েছে।
তোমরা পরামর্শ দাও।’ তারা বলল: ‘আদমকে জান্নাত থেকে বের করার সময় তুমি যে পথ নিয়েছিলে, সেই পথেই আইয়ূবের কাছে যাও—তার স্ত্রীর মাধ্যমে। সে তো তার অবাধ্য হতে পারবে না, আর তার স্ত্রী ছাড়া কেউই তার কাছে যায় না।’ ইবলিস বলল: ‘তোমরা ঠিক বলেছ।’
সে আইয়ূবের স্ত্রীর কাছে গেল। তিনি তখন ভিক্ষা করে খাবার জোগাড় করছিলেন। ইবলিস একজন মানুষের রূপ নিয়ে তাঁকে বলল: ‘হে আল্লাহর বান্দী, তোমার স্বামী কোথায়?’ তিনি বললেন: ‘ওই যে, ক্ষত চুলকাচ্ছেন; তাঁর দেহে পশুরা চলাফেরা করছে।’
এ কথা শুনে ইবলিস আশা করল, তিনি হয়তো হতাশার কোনো কথা বলবেন। সে তাঁকে কুমন্ত্রণা দিল, তাঁদের আগের নিয়ামত ও সম্পদের কথা স্মরণ করিয়ে দিল, আইয়ূবের সৌন্দর্য ও যৌবনের কথা বলল এবং বোঝাল যে, তাঁদের এ বিপদ কখনোই শেষ হবে না। হাসান বলেন, তিনি চিৎকার করে উঠলেন। তিনি চিৎকার করতেই ইবলিস বুঝল যে, তিনি ধৈর্য হারিয়েছেন।
সে একটি বাচ্চা ভেড়া নিয়ে এসে বলল: ‘আইয়ূবকে এটি জবাই করতে বলো; তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন।’ তিনি চিৎকার করতে করতে আইয়ূবের কাছে এসে বললেন: ‘হে আইয়ূব, আর কতদিন তোমার রব তোমাকে শাস্তি দেবেন? কোথায় সেই সম্পদ? কোথায় সন্তান? কোথায় বন্ধু?
কোথায় তোমার সুন্দর রং? কোথায় তোমার দেহ? এই বাচ্চাটি জবাই করো, আরাম পাবে।’ আইয়ূব বললেন: ‘আল্লাহর শত্রু তোমার কাছে এসেছে, তোমাকে প্ররোচিত করেছে। ধিক তোমাকে! তুমি যে সম্পদ, সন্তান ও সুস্থতা নিয়ে কাঁদছ, তা কে আমাকে দিয়েছিল?’
তিনি বললেন: ‘আল্লাহ।’ আইয়ূব বললেন: ‘আমরা কতকাল তা ভোগ করেছি?’ তিনি বললেন: ‘আশি বছর।’ তিনি বললেন: ‘আর কতকাল ধরে আমরা বিপদে আছি?’ তিনি বললেন: ‘সাত বছর ও কয়েক মাস।’ তিনি বললেন: ‘ধিক তোমাকে! তুমি ন্যায়বিচার করোনি। আমরা আশি বছর স্বচ্ছন্দে কাটিয়েছি; বিপদে অন্তত আশি বছর ধৈর্য ধরতে পারলে না?
আল্লাহ আমাকে সুস্থ করলে আমি তোমাকে একশত বেত্রাঘাত করব। তুমি আমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে জবাই করতে বলেছ। তোমার আনা খাবার ও পানীয় আমার জন্য হারাম; তুমি আমাকে এ কথা বলার পর তোমার আনা কিছুই আমি আর মুখে তুলব না। আমার কাছ থেকে চলে যাও; তোমাকে আর যেন না দেখি।’ তিনি তাঁকে তাড়িয়ে দিলেন এবং স্ত্রী চলে গেলেন।
আইয়ূব যখন দেখলেন তাঁর কাছে খাবার, পানীয় বা কোনো বন্ধু নেই, তখন তিনি সিজদায় পড়ে বললেন: ‘হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।’ তাঁকে বলা হলো: ‘মাথা তোলো; তোমার দুআ কবুল হয়েছে। পা দিয়ে আঘাত করো।’
তিনি পা দিয়ে আঘাত করলেন, তখন একটি ঝরনা উৎসারিত হলো। তিনি তাতে গোসল করলেন; তাঁর রোগের কোনো বাহ্যিক চিহ্ন অবশিষ্ট রইল না। ঝরে পড়া চামড়া দূর হলো এবং তাঁর যৌবন ও সৌন্দর্য আগের চেয়েও উত্তমভাবে ফিরে এল। এরপর তিনি আবার পা দিয়ে আঘাত করলেন, তখন আরেকটি ঝরনা উৎসারিত হলো।
তিনি তা থেকে পান করলেন, ফলে তাঁর শরীরের ভেতরের সব রোগ বেরিয়ে গেল। তিনি সুস্থ হয়ে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে একটি পোশাক পরানো হলো। তিনি চারদিকে তাকিয়ে তাঁর পরিবার ও সম্পদের কোনো কিছুই আগের মতো দেখতে পেলেন না; বরং আল্লাহ সেগুলো দ্বিগুণ করে দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে যে, গোসলের পানি তাঁর বুকে ছিটকে পড়ে সোনার পঙ্গপালে পরিণত হয়েছিল।
তিনি তা হাতে কুড়িয়ে নিতে লাগলেন। আল্লাহ তাঁর কাছে ওহি পাঠালেন: ‘হে আইয়ূব! আমি কি তোমাকে অভাবমুক্ত করিনি?’ তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, করেছি; কিন্তু এগুলো তো তোমার বরকত—এ থেকে কে তৃপ্ত হতে পারে?’
এরপর তিনি একটি উঁচু স্থানে গিয়ে বসলেন। তাঁর স্ত্রী ভাবলেন, আইয়ূব যদি তাঁকে তাড়িয়ে দিয়ে থাকেন, তবে তিনি কার কাছে যাবেন? তাঁকে কি ক্ষুধায় মরতে ছেড়ে দেবেন, যাতে পশুরা তাঁকে খেয়ে ফেলে? তাই তিনি ফিরে এলেন। সেখানে কোনো আবর্জনার স্তূপ বা আগের অবস্থা আর দেখতে পেলেন না; সবকিছু বদলে গিয়েছিল।
তিনি যেখানে আবর্জনার স্তূপ ছিল, সেখানে ঘুরে ঘুরে কাঁদছিলেন। আইয়ূব তাঁকে দেখছিলেন। পোশাক পরা লোকটির কাছে গিয়ে তাঁর খবর জিজ্ঞেস করতে তিনি সংকোচ বোধ করছিলেন। আইয়ূব তাঁকে ডেকে বললেন: ‘হে আল্লাহর বান্দী, তুমি কী চাও?’ তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন: ‘আমি সেই বিপদগ্রস্ত লোকটিকে খুঁজছিলাম, যে এখানে আবর্জনার স্তূপে পড়ে ছিল।
জানি না, সে হারিয়ে গেছে, নাকি তার কী হয়েছে।’ আইয়ূব বললেন: ‘সে তোমার কী হয়?’ তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন: ‘সে আমার স্বামী।’ তিনি বললেন: ‘তাকে দেখলে চিনতে পারবে?’ তিনি বললেন: ‘তাকে যে দেখেছে, তার কাছে কি সে অচেনা হতে পারে?’
তিনি তাঁর দিকে তাকাতে লাগলেন, কিন্তু ভয়ে কাছে আসছিলেন না। তারপর বললেন: ‘সে সুস্থ থাকা অবস্থায় তোমার চেয়ে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে আর কারও সঙ্গে তার সাদৃশ্য ছিল না।’ তিনি বললেন: ‘আমিই আইয়ূব। তুমি আমাকে ইবলিসের উদ্দেশ্যে বাচ্চাটি জবাই করতে বলেছিলে।
আমি আল্লাহর আনুগত্য করেছি এবং শয়তানের অবাধ্য হয়েছি; তারপর আল্লাহর কাছে দুআ করেছি, ফলে তিনি যা দেখছ, তা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।’
ওহব বলেন: আইয়ূব তিন বছর বিপদে ছিলেন। আইয়ূব যখন ইবলিসকে পরাভূত করলেন এবং ইবলিস তাঁর কাছ থেকে কোনো কিছুই করাতে পারল না, তখন সে এমন এক সত্তার রূপে তাঁর স্ত্রীর সামনে উপস্থিত হলো, যার দেহ, আকার ও সৌন্দর্য মানুষের মতো ছিল না। সে এমন এক বাহনে চড়ে এসেছিল, যা মানুষের বাহনের মতো নয়—তার ছিল বিশালত্ব, জ্যোতি ও পূর্ণতা। সে তাঁকে বলল: ‘তুমি কি এই বিপদগ্রস্ত লোকটির স্ত্রী?’
তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ।’ সে বলল: ‘আমাকে চেনো?’ তিনি বললেন: ‘না।’ সে বলল: ‘আমি পৃথিবীর ইলাহ। তোমার স্বামীর সঙ্গে যা করেছি, তা আমিই করেছি। সে আসমানের ইলাহর ইবাদত করে আমাকে পরিত্যাগ করেছে, তাই আমি ক্রুদ্ধ হয়েছি। সে যদি আমাকে একটি সিজদাও করত, তবে তোমাদের আগের সব সম্পদ ও সন্তান ফিরিয়ে দিতাম; সবই আমার কাছে আছে।’
তারপর সে তাঁকে সেই উপত্যকায় তাদের দেখাল, যেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওহব বলেন: আমি শুনেছি, সে তাঁকে বলেছিল, ‘তোমার স্বামী যদি আল্লাহর নাম না নিয়ে খাবার খেত, তবে সে এই বিপদ থেকে সুস্থ হয়ে যেত।’ আল্লাহই ভালো জানেন। কোনো কোনো গ্রন্থে আছে, ইবলিস তাঁকে বলেছিল: ‘আমাকে একটি সিজদা করো; আমি তোমাকে সম্পদ ও সন্তান ফিরিয়ে দেব এবং তোমার স্বামীকে সুস্থ করব।’
তিনি আইয়ূবের কাছে ফিরে এসে তাকে যা বলা হয়েছিল তা জানালেন। তিনি বললেন: ‘আল্লাহর শত্রু তোমার কাছে এসেছে, তোমাকে তোমার দ্বীন থেকে বিচ্যুত করতে।’ এরপর তিনি শপথ করলেন যে, তাঁকে একশত বেত্রাঘাত করবেন। সেই সময় তিনি বললেন: ‘ইবলিস আমার সম্মানিত স্ত্রীর কাছ থেকে সিজদা পাওয়ার আশা করেছে এবং তাকে ও আমাকে কুফরের দিকে আহ্বান করেছে—এ কারণে আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে।’
এরপর আল্লাহ আইয়ূবের স্ত্রীর ওপর দয়া করলেন—তিনি তাঁর সঙ্গে বিপদে ধৈর্য ধরেছিলেন। আল্লাহ তাঁর কষ্ট লাঘব করতে চাইলেন এবং আইয়ূবের শপথ পূর্ণ করাতে চাইলেন। তাই তাঁকে নির্দেশ দিলেন, একশত ছোট ডালসহ একটি ঝাড়ু হাতে নিয়ে স্ত্রীকে একবার আঘাত করতে, যাতে শপথভঙ্গ না হয়। আল্লাহ বলেন: “তুমি তোমার হাতে একগুচ্ছ ঘাস নাও, তারপর তা দিয়ে আঘাত করো এবং শপথ ভঙ্গ কোরো না।”
(সূরা সাদ, ৩৮:৪৪)। বর্ণিত হয়েছে, ইবলিস একটি বাক্স বানিয়ে তার মধ্যে ওষুধপত্র রাখল এবং আইয়ূবের স্ত্রীর পথে বসে লোকদের চিকিৎসা করতে লাগল। আইয়ূবের স্ত্রী তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: ‘আমার একজন রোগী আছে, তুমি কি তার চিকিৎসা করবে?’ সে বলল: ‘হ্যাঁ।
তবে আমি কিছু চাই না—শুধু সে সুস্থ হলে বলবে, “তুমিই আমাকে সুস্থ করেছ।”’ তিনি কথাটি আইয়ূবকে জানালেন। তিনি বললেন: ‘ও তো ইবলিস; সে তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে।’ আর আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করলে তিনি স্ত্রীকে একশত বেত্রাঘাত করবেন বলে শপথ করলেন।
ওহব ও অন্যদের বর্ণনায় আছে: আইয়ূবের স্ত্রী মানুষের জন্য কাজ করতেন এবং তাঁর খাবার নিয়ে আসতেন। বিপদ দীর্ঘ হওয়ায় মানুষ তাঁকে আর কাজ দিত না। একদিন তিনি তাঁর স্বামীকে খাওয়ানোর মতো কিছুই পেলেন না। তাই নিজের মাথার একটি বেণি কেটে রুটির বিনিময়ে বিক্রি করে তা আইয়ূবের কাছে নিয়ে এলেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘তোমার বেণি কোথায়?’ তিনি তাঁকে সব জানালেন। তখনই তিনি বললেন: ‘আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে।’ একদল আলেম বলেন: কীট তাঁর হৃদয় ও জিহ্বার দিকে এগিয়ে আসার পর তিনি এ কথা বলেছিলেন; তাঁর ভয় হয়েছিল, আল্লাহর স্মরণ ও চিন্তা থেকে যেন বিরত না হয়ে যান।
হাবীব ইবন আবি সাবিত বলেন: তিনটি বিষয় প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আল্লাহর কাছে বিপদ দূর করার দুআ করেননি। প্রথমত, তাঁর খবর পেয়ে দুই বন্ধু তাঁর কাছে এলেন। তাঁর চোখ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না; তাঁরা ভয়াবহ অবস্থা দেখে বললেন: ‘আল্লাহর কাছে তোমার কোনো মর্যাদা থাকলে তোমার ওপর এমন বিপদ আসত না।’ দ্বিতীয়ত, তাঁর স্ত্রী খাবার চাইলেন, কিন্তু তাঁকে খাওয়ানোর মতো কিছু পেলেন না; তাই নিজের বেণি বিক্রি করে খাবার তাঁর কাছে নিয়ে এলেন।
তৃতীয়ত, ইবলিস বলল: ‘আমি তাকে চিকিৎসা করব, তবে সে যেন বলে, “তুমিই আমাকে সুস্থ করেছ।”’ আরেকটি মত হলো, ইবলিস তাঁকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলেছিল, তাঁর স্ত্রী ব্যভিচার করেছেন; তাই তিনি তাঁর স্ত্রীর বেণি কেটে দিয়েছিলেন। তখন তাঁর ধৈর্য শেষ হয়ে যায়, তিনি দুআ করেন এবং স্ত্রীকে একশত বেত্রাঘাত করবেন বলে শপথ করেন। আরেকটি মত হলো, শত্রুদের বিদ্রূপে তাঁর কষ্ট হয়েছিল।
এমনকি তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে, বিপদের কোন বিষয়টি তাঁর কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল, তিনি বলেছিলেন: ‘শত্রুদের বিদ্রূপ।’ আরও বলা হয়েছে, তাঁর উরু থেকে একটি কীট পড়ে গেলে তিনি সেটিকে আবার আগের জায়গায় রেখে বলেছিলেন: ‘খাও, আল্লাহ আমাকে তোমার খাদ্য বানিয়েছেন।’ সেটি তাঁকে এমনভাবে কামড়েছিল যে, এর ব্যথা কীটপতঙ্গের কামড়ে এর আগে তিনি যত কষ্ট পেয়েছিলেন, সবকিছুর চেয়ে বেশি ছিল।
যদি বলা হয়, আল্লাহ তাঁকে ধৈর্যশীল বলেছেন, অথচ তিনি অভিযোগ ও অস্থিরতা প্রকাশ করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে” এবং “শয়তান আমাকে ক্লান্তি ও যন্ত্রণায় স্পর্শ করেছে”—তবে জবাব হলো: এটি অভিযোগ নয়; বরং দুআ। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী: “তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম।” অভিযোগ বলতে মানুষের কাছে কষ্টের কথা বলা বোঝায়; আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা অস্থিরতা বা ধৈর্য ত্যাগ করা নয়। যেমন ইয়াকুব (আ.)
বলেছিলেন: “আমি আমার দুঃখ ও বেদনা শুধু আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।” (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬)। সুফিয়ান ইবন উয়াইনা বলেন: কেউ আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় মানুষের কাছে কষ্টের কথা প্রকাশ করলেও তা অস্থিরতা নয়। যেমন বর্ণিত আছে, জিবরীল (আ.)
অসুস্থ অবস্থায় নবী (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘আপনি কেমন বোধ করছেন?’ তিনি বলেছিলেন: ‘আমি নিজেকে বিষণ্ন ও ব্যথাক্লিষ্ট বোধ করছি।’ আর আয়িশা (রা.) যখন বললেন, ‘হায়, আমার মাথা!’ তখন নবী (সা.) বললেন: ‘বরং আমার মাথা!’
“সহিহ আল-বুখারি” (নং ৩৩৯১)-এ আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ আইয়ূব (আ.)-কে সুস্থতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং আকাশ থেকে তাঁর ওপর সোনার পঙ্গপাল বর্ষণ করেছিলেন।