لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ.
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
স্মরণ কর যুন্-নুন এর কথা- যখন সে গোস্বাভরে চলে গিয়েছিল, আর ভেবেছিল যে তার উপর আমার কোন ক্ষমতা খাটবে না। অতঃপর সে (সমুদ্রের) গভীর অন্ধকার থেকে ডেকেছিল যে, তুমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তোমারই পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা করছি; বাড়াবাড়ি আমিই করেছি।
এর ধরন: এতে তাওহিদের (لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ), তাসবিহের (سُبْحَانَكَ) এবং নিজের পাপ স্বীকারের (إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ) সমন্বয় ঘটেছে। এটি মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আ.)-এর দোয়া হিসেবে পরিচিত; একে যুন-নূনের দোয়াও (دُعَاءُ ذِي النُّونِ) বলা হয়।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
অর্থাৎ, আমাদের বান্দা ও রাসূল যুন-নূনকে—তিনি হলেন ইউনুস (আ.), অর্থাৎ মাছের অধিকারী—সুন্দর স্মরণ ও উত্তম প্রশংসার সঙ্গে স্মরণ করো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাদের আহ্বান জানালেন, কিন্তু তারা ঈমান আনল না। তখন তিনি তাদের জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের পর শাস্তি নেমে আসবে বলে সতর্ক করলেন।
তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করল; অতঃপর আল্লাহর কাছে কাতর মিনতি করল, চিৎকার করে প্রার্থনা করল এবং তওবা করল। ফলে আল্লাহ তাদের থেকে শাস্তি সরিয়ে নিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: “তবে এমন কোনো জনপদ কেন হলো না, যারা ঈমান আনত, ফলে তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসত? ইউনুসের সম্প্রদায় ছাড়া—যখন তারা ঈমান আনল, তখন আমি তাদের থেকে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি সরিয়ে দিলাম এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের ভোগ করতে দিলাম।”
(সূরা ইউনুস ১০:৯৮) আর তিনি বলেন: “আর আমি তাকে এক লক্ষ বা তারও বেশি লোকের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তারা ঈমান আনল; তাই আমি তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভোগ করতে দিলাম।” (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১৪৭–১৪৮) ইউনুসের আহ্বানে ঈমান আনা এই মহান সম্প্রদায় তাঁর অন্যতম বড় মর্যাদা।
কিন্তু তিনি (আ.) ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন এবং কোনো এক পাপের কারণে তাঁর রবের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁর কিতাবে সে পাপের কথা আমাদের জানাননি; তা নির্দিষ্ট করে জানারও আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বাহ্যত, তাঁর তাড়াহুড়ো, সম্প্রদায়ের ওপর ক্রুদ্ধ হওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশের আগে তাদের মধ্য থেকে চলে যাওয়ার কারণে তিনি ধারণা করেছিলেন যে আল্লাহ তাঁকে সংকীর্ণতায় ফেলবেন না—অর্থাৎ মাছের পেটে তাঁকে কষ্ট দেবেন না—অথবা ধারণা করেছিলেন যে তিনি আল্লাহর নাগালের বাইরে চলে যেতে পারবেন।
পূর্ণতাপ্রাপ্ত বান্দাদের ক্ষেত্রেও এমন ধারণা সাময়িকভাবে আসা অসম্ভব নয়, যদি তা স্থায়ী না হয় এবং তার ওপর তারা অটল না থাকে।
এরপর তিনি কিছু লোকের সঙ্গে নৌযানে উঠলেন। তারা আশঙ্কা করল, সবাই নৌযানে থাকলে ডুবে যাবে; তাই তাদের মধ্যে কে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হবে, সে জন্য লটারি করল। লটারিতে ইউনুস (আ.)-এর নাম উঠল। মাছ তাঁকে গিলে ফেলল এবং সমুদ্রের অন্ধকারে নিয়ে গেল।
সেই অন্ধকারে তিনি ডাকলেন: “তুমি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র; নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” তিনি আল্লাহর পূর্ণ উপাস্যত্ব স্বীকার করলেন, তাঁকে সব অপূর্ণতা, ত্রুটি ও বিপদাপদ থেকে পবিত্র ঘোষণা করলেন এবং নিজের প্রতি অন্যায় ও অপরাধ স্বীকার করলেন। তাঁর সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: “যখন সে পালিয়ে নৌযানে উঠেছিল” (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১৪০) এবং “যখন সে নিন্দনীয় কাজ করেছিল” (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১৪২)—এগুলো এ কথাই নির্দেশ করে যে, তিনি এমন কাজ করেছিলেন যার জন্য তাঁকে তিরস্কার করা হয়েছিল।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই ঘটনাটি এখানেও বর্ণিত হয়েছে এবং সূরায়ে ‘সাফাত ও সূরায়ে ‘নূন'-এও বর্ণিত হয়েছে। ইনি হলেন নবী হযরত ইউনুস ইবনু মাত্তা (আঃ)। তাকে আল্লাহ তাআলা মূসিল অঞ্চলের নীনওয়া নামক গ্রামে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ঐ গ্রামবাসীদেরকে আল্লার পথে আহবান করেন; কিন্তু তারা ঈমান আনলো না।
তখন তিনি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে যান এবং তাদেরকে বলে যান যে, তাদের উপর তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে। তার কথায় তাদের বিশ্বাস হয়ে যায় এবং তারা জেনে নেয় যে, নবীর (আঃ) কথা মিথ্যা হয় না। তাই, তারা তাদের শিশুদেরকে ও গৃহপালিত পশুগুলিকে নিয়ে ময়দানের দিকে বেরিয়ে পড়লো। শিশুদেরকে তারা মাতাদের থেকে পৃথক করে দিলো।
অতঃপর তারা কাদতে কাঁদতে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলো। একদিকে তাদের কান্নার রোল, আর অপরদিকে জীব জন্তুগুলোর ভয়ানক চীৎকার। এর ফলে আল্লাহর রহমত উথলিয়ে ওঠে। সুতরাং তিনি তাদের উপর হতে শাস্তি উঠিয়ে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবে ইউনুসের (আঃ) সম্প্রদায় ব্যতীত কোন জনপদবাসী কেন এমন হলো না যারা ঈমান আনতো এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসতো?
যখন তারা ঈমান আনলো তখন আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে হীনতাজনক শাস্তি হতে মুক্ত করলাম এবং কিছু কালের জন্যে জীবনোপভোগ করতে দিলাম।" (১০:৯৮)হযরত ইউনুস (আঃ) এখান হতে চলে গিয়ে একটি নৌকায় আরোহণ করেন। নৌকা কিছুদূর এগিয়ে গেলে তুফানের লক্ষণ প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়।
নৌকার আরোহীদের মধ্যে পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, নৌকার ভার হাল্কা করার জন্যে কোন একজন লোককে সমদ্রে নিক্ষেপ করা হোক। সুতরাং নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করা হলে দেখা গেল যে, হযরত ইউনুসেরই (আঃ) নাম বের হয়েছে। কিন্তু কেউই তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা পছন্দ করলো না। দ্বিতীয়বার গুটিকা নিক্ষেপ করা হলো।
এবারও তার নামই উঠলো। তৃতীয়বার পুনরায় গুটিকা ফেলা হলে এবারও তাঁর নামই দেখা দিল। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে লটারীতে যোগদান করলো এবং পরাভূত হলো।" (৩৭:১৪১) তখন হযরত ইউনুস (আঃ) নিজেই দাড়িয়ে গেলেন এবং কাপড় খুলে ফেলে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লেন।
তখন হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) উক্তি অনুসারে আল্লাহ তাআলা ‘বাহরে আখ্যার’ (সবুজ সাগর) হতে একটি বিরাট মাছ পাঠিয়ে দিলেন। মাছটি পানি ফেড়ে ফেড়ে আসলো এবং হযরত ইউনুসকে (আঃ) গিলে ফেললো। কিন্তু মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে মাছটি তার মাংসও খেলো না, অস্থিও ভেঙ্গে ফেললো না। এবং কোন ক্ষতিও করলো না।
মাছটির তিনি খাদ্য ছিলেন না, বরং ওর পেট ছিল তার জন্যে কয়েদখানা স্বরূপ। আরবী ভাষায় মাছকে নূন বলা হয়। হযরত ইউনুসের (আঃ) ক্রোধ ছিল তাঁর কওমের উপর। তার ধারণা ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সংকীর্ণতা আনয়ন করবেন না। এখানে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত যহাক (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন (আরবী) এর অর্থ এটাই করেছেন।
ইমাম ইবনু জারীরও (রাঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। দলীল হিসেবে আল্লাহ তাআলার নিম্নেন উক্তিটি পেশ করা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যার জীবনোপকরণ সংকীর্ণ বা সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে; আল্লাহ যাকে যে সামর্থ দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না; আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি।" (৬৫:৭) হযরত আতিয়্যাহ আওফী এটার অর্থ করেছেনঃ “আমি তার উপর নির্ধারণ করবো না। আরববাসীরা (আরবী) ও (আরবী) এর একই অর্থ করে থাকে।
কোন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ যুগ আর প্রত্যাবর্তনকারী নয় যা অতীত হয়েছে। আপনি কল্যাণময়, আপনি যা নির্ধারণ করেন সেই কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর সব পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পনা অনুসারে।” (৫৪:১২) ঐ অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করে হযরত ইউনুস (আঃ) মহান আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেন।
সেখানে সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার এবং রাত্রির অন্ধকার এই তিন অন্ধকার একত্রিত হয়েছিল। তিনি সমুদ্রের তলদেশের কংকর গুলির তাসবীহ পাঠ শুনে নিজেও তাসবীহ পাঠ করতে শুরু করেন। তিনি মাছের পেটে গিয়ে প্রথমতঃ মনে করে ছিলেন যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপর তিনি পা নাড়িয়ে দেখেন এবং তা নড়ে ওঠে।
সুতরাং মাছের পেটের মধ্যেই তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি এমন এক জায়গাকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছি। যে, সতঃ কেউই এই জায়গাকে ইতিপূর্বে সিজদার জায়গা বানায় নাই। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইউনুস (আঃ) চল্লিশ দিন মাছের পেটে ছিলেন।
তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন হযরত ইউনুসকে (আঃ) বন্দী করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি মাছকে নির্দেশ দেনঃ “তুমি তাকে গিলে নাও, কিন্তু তার মাংস ভক্ষণ করো না এবং অস্থিও ভেঙ্গে ফেলো না।" যখন তিনি সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছেন তখন সেখানে তাসবীহ পাঠ শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, এটা হলো সমুদ্রের জন্তু গুলির তাসবীহ পাঠ। তখন তিনিও আল্লাহর তাসবীহ পাঠ শুরু করে দেন।
তার তাসবীহ পাঠ শুনে ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এটা খুবই দুরের শব্দ এবং খুবই দুর্বল অওয়ায, কার আওয়ায এটা? আমরা তে বুঝতে পারলাম না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উত্তরে বললেনঃ “এটা আমার বান্দা ইউনুসের (আঃ) শব্দ। সে আমার নাফরমানী করেছে বলে আমি তাকে মাছের পেটে বন্দী করেছি।"
ফেরেশতারা তখন বললেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! তার নেক আমলগুলি তো দিনরাত্রির সব সময় আকাশে উঠতেই থাকতো ।?" উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হা।” তখন তারা তার জন্যে সুপারিশ করেন। আল্লাহ তাদের সুপারিশ ককূল করেন। তিনি মাছকে নিদের্শ দেন যে, সে যেন তাঁকে সমুদ্রের তীরে উগলিয়ে দেয়।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর আমি তাকে নিক্ষেপ করলাম এক তৃণহীন প্রান্তরে এবং সে ছিল রুগ্ন।” (৩৭:১৪৫) উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটির ঐ একটি মাত্র সনদ। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন- (আরবী) এই কালেমাটির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন তখন এই কালেমাটি আরূশের চারদিকে ঘুরতে থাকে। তখন ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক!
এটা তো খুবই দূরের শব্দ। কিন্তু কান এ শব্দের সাথে পরিচিত। এটা অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ শব্দ!" আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কার শব্দ তা কি তোমরা জান না?” উত্তরে তারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! না তো! কে তিনি?” আল্লাহ তাআলা তখন বলেনঃ “এটা হলো আমার বান্দা ইউনুসের (আঃ) শব্দ।
ফেরেশতারা তখন বলেনঃ “তা হলে তিনি তো সেই ইউনস (আঃ} যার ককূলকৃত পবিত্র আমল প্রত্যেক দিন আপনার নিকট উঠে আসতো এবং যার প্রার্থনা আপনি ককূল করতেন! হে আমাদের প্রতিপালক! তিনি যখন সুখের সময় ভাল আমল করতেন তখন এই বিপদের সময় আপনি তার প্রতি দয়া করুন!” তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা মাছকে হুকুম করলেন যে, সে যেন কোন কষ্ট না দিয়েই তাকে সমুদ্রের তীরে নিক্ষেপ করে।
(এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করলাম দুশ্চিন্তা হতে। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি। সে বিপদে পরিবেষ্টিত হয়ে যখন আমাকে আহবান করলো, আমি তখন তার আহবানে সাড়া দিলাম এবং ঐ বিপদ থেকে তাকে মুক্তি দান করলাম। বিশেষ করে যারা বিপদ আপদের সময় এই দুআয়ে ইউনুস (আঃ) পাঠ করে তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ঐ সব বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করে থাকেন।
এ ব্যাপারে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে খুবই উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। হযরত সা’দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি মসজিদে হযরত উছমান ইবনু আফানের (রাঃ) নিকট গমন করি। আমি তাকে সালাম করি। তিনি আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখেন, কিন্তু আমার সালামের জবাব দিলেন না।
আমি তখন আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু খাত্তাবের (রাঃ) নিকট গিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। তিনি হযরত উছমানকে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে বলেনঃ “আপনি আপনার এই মুসলমান ভাই-এর সালামের জবাব দেন নাই কেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এরূপ করি নাই (অর্থাৎ তিনি আমার কাছে আসেন নাই এবং সালামও দেন নাই।" আমি।
বললামঃ হাঁ (অর্থাৎ আমি এসেছি ও সালাম দিয়েছি)। শেষ পর্যন্ত তিনি শপথ করলেন এবং আমিও শপথ করলাম। তারপর কি মনে করে তিনি বললেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার কাছে তাওবা করছি। অবশ্যই ইতিপূর্বে আমার কাছে এসেছিলেন।
কিন্তু ঐ সময় আমি মনে মনে ঐকথা বলছিলাম যা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে শুনেছিলাম। আল্লাহর শপথ! যখন আমার ঐ কথা মনে হয়ে যায় তখন শুধু আমার চোখের উপরই পর্দা পড়ে না, বরং আমার অন্তরের উপরও পর্দা পড়ে যায়। আমি তখন বললামঃ আমি আপনাকে ঐ খবর দিচ্ছি।
একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে প্রথম দুআ’র বর্ণনা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কথার মোড় নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন। এভাবে অনেক্ষণ কেটে যায়। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং নিজের বাড়ীর দিকে চলতে শুরু করেন।
আমিও তার পিছনে পিছনে চলতে থাকি। যখন তিনি বাড়ীর কাছাকাছি হয়ে যান তখন আমি আশংকা করি যে, তিনি হয়তো বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করবেন, আর আমি এখানেই রয়ে যাবো। সুতরাং আমি জোরে জোরে পা ফেলে চলতে লাগলাম। আমার জুতার শব্দ শুনে তিনি আমার দিকে ফিরে তাকান এবং বলেনঃ “আরে, তুমি আবু ইসহাক?”
আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ, আমিই বটে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “খবর কি?” আমি জবাব দিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি প্রথম দুআ’র বর্ণনা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ঐ বেদুঈন এসে পড়েছিল এবং আপনার কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
তিনি আমার একথা শুনে বললেনঃ “হাঁ, হাঁ।” ওটা ছিল যুন নূনের (আঃ) দুআ যা তিনি মাছের পেটের মধ্যে থাকা অবস্থায় করেছিলেন। অর্থাৎ (আরবী) এই দুআ’টি। জেনে রেখো যে, যে কোন মুসলমান যে কোন ব্যাপারে যখনই তার প্রতিপালকের কাছে এই দুআ’টি করবে, তিনি তা ককূল করবেন।”
(এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কেউই হযরত ইউনুসের (আঃ) এই দুআ’র মাধ্যমে দুআ করবে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার দুআ কবূল করবেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতেই এরপরেই রয়েছেঃ “এভাবেই আমি মু'মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।” হযরত সা'দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তাআলার ঐ নামটি যার মাধ্যমে তাঁকে ডাকলে তিনি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন এবং কিছু চাইলে প্রদান করে থাকেন তা হলো হযরত ইউনুস ইবনু মাত্তার (আঃ) দুআটি।”
হযরত সাদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কি হযরত ইউনুসের (আঃ) জন্যে বিশিষ্ট ছিল, না সমস্ত মুসলমানের জন্যেই সাধারণ?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি কুরআন কারীমে পড় নাই যে, তাতে রয়েছেঃ “আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম ও তাকে দুশ্চিন্তা হতে উদ্ধার করে ছিলাম এবং এভাবেই আম মু'মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।” সুতরাং যে কেউই এই দুআ করবে আল্লাহ তা কবূল করার ওয়াদা করেছেন।”
(এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাসীর ইবনু মা’বাদ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি। হযরত হাসান বসরীকে (রঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ হে আবু সাঈদ (রঃ)! আল্লাহ তাআলার যে ইসমে আযমের মাধ্যমে তার কাছে দুআ করলে তিনি তা ককূল করে থাকেন এবং কিছু চাইলে তা প্রদান করে থাকেন ওটা কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র!
তুমি কি কুরআন কারীমের মধ্যে উল্লিখিত আল্লাহ তাআলার এই ফরমনি পাঠ কর নাই?” অতঃপর তিনি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “হে আমার ভাতিজা! এটাই হলো আল্লাহ তাআলার ঐ ইসমে আযম যে, যখন এর মাধ্যমে তাঁর নিকট দুআ করা হয়। তখন তিনি তা কবুল করে থাকেন এবং যা চাওয়া হয় তা তিনি দিয়ে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-বাগাভির তাফসির
আল্লাহর বাণী: “আর যুন-নূনকে”—অর্থাৎ মাছের অধিকারী, তিনি হলেন মাত্তার পুত্র ইউনুস—“স্মরণ করো।”
“যখন সে ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিল”—এর অর্থ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। দাহহাক বলেছেন: সে তার সম্প্রদায়ের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিল। ইবন আব্বাস থেকে আল-আওফি ও অন্যদের বর্ণনাও এ রকম। তিনি বলেন, ইউনুস ও তাঁর সম্প্রদায় ফিলিস্তিনে বসবাস করত।
এক রাজা তাদের ওপর আক্রমণ করে সাড়ে নয়টি গোত্রকে বন্দি করে নিয়ে যায়; দেড়টি গোত্র অবশিষ্ট থাকে। তখন আল্লাহ নবী শু‘আইয়াকে ওহি করলেন: “হিযকীল রাজার কাছে যাও এবং তাকে বলো, সে যেন একজন শক্তিশালী নবী পাঠায়। আমি ওই লোকদের অন্তরে এমন প্রভাব সৃষ্টি করব যে, তারা তাঁর সঙ্গে বনী ইসরাঈলকে পাঠাবে।” রাজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মতে কাকে পাঠানো উচিত?
আমার রাজ্যে তো পাঁচজন নবী আছেন।” তিনি বললেন, “ইউনুস; তিনি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।” রাজা ইউনুসকে ডেকে তাঁকে রওনা হতে আদেশ করলেন। ইউনুস বললেন, “আল্লাহ কি আপনাকে আমাকে পাঠাতে আদেশ করেছেন?” রাজা বললেন, “না।” তিনি বললেন, “তিনি কি আমার নাম বলেছেন?”
রাজা বললেন, “না।” তিনি বললেন, “এখানে আরও শক্তিশালী নবী আছেন।” তারা তাঁকে বারবার অনুরোধ করল। এরপর তিনি নবী, রাজা ও নিজ সম্প্রদায়ের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের কাছ থেকে চলে গেলেন এবং ভূমধ্যসাগরের দিকে গিয়ে তাতে আরোহণ করলেন।
উরওয়া ইবন যুবায়র, সাঈদ ইবন জুবায়র এবং একদল আলেম বলেছেন: আল্লাহ তাঁর সম্প্রদায়ের ওপর থেকে শাস্তি তুলে নেওয়ার পর ইউনুস তাদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন। অথচ তিনি তাদের শাস্তি নেমে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি এমন এক সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকতে অপছন্দ করেছিলেন, যারা তাঁর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম দেখেছে। তিনি তাদের সামনে লজ্জিত বোধ করেছিলেন, আর শাস্তি কেন তুলে নেওয়া হয়েছে তা জানতেন না।
তাঁর ক্রোধের কারণ ছিল—তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে বলে প্রকাশ পাওয়া এবং তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা হতে পারে, এমন আশঙ্কা; আল্লাহর বিধানের প্রতি অসন্তুষ্টি নয়। কিছু বর্ণনায় আছে, তাঁর সম্প্রদায়ের রীতি ছিল, যার মিথ্যা ধরা পড়ত তাকে তারা হত্যা করত। নির্দিষ্ট সময়ে শাস্তি না আসায় তারা তাঁকে হত্যা করতে পারে—এই ভয়ে তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। এখানে ‘ক্রুদ্ধ হয়ে যাওয়া’ কথাটি ‘পারস্পরিক ক্রিয়া’ বোঝানো শব্দের এমন ব্যবহার, যা একজনের ক্ষেত্রেও আসে—যেমন ‘সফর করা’ ও ‘প্রতিদান দেওয়া’। সুতরাং “ক্রুদ্ধ হয়ে” অর্থ: ক্রুদ্ধ অবস্থায়।
হাসান বলেছেন: তিনি তাঁর রবের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এ কারণে যে, আল্লাহ তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে তাদের আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করতে এবং তাঁর দিকে আহ্বান জানাতে আদেশ করেছিলেন। তিনি প্রস্তুতি নিয়ে রওনা হওয়ার জন্য অবকাশ চেয়ে তাঁর রবের কাছে আবেদন করেন। তাঁকে বলা হলো, “বিষয়টি তার চেয়ে দ্রুত।” এমনকি তিনি জুতো পরার মতো সময়টুকুও চাইলেন, কিন্তু তাঁকে অবকাশ দেওয়া হলো না।
তাঁর স্বভাব ছিল অস্থির। ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: জিবরীল ইউনুসের কাছে এসে বললেন, “নিনওয়ার অধিবাসীদের কাছে যাও এবং তাদের সতর্ক করো।” ইউনুস বললেন, “আমি একটি বাহন খুঁজে নিই।” জিবরীল বললেন, “বিষয়টি তার চেয়েও দ্রুত।” তখন তিনি ক্রুদ্ধ হলেন এবং নৌযানের দিকে রওনা দিলেন।
ওহব ইবন মুনাব্বিহ বলেছেন: মাত্তার পুত্র ইউনুস ছিলেন সৎ বান্দা, তবে তাঁর স্বভাব ছিল অস্থির। নবুওয়াতের ভার তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে, ভারী বোঝার নিচে চার বছর বয়সী উটের বাচ্চা যেমন ভেঙে পড়ে, তিনিও তেমন ভেঙে পড়লেন। তিনি সেই ভার হাত থেকে ফেলে দিয়ে তা থেকে পালিয়ে গেলেন। এ কারণে আল্লাহ তাঁকে দৃঢ়সংকল্প রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করেননি।
আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন: “অতএব, আপনি ধৈর্য ধরুন, যেমন দৃঢ়সংকল্প রাসূলগণ ধৈর্য ধরেছিলেন।” (সূরা আল-আহকাফ ৪৬:৩৫) আর তিনি বলেছেন: “আর আপনি মাছের অধিকারীর মতো হবেন না।” (সূরা আল-কলম ৬৮:৪৮)
আল্লাহর বাণী: “অতঃপর সে ধারণা করল যে, আমি তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না”—অর্থাৎ, আমি শাস্তি দিয়ে তার ব্যাপারে ফয়সালা করব না। মুজাহিদ, কাতাদা, দাহহাক ও কালবী এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন; ইবন আব্বাস থেকেও আল-আওফির বর্ণনায় এ ব্যাখ্যা এসেছে। আরবি ভাষায় আল্লাহ কোনো বিষয় নির্ধারণ করলেন—এ অর্থে ‘কাদারা’ এবং ‘কাদ্দারা’—দুই রূপই ব্যবহৃত হয়; অর্থ একই। যেমন আল্লাহর বাণী: “আমি তোমাদের মধ্যে মৃত্যু নির্ধারণ করেছি” (সূরা আল-ওয়াকি‘আ ৫৬:৬০)—যারা ‘কাদ্দারনা’ শব্দটি হালকা উচ্চারণে পড়েছেন, তাঁদের কিরাআতে এর প্রমাণ রয়েছে।
উমর ইবন আবদুল আযীয ও যুহরী শব্দটি তাশদীদসহ পড়েছেন: “ফাযন্না আন লান নুকাদ্দিরা আলাইহি”। আতা ও অনেক আলেম বলেছেন, এর অর্থ: সে ধারণা করেছিল যে আমি তার কারাবাস ও দুর্দশা সংকীর্ণ করব না। এর দৃষ্টান্ত আল্লাহর বাণী: “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সংকীর্ণ করেন।” (সূরা আর-রা‘দ ১৩:২৬) ইবন যায়দ বলেছেন, এটি প্রশ্নবোধক অর্থে: “সে কি মনে করেছিল যে তার রব তাকে অক্ষম করতে পারবেন, ফলে তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন না?” ইয়াকুব অজ্ঞাতবাচ্যে, তাশদীদ ছাড়া ‘ইয়ুকদারু’ পড়েছেন।
হাসান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, ইউনুস যখন পাপ করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর রবের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। শয়তান তাঁকে পদস্খলিত করল, ফলে তিনি ধারণা করলেন যে আল্লাহ তাঁর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন না। তাঁর পূর্বের সৎকর্ম ও ইবাদত ছিল; তাই আল্লাহ তাঁকে শয়তানের হাতে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করলেন এবং তাঁকে মাছের পেটে নিক্ষেপ করলেন। তিনি সেখানে চল্লিশ দিন-রাত অবস্থান করেছিলেন।
আতা বলেছেন: সাত দিন। কেউ বলেছেন, মাছ তাঁকে ছয় হাজার বছরের পথ নিয়ে গিয়েছিল। আবার কেউ বলেছেন, তাকে পৃথিবীর সপ্তম স্তরের গভীরে নিয়ে গিয়েছিল। মাছের পেটে তিনি তাঁর রবের কাছে তওবা করে নিজের হিসাব পর্যালোচনা করলেন এবং বললেন: “তুমি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র; নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম”—অর্থাৎ, তোমার অবাধ্য হয়ে আমি জুলুম করেছি।
আর যা কিছু করেছি, তার পর আমি আর কাউকে উপাসনা করব না। তখন আল্লাহ তাঁর রহমতে তাঁকে মাছের পেট থেকে বের করে আনলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: “অতঃপর আমি তাকে উন্মুক্ত প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, আর সে ছিল অসুস্থ।” (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১৪৫) পূর্বে উল্লিখিত ব্যাখ্যাগুলো নবীদের মর্যাদার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ: তিনি তাঁর সম্প্রদায় অথবা রাজার ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন।
আল্লাহর বাণী: “অতঃপর সে অন্ধকারসমূহের মধ্যে ডাকল”—অর্থাৎ রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকারে: “তুমি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র; নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” আবু হুরায়রা থেকে মারফূ‘ বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ মাছকে ওহি করলেন: “তাকে গিলে নাও, কিন্তু তার শরীরের কোনো মাংস ছিঁড়বে না এবং কোনো হাড় ভাঙবে না।” মাছ তাকে গিলে নিয়ে সমুদ্রের তলদেশে তার আবাসের দিকে গেল। যখন তাকে সমুদ্রের গভীরে নিয়ে গেল, ইউনুস একটি শব্দ শুনলেন।
তিনি মনে মনে বললেন, “এটা কী?” তখন আল্লাহ তাঁকে জানালেন, “এটি সমুদ্রের প্রাণীদের তাসবিহ।” ইউনুস মাছের পেটের মধ্যে তাসবিহ পাঠ করলেন। ফেরেশতারা তাঁর তাসবিহ শুনে বললেন, “হে আমাদের রব, আমরা এক অপরিচিত ভূমি থেকে ক্ষীণ একটি আওয়াজ শুনছি”—অন্য বর্ণনায়: “অজানা স্থান থেকে পরিচিত একটি আওয়াজ।”
আল্লাহ বললেন, “সে আমার বান্দা ইউনুস। সে আমার অবাধ্য হয়েছিল, তাই আমি তাকে মাছের পেটে বন্দি করেছি।” ফেরেশতারা বললেন, “সে কি সেই সৎ বান্দা, যার সৎকর্ম প্রতিদিন ও রাতে আপনার কাছে উঠে আসত?” আল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ।” তখন তারা তাঁর জন্য সুপারিশ করলেন।
আল্লাহ মাছকে আদেশ করলেন, আর মাছ তাঁকে উপকূলে নিক্ষেপ করল; যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “অতঃপর আমি তাকে উন্মুক্ত প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, আর সে ছিল অসুস্থ।” (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১৪৫)
সুনান আত-তিরমিযী (নং ৩৫০৫)-এ সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: “কোনো মুসলিম বিপদের সময় এই কথাগুলো দিয়ে তার রবকে ডাকলে, আল্লাহ অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেবেন!”