দোয়া 52 ভ্রাতৃত্ব ও শুভ পরিণতি 29 মিনিট পড়তে

মুমিনদের জন্য ফেরেশতাদের দোয়া

ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য দোয়া করেন 40:7–9
আরবি পাঠ

رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً، وَعِلْمًا، فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا، وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ، وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ. رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي، وَعَدْتَهُمْ، وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ، وَأَزْوَاجِهِمْ، وَذُرِّيَّاتِهِمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ، وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ، وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ، فَقَدْ رَحِمْتَهُ، وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.

رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدْتَهُمْ وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। غافر 40:7–9
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Rabbanā wasi‘ta kulla shay’in raḥmatan wa ‘ilman, faghfir lilladhīna tābū wattaba‘ū sabīlaka wa qihim ‘adhāba al-jaḥīm. Rabbanā wa adkhilhum jannāti ‘adnin allatī wa‘adtahum wa man ṣalaḥa min ābā’ihim wa azwājihim wa dhurriyyātihim, innaka anta al-‘azīzu al-ḥakīm. Wa qihimu al-sayyi’āti wa man taqi al-sayyi’āti yawma’idhin faqad raḥimtahu wa dhālika huwa al-fawzu al-‘aẓīm.
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

যারা ‘আরশ বহন করে আছে, আর যারা আছে তার চারপাশে, তারা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করে আর তাঁর প্রতি ঈমান পোষণ করে আর মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ক’রে বলে- হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দিয়ে সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছ, কাজেই যারা তাওবাহ করে ও তোমার পথ অনুসরণ করে তাদেরকে ক্ষমা কর, আর জাহান্নামের ‘আযাব থেকে তাদেরকে রক্ষা কর। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাদেরকে আর তাদের পিতৃপুরুষ, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানাদির মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তাদেরকেও চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান যার ওয়া‘দা তুমি তাদেরকে দিয়েছ; তুমি মহা পরাক্রমশালী, মহা বিজ্ঞ। সমস্ত খারাবী থেকে তাদেরকে রক্ষা কর। সেদিন তুমি যাকে সমস্ত খারাবী থেকে রক্ষা করলে, তার উপর তো দয়াই করলে। ওটাই হল বিরাট সাফল্য।

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

এতে আরশবাহী ফেরেশতাদের (حَمَلَةُ الْعَرْشِ) পৃথিবীর মুমিনদের জন্য সুপারিশ ও দোয়া করার কথা এসেছে। তাঁরা ‘ক্ষমা করুন’ (اغْفِرْ), ‘রক্ষা করুন’ (قِهِمْ) এবং ‘তাদের প্রবেশ করান’ (أَدْخِلْهُمْ) — এ আবেদনগুলো করেন।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

“আর তাদেরকে মন্দ কাজগুলো থেকে রক্ষা করুন”—অর্থাৎ, মন্দ কাজ ও তার শাস্তি থেকে; কারণ তা কাজকারীকে কষ্ট দেয়। “আর কিয়ামতের দিন যাকে আপনি মন্দ কাজগুলো থেকে রক্ষা করবেন”—অর্থাৎ, তাকে মন্দ কাজ থেকে বাঁচাবেন—“তাকে তো আপনি দয়া করেছেন।” আপনার রহমত বান্দাদের ওপর অবিরত প্রবাহিত; বান্দাদের পাপ ও মন্দ কাজ ছাড়া আর কিছুই তা থেকে তাদের বঞ্চিত করে না। সুতরাং যাকে আপনি মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করেন, তাকে সৎকাজ ও তার উত্তম প্রতিদান লাভের তাওফিক দেন।

“আর সেটাই”—অর্থাৎ, মন্দ থেকে রক্ষা করে আশঙ্কাজনক বিষয় দূর করা এবং রহমত লাভের মাধ্যমে প্রার্থিত বিষয় অর্জন করা—“মহাসাফল্য”; এর তুল্য কোনো সাফল্য নেই এবং এর চেয়ে উত্তম কিছুর জন্য প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে না।

ফেরেশতাদের এই দোয়ায় তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান এবং তাঁর সুন্দরতম নামসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ওসিলা পেশ করার বিষয়টি রয়েছে—আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পছন্দ করেন যে, তারা এসব নামের মাধ্যমে তাঁর কাছে ওসিলা পেশ করুক। তারা যে বিষয়ে দোয়া করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দোয়াও এতে রয়েছে। তারা যেহেতু রহমত লাভ এবং মানবপ্রকৃতির কারণে উদ্ভূত প্রভাব দূর হওয়ার আবেদন করেছে—আল্লাহ জানেন, মানবপ্রকৃতির অপূর্ণতা রয়েছে এবং তা পাপাচার ও অনুরূপ বিষয়ের দিকে ঝোঁকে; এসবের সূচনা ও কারণও আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত—তাই তারা ‘পরম দয়ালু’ ও ‘সর্বজ্ঞ’ নামের মাধ্যমে ওসিলা পেশ করেছে।

এতে মহান আল্লাহর প্রতি তাদের পূর্ণ আদবও রয়েছে। তারা স্বীকার করেছে যে, তিনি তাদের সাধারণ ও বিশেষ প্রতিপালক; কোনো বিষয়ের কর্তৃত্ব তাদের হাতে নেই। তাদের দোয়া এমন সত্তার পক্ষ থেকে এসেছে, যিনি সব দিক থেকেই স্বভাবত অভাবী; কোনো অবস্থাতেই তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে নিজের কোনো মর্যাদা বা অধিকার দাবি করতে পারেন না। সবই আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া ও ইহসান।

এতে তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্যও প্রকাশ পেয়েছে: আল্লাহ যেসব কাজ ভালোবাসেন, সেসব ইবাদত তারা নিজেরাই সম্পাদন করে এবং ভালোবাসার সঙ্গে তা পালনে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। আর আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যেসব কর্মী—অর্থাৎ মুমিনদের—ভালোবাসেন, তাদের জন্যও তারা দোয়া করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সৃষ্টিদের মধ্যে মুমিন ছাড়া অন্যদের আল্লাহ অপছন্দ করেন। ফেরেশতারা মুমিনদের ভালোবাসেন বলেই তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।

কারও জন্য দোয়া করা তার প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণগুলোর একটি; কারণ মানুষ কেবল তাকেই দোয়ার মাধ্যমে স্মরণ করে, যাকে সে ভালোবাসে।

“আর তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে”—এর পর আল্লাহ তাদের দোয়ার যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, তাতে তাঁর কিতাব নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে। চিন্তাশীল ব্যক্তির কেবল কোনো শব্দের স্বতন্ত্র অর্থে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং শব্দটির অর্থ যথাযথভাবে বোঝার পর তার বুদ্ধি দিয়ে সেই বিষয়ের দিকে, সেখানে পৌঁছানোর উপায়গুলোর দিকে, যে বিষয়গুলো ছাড়া তা সম্পন্ন হয় না সেগুলোর দিকে এবং যেসব বিষয়ের ওপর তা নির্ভরশীল সেগুলোর দিকে তাকানো উচিত। এরপর দৃঢ়ভাবে বুঝতে হবে যে, আল্লাহ এসব অর্থও উদ্দেশ্য করেছেন—যেমন শব্দ দ্বারা নির্দেশিত নির্দিষ্ট অর্থটি যে তিনি উদ্দেশ্য করেছেন, তা দৃঢ়ভাবে বোঝা যায়।

কোনো অর্থ আল্লাহর উদ্দেশ্য বলে দৃঢ়ভাবে বোঝার কারণ দুটি: প্রথমত, তা মূল অর্থের অনুবর্তী এবং তার ওপর নির্ভরশীল—এ কথা জানা ও নিশ্চিত হওয়া। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং তাঁর কিতাব নিয়ে চিন্তা ও গভীরভাবে ভাবতে তিনি তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন—এ কথা জানা। আল্লাহ জানেন, ওই অর্থগুলো থেকে কী কী বিষয় আবশ্যক হয়। তিনিই জানিয়েছেন যে, তাঁর কিতাব পথনির্দেশ, আলো এবং সবকিছুর সুস্পষ্ট বিবরণ; আর তা সবচেয়ে স্পষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাকারী বাণী।

এভাবেই বান্দা মহৎ জ্ঞান ও বিপুল কল্যাণ লাভ করে—আল্লাহ তাকে যে পরিমাণ তাওফিক দেন, সে অনুযায়ী। আমাদের এই তাফসিরেও এ ধরনের অনেক আলোচনা রয়েছে; আল্লাহ আমাদের তা দান করেছেন।

কিছু আয়াতে এর তাৎপর্য এমন ব্যক্তির কাছে অস্পষ্ট থাকতে পারে, যে মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করে না বা যার ভাবনা সঠিক নয়। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁর রহমতের ভাণ্ডার থেকে আমাদের জন্য এমন কিছু উন্মুক্ত করেন, যা আমাদের এবং মুসলিমদের অবস্থা সংশোধনের কারণ হবে। তাঁর অনুগ্রহের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং তাঁর ইহসানের মাধ্যমে ওসিলা পেশ করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমরা প্রতি মুহূর্তে, সর্বক্ষণ তাঁর ইহসানের মধ্যে জীবনযাপন করছি।

আমরা তাঁর অনুগ্রহ চাই এবং আমাদের নিজেদের অনিষ্ট থেকে তিনি যেন আমাদের রক্ষা করেন—যা তাঁর রহমত আমাদের কাছে পৌঁছাতে বাধা ও প্রতিবন্ধক হয়। নিশ্চয়ই তিনি মহান দাতা, যিনি উপায়-উপকরণ ও তার ফলাফল—উভয়ই অনুগ্রহ করে দান করেন।

এ দোয়ায় আরও বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও সঙ্গীর মতো নিকটজন তাদের সঙ্গীর কল্যাণ লাভ করে; তার সঙ্গে সম্পর্কও এমন কল্যাণের কারণ হয়, যা তার নিজের কাজ ও কাজের কারণের বাইরে। যেমন ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য এবং তাদের পিতৃপুরুষ, স্ত্রী-স্বামী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎ, তাদের জন্য দোয়া করেছেন। তবে এটাও বলা যেতে পারে যে, তাদের সৎ হওয়া আবশ্যক; কেননা আল্লাহ বলেছেন, “আর যারা সৎকর্মশীল।” তখন তা তাদের নিজেদের কাজের ফল হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রতি তাঁর পূর্ণ অনুগ্রহের কথা জানাচ্ছেন। তাদের সৌভাগ্যের কারণ হিসেবে তিনি এমন কিছু উপায় সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যা তাদের নিজস্ব ক্ষমতার বাইরে—তা হলো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাদের দীন ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া। এর মধ্যে আরশবাহী ফেরেশতা ও তার চারপাশের ফেরেশতাদের মর্যাদা, তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য, তাদের অধিক ইবাদত এবং আল্লাহর বান্দাদের প্রতি তাদের আন্তরিকতার কথাও বলা হয়েছে; কারণ তারা জানেন, আল্লাহ তাদের কাছ থেকে এ কাজ পছন্দ করেন।

তাই আল্লাহ বলেছেন: “যারা আরশ বহন করে”—অর্থাৎ, পরম করুণাময়ের আরশ; তা সৃষ্টিজগতের ছাদ, সবচেয়ে বড়, প্রশস্ত, সুন্দর এবং মহান আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী। পৃথিবী, আকাশমণ্ডলী ও কুরসি—সবই তাঁর জ্ঞানের আওতায়। এই ফেরেশতাদের আল্লাহ তাঁর মহান আরশ বহনের দায়িত্ব দিয়েছেন। সন্দেহ নেই, তারা ফেরেশতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, মহান ও শক্তিশালী।

আরশ বহনের জন্য আল্লাহ তাদের নির্বাচন করেছেন, উল্লেখের ক্ষেত্রে তাদের আগে এনেছেন এবং তারা তাঁর নিকটবর্তী—এসবই প্রমাণ করে যে, তারা ফেরেশতাদের শ্রেষ্ঠ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেছেন: “সেদিন তোমার প্রতিপালকের আরশ তাদের ওপরে আটজন বহন করবে।” “আর তার চারপাশে যারা আছে”—মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা—“তারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে।” এটি আল্লাহর অধিক ইবাদতের জন্য তাদের প্রশংসা; বিশেষত তাসবিহ ও তাহমিদের জন্য।

অন্যান্য সব ইবাদতও আল্লাহর তাসবিহ ও তাহমিদের অন্তর্ভুক্ত; কারণ এসব ইবাদত অন্য কারও জন্য না করে তাঁকে সব অপূর্ণতা থেকে পবিত্র ঘোষণা করা হয় এবং তাঁর প্রশংসা করা হয়। বরং আল্লাহর প্রশংসাই তাঁর ইবাদত। বান্দার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” বলাও এর অন্তর্ভুক্ত এবং ইবাদতেরই একটি অংশ।

“আর তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে”—এটি ঈমানের বহু উপকারিতা ও ফজিলতের একটি: যেসব ফেরেশতার কোনো পাপ নেই, তারা ঈমানদারদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মুমিন তার ঈমানের কারণে এই মহান মর্যাদা লাভের কারণ হয়। ক্ষমা প্রার্থনার এমন কিছু আবশ্যিক দিক রয়েছে, যা ছাড়া তা পূর্ণ হয় না; অথচ অনেকের ধারণা, ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্য কেবল পাপ ক্ষমা হওয়া। তাই আল্লাহ তাদের ক্ষমা প্রার্থনার দোয়ার ধরন বর্ণনা করে এমন বিষয় উল্লেখ করেছেন, যা ছাড়া তা পূর্ণ হয় না।

তিনি বলেছেন: “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।” আপনার জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে; কোনো গোপন বিষয় আপনার কাছে লুকানো নেই। পৃথিবী বা আকাশে অণু পরিমাণ কিছুই আপনার জ্ঞানের বাইরে নয়, এর চেয়ে ছোটও নয়, বড়ও নয়।

আপনার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে; ঊর্ধ্ব ও নিম্ন জগত—সমগ্র বিশ্বজগৎ আল্লাহর রহমতে পূর্ণ, তা সবকিছুকে ঘিরে রেখেছে এবং তাঁর সৃষ্টির কাছে পৌঁছেছে। “অতএব যারা তাওবা করেছে”—শিরক ও পাপাচার থেকে—“এবং আপনার পথ অনুসরণ করেছে”—আপনার রাসুলদের অনুসরণ করে, আপনার একত্বে বিশ্বাস করে ও আপনার আনুগত্য করে—“তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।” অর্থাৎ, তাদের শাস্তি থেকেই রক্ষা করুন এবং শাস্তির কারণগুলো থেকেও রক্ষা করুন।

“হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে প্রবেশ করান সেই স্থায়ী বসবাসের জান্নাতসমূহে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদের দিয়েছেন”—আপনার রাসুলদের মাধ্যমে। “আর যারা সৎকর্মশীল”—অর্থাৎ, ঈমান ও সৎকাজের মাধ্যমে সৎ হয়েছে—“তাদের পিতৃপুরুষ, স্ত্রী-স্বামী”—তাদের স্ত্রী, স্বামী, সঙ্গী ও সহচর—“এবং সন্তান-সন্ততিকেও।” “নিশ্চয়ই আপনি মহাপরাক্রমশালী”—সবকিছুর ওপর বিজয়ী; আপনার পরাক্রমের মাধ্যমে আপনি তাদের পাপ ক্ষমা করবেন, তাদের থেকে বিপদ দূর করবেন এবং তাদের সব কল্যাণে পৌঁছে দেবেন।

“প্রজ্ঞাময়”—যিনি সবকিছুকে যথাস্থানে রাখেন। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার প্রজ্ঞার পরিপন্থী কোনো বিষয় আমরা আপনার কাছে চাই না; বরং আপনার রাসুলদের মাধ্যমে আপনি যে প্রজ্ঞার সংবাদ দিয়েছেন এবং আপনার অনুগ্রহ যা দাবি করে, তারই অন্তর্ভুক্ত হলো মুমিনদের ক্ষমা করা।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: আরশ বহনকারী চারজন ফেরেশতা এবং এর আশেপাশের সমস্ত ভাল ও সম্মানিত ফেরেশতা এক দিকে তো আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করেন, সমস্ত দোষ ও অপরাধ হতে তাঁকে দূর বলেন এবং অপরদিকে তাকে সমস্ত গুণ ও প্রশংসার যোগ্য মেনে নিয়ে তার প্রশংসা কীর্তন করেন। মোটকথা, যা আল্লাহর মধ্যে নেই তা হতে তারা তাকে পবিত্র ও মুক্ত বলেন এবং যা তাঁর মধ্যে রয়েছে তা তারা সাব্যস্ত করেন। তারা তার উপর ঈমান ও বিশ্বাস রাখেন এবং নিজেদের নীচতা ও অপারগতা প্রকাশ করেন। যমীনবাসী সমস্ত মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীর জন্যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।

পৃথিবীবাসীদের আল্লাহর উপর ঈমান তাঁকে না দেখেই ছিল বলে তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে দেন। সুতরাং তারা তাদেরকে না দেখেই সদা-সর্বদা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন কোন মুসলিম তার কোন (মুসলিম) ভাই-এর অনুপস্থিতির সময় তার জন্যে দু'আ করে তখন ফেরেশতা তার দু'আয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকেও ওটাই প্রদান করুন যা তুমি তোমার ঐ মুমিন ভাই-এর জন্যে চাচ্ছ।” মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমাইয়া ইবনে সালাতের কোন কোন কবিতার সত্যতা স্বীকার করেন।

যেমন নিম্নের কবিতাঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বহনকারী ফেরেশতা চারজন। দুই জন একদিকে এবং অপর দুই জন অন্যদিকে থাকেন।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” তারপর ঐ কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সূর্য প্রত্যেক রাত্রির শেষে রক্তিম বর্ণে উদিত হয়, তারপর গোলাপী বর্ণ ধারণ করে।

এটা কখনো স্বীয় আকৃতিতে প্রকাশিত হয় না, বরং রুক্ষ ও পানসেই থাকে।” এবারও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” (এর সনদ খুব পাকা ও মযবৃত। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই সময় আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজন হবে)কিয়ামতের দিন কিন্তু আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন।

যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আর্শকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯-১৭) হ্যাঁ, তবে এই আয়াতের ভাবার্থেও এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণে একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, সুনানে আবি দাউদের একটি হাদীসে রয়েছেঃ হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বাতহা নামক স্থানে একটি সমাবেশে ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ও অবস্থান করছিলেন। এমন সময় (আকাশে) এক খণ্ড মেঘ চলতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এর নাম কি?”

সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমরা এটাকে (আরবী) বলে থাকি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কি এটাকে (আরবী)-ও বল না?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “হ্যা এটাকে আমরা (আরবী)-ও বলে থাকি।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা এটাকে (আরবী)-ও কি বল না?”

তারা উত্তর দিলেনঃ “ হ্যা, (আরবী)-ও বলি বটে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তিনি বললেনঃ “এ দু'টোর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের পৃথ।

এর উপরের আসমানও এই প্রথম আসমান হতে এরূপই দূরত্বে রয়েছে। সপ্তম আকাশ পর্যন্ত একটি হতে অপরটির মাঝে অনুরূপ দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র রয়েছে যার গভীরতা এই পরিমাণই। ওর উপর আট জন ফেরেশতা পাহাড়ী ছাগলের আকারে রয়েছেন যেগুলোর খুর হতে হাঁটু পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো এক আকাশ হতে অন্য আকাশের দূরত্বের সমান।

তাঁদের পিঠের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আরুশ রয়েছে। যার উচ্চতাও এই পরিমাণ। এর উপরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রয়েছেন। (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন) এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই সময় আল্লাহ্ তা'আলার আরশ আটজন ফেরেশতার উপর রয়েছে।

তাদের মধ্যে চারজনের তাসবীহ্ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য যে, আপনি (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) জানা সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন।” অপর চারজন ফেরেশতার তাসবীহ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ!

আপনি ক্ষমতার পরেও (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) ক্ষমা করছেন এ জন্যে আমি আপনার মহিমা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি।” এ জন্যেই মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনায় তারা এ কথাও বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। বানী আদমের সমস্ত গুনাহ ও তাদের অপরাধের উপর আপনার রহমত ছেয়ে আছে।

অনুরূপভাবে আপনার জ্ঞানও তাদের সমস্ত কথা এবং কাজকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাদের সমস্ত অঙ্গ-ভঙ্গী সম্পর্কে আপনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তাদের এই ব্যক্তিরা যখন তাওবা করতঃ আপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পাপকার্য হতে বিরত থাকে, আপনার আহকাম পালন করে, ভাল কাজ করে ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে তখন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং আপনি তাদেরকে দাখিল করুন স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন।

আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের ঈমানের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকেরও তাদের সাথে মিলিত করবো এবং তাদের আমলের কিছুই কম করবো না।” (৫২:২১) অর্থাৎ তাদের সবকেই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান করবো, যাতে উভয় পক্ষেরই চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আর আমি এটা করবো না যে, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মর্যাদা কমিয়ে দিবো, বরং যাদের মর্যাদা কম তাদের মর্যাদা আমি বাড়িয়ে দিবো এবং এটা তাদের উপর আমার দয়া ও অনুগ্রহেরই ফল।

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, মুমিন জান্নাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেঃ “আমার পিতা, আমার ভাই এবং আমার সন্তান-সন্ততি কোথায়?” উত্তর দেয়া হবেঃ “তাদের পুণ্য এতো ছিল না যে, তারা এরূপ মর্যাদায় পৌছতে পারে।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার জন্যে এবং তাদের সবারই জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেও তার মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন।

অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত মুতরাফ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারাও মুমিনদের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। অতঃপর তিনিও এই আয়াতটিই পাঠ করেন। আর শয়তান তাদের অমঙ্গল কামনা করে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

অর্থাৎ তিনি এমন বিজয়ী যার উপর কেউ বিজয় লাভ করতে পারে না এবং যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি স্বীয় কথায়, কাজে এবং শরীয়তে ও তকদীরে প্রজ্ঞাময়। সুতরাং ফেরেশতারা প্রার্থনায় আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ!

আপনি মুমিনদেরকে আপনার শাস্তি হতে রক্ষা করুন। সেই দিন আপনি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তার প্রতি তো আপনি অনুগ্রহই করবেন। আর এটাই তো মহা সাফল্য।

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: আরশ বহনকারী চারজন ফেরেশতা এবং এর আশেপাশের সমস্ত ভাল ও সম্মানিত ফেরেশতা এক দিকে তো আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করেন, সমস্ত দোষ ও অপরাধ হতে তাঁকে দূর বলেন এবং অপরদিকে তাকে সমস্ত গুণ ও প্রশংসার যোগ্য মেনে নিয়ে তার প্রশংসা কীর্তন করেন। মোটকথা, যা আল্লাহর মধ্যে নেই তা হতে তারা তাকে পবিত্র ও মুক্ত বলেন এবং যা তাঁর মধ্যে রয়েছে তা তারা সাব্যস্ত করেন। তারা তার উপর ঈমান ও বিশ্বাস রাখেন এবং নিজেদের নীচতা ও অপারগতা প্রকাশ করেন। যমীনবাসী সমস্ত মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীর জন্যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।

পৃথিবীবাসীদের আল্লাহর উপর ঈমান তাঁকে না দেখেই ছিল বলে তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে দেন। সুতরাং তারা তাদেরকে না দেখেই সদা-সর্বদা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন কোন মুসলিম তার কোন (মুসলিম) ভাই-এর অনুপস্থিতির সময় তার জন্যে দু'আ করে তখন ফেরেশতা তার দু'আয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকেও ওটাই প্রদান করুন যা তুমি তোমার ঐ মুমিন ভাই-এর জন্যে চাচ্ছ।” মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমাইয়া ইবনে সালাতের কোন কোন কবিতার সত্যতা স্বীকার করেন।

যেমন নিম্নের কবিতাঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বহনকারী ফেরেশতা চারজন। দুই জন একদিকে এবং অপর দুই জন অন্যদিকে থাকেন।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” তারপর ঐ কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সূর্য প্রত্যেক রাত্রির শেষে রক্তিম বর্ণে উদিত হয়, তারপর গোলাপী বর্ণ ধারণ করে।

এটা কখনো স্বীয় আকৃতিতে প্রকাশিত হয় না, বরং রুক্ষ ও পানসেই থাকে।” এবারও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” (এর সনদ খুব পাকা ও মযবৃত। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই সময় আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজন হবে)কিয়ামতের দিন কিন্তু আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন।

যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আর্শকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯-১৭) হ্যাঁ, তবে এই আয়াতের ভাবার্থেও এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণে একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, সুনানে আবি দাউদের একটি হাদীসে রয়েছেঃ হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বাতহা নামক স্থানে একটি সমাবেশে ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ও অবস্থান করছিলেন। এমন সময় (আকাশে) এক খণ্ড মেঘ চলতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এর নাম কি?”

সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমরা এটাকে (আরবী) বলে থাকি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কি এটাকে (আরবী)-ও বল না?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “হ্যা এটাকে আমরা (আরবী)-ও বলে থাকি।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা এটাকে (আরবী)-ও কি বল না?”

তারা উত্তর দিলেনঃ “ হ্যা, (আরবী)-ও বলি বটে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তিনি বললেনঃ “এ দু'টোর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের পৃথ।

এর উপরের আসমানও এই প্রথম আসমান হতে এরূপই দূরত্বে রয়েছে। সপ্তম আকাশ পর্যন্ত একটি হতে অপরটির মাঝে অনুরূপ দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র রয়েছে যার গভীরতা এই পরিমাণই। ওর উপর আট জন ফেরেশতা পাহাড়ী ছাগলের আকারে রয়েছেন যেগুলোর খুর হতে হাঁটু পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো এক আকাশ হতে অন্য আকাশের দূরত্বের সমান।

তাঁদের পিঠের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আরুশ রয়েছে। যার উচ্চতাও এই পরিমাণ। এর উপরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রয়েছেন। (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন) এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই সময় আল্লাহ্ তা'আলার আরশ আটজন ফেরেশতার উপর রয়েছে।

তাদের মধ্যে চারজনের তাসবীহ্ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য যে, আপনি (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) জানা সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন।” অপর চারজন ফেরেশতার তাসবীহ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ!

আপনি ক্ষমতার পরেও (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) ক্ষমা করছেন এ জন্যে আমি আপনার মহিমা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি।” এ জন্যেই মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনায় তারা এ কথাও বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। বানী আদমের সমস্ত গুনাহ ও তাদের অপরাধের উপর আপনার রহমত ছেয়ে আছে।

অনুরূপভাবে আপনার জ্ঞানও তাদের সমস্ত কথা এবং কাজকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাদের সমস্ত অঙ্গ-ভঙ্গী সম্পর্কে আপনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তাদের এই ব্যক্তিরা যখন তাওবা করতঃ আপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পাপকার্য হতে বিরত থাকে, আপনার আহকাম পালন করে, ভাল কাজ করে ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে তখন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং আপনি তাদেরকে দাখিল করুন স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন।

আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের ঈমানের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকেরও তাদের সাথে মিলিত করবো এবং তাদের আমলের কিছুই কম করবো না।” (৫২:২১) অর্থাৎ তাদের সবকেই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান করবো, যাতে উভয় পক্ষেরই চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আর আমি এটা করবো না যে, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মর্যাদা কমিয়ে দিবো, বরং যাদের মর্যাদা কম তাদের মর্যাদা আমি বাড়িয়ে দিবো এবং এটা তাদের উপর আমার দয়া ও অনুগ্রহেরই ফল।

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, মুমিন জান্নাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেঃ “আমার পিতা, আমার ভাই এবং আমার সন্তান-সন্ততি কোথায়?” উত্তর দেয়া হবেঃ “তাদের পুণ্য এতো ছিল না যে, তারা এরূপ মর্যাদায় পৌছতে পারে।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার জন্যে এবং তাদের সবারই জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেও তার মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন।

অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত মুতরাফ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারাও মুমিনদের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। অতঃপর তিনিও এই আয়াতটিই পাঠ করেন। আর শয়তান তাদের অমঙ্গল কামনা করে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

অর্থাৎ তিনি এমন বিজয়ী যার উপর কেউ বিজয় লাভ করতে পারে না এবং যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি স্বীয় কথায়, কাজে এবং শরীয়তে ও তকদীরে প্রজ্ঞাময়। সুতরাং ফেরেশতারা প্রার্থনায় আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ!

আপনি মুমিনদেরকে আপনার শাস্তি হতে রক্ষা করুন। সেই দিন আপনি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তার প্রতি তো আপনি অনুগ্রহই করবেন। আর এটাই তো মহা সাফল্য।

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: আরশ বহনকারী চারজন ফেরেশতা এবং এর আশেপাশের সমস্ত ভাল ও সম্মানিত ফেরেশতা এক দিকে তো আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করেন, সমস্ত দোষ ও অপরাধ হতে তাঁকে দূর বলেন এবং অপরদিকে তাকে সমস্ত গুণ ও প্রশংসার যোগ্য মেনে নিয়ে তার প্রশংসা কীর্তন করেন। মোটকথা, যা আল্লাহর মধ্যে নেই তা হতে তারা তাকে পবিত্র ও মুক্ত বলেন এবং যা তাঁর মধ্যে রয়েছে তা তারা সাব্যস্ত করেন। তারা তার উপর ঈমান ও বিশ্বাস রাখেন এবং নিজেদের নীচতা ও অপারগতা প্রকাশ করেন। যমীনবাসী সমস্ত মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীর জন্যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।

পৃথিবীবাসীদের আল্লাহর উপর ঈমান তাঁকে না দেখেই ছিল বলে তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে দেন। সুতরাং তারা তাদেরকে না দেখেই সদা-সর্বদা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন কোন মুসলিম তার কোন (মুসলিম) ভাই-এর অনুপস্থিতির সময় তার জন্যে দু'আ করে তখন ফেরেশতা তার দু'আয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকেও ওটাই প্রদান করুন যা তুমি তোমার ঐ মুমিন ভাই-এর জন্যে চাচ্ছ।” মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমাইয়া ইবনে সালাতের কোন কোন কবিতার সত্যতা স্বীকার করেন।

যেমন নিম্নের কবিতাঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বহনকারী ফেরেশতা চারজন। দুই জন একদিকে এবং অপর দুই জন অন্যদিকে থাকেন।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” তারপর ঐ কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সূর্য প্রত্যেক রাত্রির শেষে রক্তিম বর্ণে উদিত হয়, তারপর গোলাপী বর্ণ ধারণ করে।

এটা কখনো স্বীয় আকৃতিতে প্রকাশিত হয় না, বরং রুক্ষ ও পানসেই থাকে।” এবারও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” (এর সনদ খুব পাকা ও মযবৃত। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই সময় আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজন হবে)কিয়ামতের দিন কিন্তু আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন।

যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আর্শকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯-১৭) হ্যাঁ, তবে এই আয়াতের ভাবার্থেও এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণে একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, সুনানে আবি দাউদের একটি হাদীসে রয়েছেঃ হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বাতহা নামক স্থানে একটি সমাবেশে ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ও অবস্থান করছিলেন। এমন সময় (আকাশে) এক খণ্ড মেঘ চলতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এর নাম কি?”

সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমরা এটাকে (আরবী) বলে থাকি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কি এটাকে (আরবী)-ও বল না?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “হ্যা এটাকে আমরা (আরবী)-ও বলে থাকি।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা এটাকে (আরবী)-ও কি বল না?”

তারা উত্তর দিলেনঃ “ হ্যা, (আরবী)-ও বলি বটে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তিনি বললেনঃ “এ দু'টোর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের পৃথ।

এর উপরের আসমানও এই প্রথম আসমান হতে এরূপই দূরত্বে রয়েছে। সপ্তম আকাশ পর্যন্ত একটি হতে অপরটির মাঝে অনুরূপ দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র রয়েছে যার গভীরতা এই পরিমাণই। ওর উপর আট জন ফেরেশতা পাহাড়ী ছাগলের আকারে রয়েছেন যেগুলোর খুর হতে হাঁটু পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো এক আকাশ হতে অন্য আকাশের দূরত্বের সমান।

তাঁদের পিঠের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আরুশ রয়েছে। যার উচ্চতাও এই পরিমাণ। এর উপরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রয়েছেন। (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন) এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই সময় আল্লাহ্ তা'আলার আরশ আটজন ফেরেশতার উপর রয়েছে।

তাদের মধ্যে চারজনের তাসবীহ্ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য যে, আপনি (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) জানা সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন।” অপর চারজন ফেরেশতার তাসবীহ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ!

আপনি ক্ষমতার পরেও (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) ক্ষমা করছেন এ জন্যে আমি আপনার মহিমা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি।” এ জন্যেই মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনায় তারা এ কথাও বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। বানী আদমের সমস্ত গুনাহ ও তাদের অপরাধের উপর আপনার রহমত ছেয়ে আছে।

অনুরূপভাবে আপনার জ্ঞানও তাদের সমস্ত কথা এবং কাজকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাদের সমস্ত অঙ্গ-ভঙ্গী সম্পর্কে আপনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তাদের এই ব্যক্তিরা যখন তাওবা করতঃ আপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পাপকার্য হতে বিরত থাকে, আপনার আহকাম পালন করে, ভাল কাজ করে ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে তখন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং আপনি তাদেরকে দাখিল করুন স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন।

আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের ঈমানের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকেরও তাদের সাথে মিলিত করবো এবং তাদের আমলের কিছুই কম করবো না।” (৫২:২১) অর্থাৎ তাদের সবকেই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান করবো, যাতে উভয় পক্ষেরই চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আর আমি এটা করবো না যে, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মর্যাদা কমিয়ে দিবো, বরং যাদের মর্যাদা কম তাদের মর্যাদা আমি বাড়িয়ে দিবো এবং এটা তাদের উপর আমার দয়া ও অনুগ্রহেরই ফল।

হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, মুমিন জান্নাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেঃ “আমার পিতা, আমার ভাই এবং আমার সন্তান-সন্ততি কোথায়?” উত্তর দেয়া হবেঃ “তাদের পুণ্য এতো ছিল না যে, তারা এরূপ মর্যাদায় পৌছতে পারে।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার জন্যে এবং তাদের সবারই জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেও তার মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন।

অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত মুতরাফ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারাও মুমিনদের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। অতঃপর তিনিও এই আয়াতটিই পাঠ করেন। আর শয়তান তাদের অমঙ্গল কামনা করে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

অর্থাৎ তিনি এমন বিজয়ী যার উপর কেউ বিজয় লাভ করতে পারে না এবং যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি স্বীয় কথায়, কাজে এবং শরীয়তে ও তকদীরে প্রজ্ঞাময়। সুতরাং ফেরেশতারা প্রার্থনায় আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ!

আপনি মুমিনদেরকে আপনার শাস্তি হতে রক্ষা করুন। সেই দিন আপনি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তার প্রতি তো আপনি অনুগ্রহই করবেন। আর এটাই তো মহা সাফল্য।

আল-বাগাভির তাফসির

“হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে প্রবেশ করান সেই স্থায়ী বসবাসের জান্নাতসমূহে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদের দিয়েছেন; আর তাদের পিতৃপুরুষ, স্ত্রী-স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, তাদেরকেও। নিশ্চয়ই আপনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” সাঈদ ইবনু জুবাইর বলেছেন: মুমিন জান্নাতে প্রবেশ করে বলবে, “আমার বাবা কোথায়?

আমার মা কোথায়? আমার সন্তান কোথায়? আমার স্ত্রী কোথায়?” তখন বলা হবে, “তারা তোমার মতো আমল করেনি।” সে বলবে, “আমি নিজের জন্য ও তাদের জন্য আমল করতাম।” তখন বলা হবে, “তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাও।”

আল্লাহর বাণী: “যারা আরশ বহন করে এবং তার চারপাশে আছে”—তারা আরশবাহী ও তার চারপাশে প্রদক্ষিণকারী ফেরেশতা; তারা কারুবিয়্যুন (الكَرُوبِيُّون), ফেরেশতাদের নেতৃস্থানীয়গণ। ইবনু আব্বাস বলেছেন: আরশবাহীদের একজনের হাঁটু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত দূরত্ব পাঁচশো বছরের পথ। বর্ণিত আছে, তাদের পা পৃথিবীগুলোর গভীরে; আর পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল তাদের কোমর পর্যন্ত। তারা বলে: “মহিমা ও পরাক্রমের অধিকারী পবিত্র!

রাজত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী পবিত্র! চিরঞ্জীব, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না, তিনি পবিত্র! ফেরেশতাদের ও রূহের প্রতিপালক, পরম পবিত্র, পবিত্র।”

মাইসারা ইবনু উরুবা বলেছেন: তাদের পা সর্বনিম্ন পৃথিবীতে এবং মাথা আরশ ভেদ করে আছে। তারা বিনয়াবনত, চোখ তুলে তাকায় না। সপ্তম আকাশের অধিবাসীদের চেয়ে তাদের ভয় বেশি; সপ্তম আকাশের অধিবাসীদের ভয় তার নিচের আকাশের অধিবাসীদের চেয়ে বেশি, আর তার নিচের আকাশের অধিবাসীদের ভয় তারও নিচের আকাশের অধিবাসীদের চেয়ে বেশি। মুজাহিদ বলেছেন: ফেরেশতাদের ও আরশের মধ্যে নূরের সত্তরটি পর্দা রয়েছে।

মুহাম্মদ ইবনু মুনকাদির, জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আল্লাহর আরশবাহী ফেরেশতাদের মধ্য থেকে এক ফেরেশতার কথা বর্ণনা করার অনুমতি আমাকে দেওয়া হয়েছে। তার কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত দূরত্ব সাতশো বছরের পথ।”

জাফর ইবনু মুহাম্মদ তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আরশের এক পায়ার সঙ্গে দ্বিতীয় পায়ার দূরত্ব দ্রুতগতির পাখির উড়ানের ত্রিশ হাজার বছরের পথ। প্রতিদিন আরশকে নূরের সত্তর হাজার রঙে আবৃত করা হয়; আল্লাহর সৃষ্টির কেউই তার দিকে তাকাতে সক্ষম নয়। আরশের তুলনায় সবকিছুই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে একটি আংটির মতো।

মুজাহিদ বলেছেন: সপ্তম আকাশ ও আরশের মধ্যে নূরের সত্তর হাজার পর্দা রয়েছে; একটি অন্ধকারের পর্দা, একটি নূরের পর্দা, একটি অন্ধকারের পর্দা।

ওহব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন: আরশের চারপাশে ফেরেশতাদের সত্তর হাজার সারি রয়েছে; এক সারির পেছনে আরেক সারি। তারা আরশকে প্রদক্ষিণ করে—একদল এগিয়ে আসে, আরেকদল ফিরে যায়। তাদের কেউ কারও মুখোমুখি হলে, এরা তাহলিল বলে আর ওরা তাকবির বলে। তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ফেরেশতাদের আরও সত্তর হাজার সারি রয়েছে; তাদের হাত ঘাড় পর্যন্ত তুলে কাঁধের ওপর রাখা।

তারা প্রথম দলটির তাকবির ও তাহলিল শুনলে উচ্চস্বরে বলে: “আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি; আপনি কত মহান ও মহিমান্বিত! আপনিই আল্লাহ, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ; সব সৃষ্টি আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে।” তাদের পেছনে ফেরেশতাদের এক লক্ষ সারি রয়েছে; তারা ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখেছে।

তাদের প্রত্যেকে এমনভাবে প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করে, যা অন্য কেউ পাঠ করে না। তাদের প্রত্যেকের দুই ডানার মধ্যবর্তী দূরত্ব তিনশো বছরের পথ; কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত দূরত্ব চারশো বছরের পথ।

আরশের চারপাশের ফেরেশতাদের থেকে আল্লাহ সত্তরটি আগুনের পর্দা, সত্তরটি অন্ধকারের পর্দা, সত্তরটি নূরের পর্দা, সত্তরটি সাদা মুক্তার পর্দা, সত্তরটি লাল ইয়াকুতের পর্দা, সত্তরটি হলুদ ইয়াকুতের পর্দা, সত্তরটি সবুজ যবরজাদের পর্দা, সত্তরটি বরফের পর্দা, সত্তরটি পানির পর্দা এবং সত্তরটি শিলাবৃষ্টির পর্দা দ্বারা আড়াল করেছেন—এ ছাড়া আরও যা আছে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তিনি বলেন: আরশবাহী ও তার চারপাশের প্রত্যেক ফেরেশতার চারটি মুখ: একটি ষাঁড়ের মুখ, একটি সিংহের মুখ, একটি ঈগলের মুখ এবং একটি মানুষের মুখ।

তাদের প্রত্যেকের চারটি ডানা; দুটি ডানা দিয়ে তারা মুখ ঢেকে রাখে, যাতে আরশের দিকে তাকিয়ে অচেতন হয়ে না পড়ে; আর দুটি ডানা দিয়ে তারা ওড়ে। তাসবিহ, তাহমিদ, তাকবির ও তামজিদ ছাড়া তাদের অন্য কোনো কথা নেই।

আল্লাহর বাণী: “তারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে”—অর্থাৎ, তারা এ সত্যে বিশ্বাস করে যে, তিনি একক; তাঁর কোনো শরিক নেই।

আমাদের কাছে আবদুল ওয়াহিদ আল-মালিহি বর্ণনা করেছেন, তাঁকে আবু মানসুর আস-সামআনি জানিয়েছেন, তাঁকে আবু জাফর আর-রাইয়ানি বর্ণনা করেছেন, তাঁকে হুমাইদ ইবনু জানজাওয়াইহ বর্ণনা করেছেন, তাঁকে উমর ইবনু আবদুল্লাহ আর-রাকাশি বর্ণনা করেছেন, তাঁকে জাফর ইবনু সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, তাঁকে হারুন ইবনু রাবাব বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেছেন, শাহর ইবনু হাওশাব বলেছেন: আরশবাহী ফেরেশতা আটজন। তাঁদের চারজন বলেন: “হে আল্লাহ! আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি। আপনার ধৈর্যশীলতার কারণে—আপনার জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও—আপনারই প্রশংসা।”

আর বাকি চারজন বলেন: “হে আল্লাহ! আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি। আপনার ক্ষমার কারণে—আপনার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও—আপনারই প্রশংসা।” তিনি বলেন, তাঁদের যেন আদমসন্তানদের পাপ দেখানো হচ্ছে।

আল্লাহর বাণী: “আর তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে”—“হে আমাদের প্রতিপালক” অর্থাৎ, তারা বলে: “হে আমাদের প্রতিপালক!” “আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে”—কেউ বলেছেন, এখানে “রহমত ও জ্ঞান” শব্দ দুটি ব্যাখ্যামূলক অর্থে منصوب; আবার কেউ বলেছেন, শব্দান্তরের কারণে এমন হয়েছে। অর্থাৎ, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। “অতএব যারা তাওবা করেছে এবং আপনার পথ অনুসরণ করেছে”—অর্থাৎ, আপনার দীন অনুসরণ করেছে—“তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”

মুতাররিফ বলেছেন: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে মুমিনদের প্রতি সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হলো ফেরেশতারা; আর সৃষ্টির মধ্যে মুমিনদের প্রতি সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষী হলো শয়তানরা।

“আর তাদেরকে মন্দ কাজগুলো থেকে রক্ষা করুন”—অর্থাৎ, শাস্তিগুলো থেকে। “আর যাকে আপনি মন্দ কাজগুলো থেকে রক্ষা করবেন”—অর্থাৎ, যাকে আপনি মন্দ কাজের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। কেউ বলেছেন, এর অর্থ মন্দ কাজের প্রতিদান থেকে রক্ষা করা। “সেদিন তাকে তো আপনি দয়া করেছেন; আর সেটাই মহাসাফল্য।”

সমর্থনকারী হাদিস

সহিহ মুসলিমে (হাদিস নং ২৭৩২) বর্ণিত হয়েছে: “কোনো মুসলিম তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করলে তা কবুল হয়। তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে, সে বলে: ‘আমিন! তোমার জন্যও অনুরূপ হোক!’”

ট্যাগ
  • #ফেরেশতা
  • #ক্ষমা
  • #জাহান্নাম থেকে সুরক্ষা
  • #জান্নাত
  • #মুমিন
  • #রহমত

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →