দোয়া 19 ভ্রাতৃত্ব ও শুভ পরিণতি 6 মিনিট পড়তে

ধৈর্য ও ইসলামের ওপর মৃত্যু

ফিরআউনের জাদুকররা 7:126
আরবি পাঠ

رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا، وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ.

رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। الأعراف 7:126
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Rabbanaa afrigh ‘alaynaa sabran wa tawaffanaa muslimiin
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

তুমি আমাদের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছ শুধু এ কারণে যে, আমাদের কাছে যখন আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শন এসেছে তখন আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য ও দৃঢ়তা অবলম্বনের গুণে অভিষিক্ত কর আর মুসলমান হিসেবে আমাদের মৃত্যু দান কর।

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

রূপ: «আফরিগ» (أَفْرِغْ) এবং «তাওয়াফ্ফানা» (تَوَفَّنَا)—এই ক্রিয়াপদগুলো। মূসা (عليه السلام)-এর লাঠির অলৌকিক নিদর্শন দেখে ঈমান আনার পর ফিরআউনের সাবেক জাদুকরেরা এই দোয়া করেছিলেন। তখন তাদের সামনে ছিল যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ও মৃত্যুদণ্ডের হুমকি।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

«আর তুমি আমাদের প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছ»—অর্থাৎ, তুমি আমাদের অস্বীকার করার কারণে এবং আমাদের শাস্তির হুমকি দেওয়ার কারণে আমাদের কী দোষ ধরছ? আমাদের কোনো অপরাধ নেই; আমরা শুধু আমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি। যদি এ কাজ এমন অপরাধ হয়, যার জন্য কাউকে দোষারোপ করা যায় এবং শাস্তি দেওয়া যায়, তবে সেটিই আমাদের অপরাধ। এরপর তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, যেন তিনি তাদের অবিচল রাখেন এবং ধৈর্য দান করেন।

তারা বলল: «হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর ঢেলে দাও»—অর্থাৎ, আমাদের প্রচুর «ধৈর্য» দান করো। অনির্দিষ্টভাবে «ধৈর্য» বলার মাধ্যমে এর মহত্ত্ব বোঝানো হয়েছে। কারণ এটি ছিল এক কঠিন পরীক্ষা, যা প্রাণহানির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় অন্তরকে অবিচল রাখতে, মুমিনকে তার ঈমানের ওপর প্রশান্ত রাখতে এবং তার প্রচণ্ড অস্থিরতা দূর করতে অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন।

«আর মুসলিম অবস্থায় আমাদের মৃত্যু দাও»—অর্থাৎ, তোমার আদেশের কাছে আত্মসমর্পণকারী এবং তোমার রাসূলের অনুসারী অবস্থায়। বাহ্যত, ফিরআউন তাদের যে শাস্তির হুমকি দিয়েছিল, তা তাদের ওপর কার্যকর করেছিল; আর আল্লাহ তাআলা তাদের ঈমানের ওপর অবিচল রেখেছিলেন। অন্যদিকে, ফিরআউন, তার সভাসদবর্গ এবং তাদের অনুসরণকারী সাধারণ লোকেরা আল্লাহর নিদর্শনগুলোর সামনে অহংকার করেছিল এবং জুলুম ও ঔদ্ধত্যবশত সেগুলো অস্বীকার করেছিল—যখন তা তাদের কাছে এসেছিল।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

যাদুকরগণ যখন মুমিন হয়ে গেল এবং ফিরাউনের উদ্দেশ্য বিফল হলো তখন সে যাদুকরদেরকে হুমকি দিয়ে বললোঃ “আজ যে মূসা (আঃ) তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয়েছে এটা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের পারস্পরিক সমঝোতা ও চক্রান্তের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তোমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, এইভাবে হুকুমতের উপর বিজয় লাভ করে দেশের মূল অধিবাসীকে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া। নিঃসন্দেহে এই মূসা ছিল তোমাদের সকলেরই গুরু। সেই তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছিল।”

যার সামান্য বিবেকও রয়েছে সেও এটা বুঝে ফেলবে যে, হক্ক দ্বারা বাতিল প্রমাণিত হয়ে যায় দেখে ফিরাউন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়েই এই অপবাদমূলক কথা বলছিল। হযরত মূসা (আঃ) তো মাদায়েন থেকে এসেই সরাসরি ফিরাউনের নিকট পৌছে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং বাহ্যিক মু'জিযাগুলো প্রকাশ করতঃ নিজের রাসূল হওয়ার সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন। এর পরে ফিরাউন স্বীয় সাম্রাজ্যের সমস্ত শহরে মনোনীত এলাকায় লোক প্রেরণ করে মিসরের বিভিন্ন যাদুকরদেরকে একত্রিত করেছিল, যাদেরকে সে এবং তার সম্প্রদায়ের লোকেরা নির্বাচন করেছিল, আর তাদের সাথে ভাল ভাল পুরস্কার ও মর্যাদা দানের অঙ্গীকার করেছিল। এ জন্যেই ঐ যাদুকরগণ।

সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল যে, কি করে মূসা (আঃ)-এর উপর বিজয় লাভ করতঃ ফেরাউনের নৈকট্য লাভ করা যায়। মূসা (আঃ) কোন এক যাদুকরের সাথেও পরিচিত ছিলেন না। না তিনি তাদের কাউকেও কখনও দেখেছিলেন। না তাদের কারো সাথে তাঁর কখনও সাক্ষাৎ ঘটেছিল।

ফিরাউন নিজেও এটা জানতো। কিন্তু না জানি সর্বসাধারণ হযরত মূসা (আঃ)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, এটাকে রোধ করার জন্যেই সে এ কথা বলেছিল। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ফিরাউনের কওম তার অনুগত ছিল এবং তার চিন্তাধারার সাথে একমত হয়েছিল। ঐ লোকগুলো সাংঘাতিক বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত হয়েছিল যারা ফিরাউনের (আরবী) (৭৯:২৪) (আমিই তোমাদের বড় প্রভু) এই দাবী সমর্থন করেছিল।

সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের প্রধানের সাথে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি তাকে বলেনঃ “আমি যদি বিজয়ী হই এবং তোমরা পরাজিত হও তবে তোমরা আমার উপর ঈমান আনবে কি? আর এটা স্বীকার করবে কি যে, আমার পেশকৃত জিনিস হবে আল্লাহর মু'জিযা?” সেই যাদুকর প্রধান উত্তরে বললোঃ “আগামীকাল তো আমি এমন যাদু পেশ করবো যে, কোন যাদুই ওর উপর জয়যুক্ত হতে পারে না। সুতরাং তুমি যদি জয়যুক্ত হও তবে আমি স্বীকার করে নেবো যে, তুমি আল্লাহর রাসূল।”

ফিরাউন তাদের এই কথোপকথন শুনেছিল। এ জন্যেই সে পরে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমরা এ জন্যেই একত্রিত হয়েছিলে যে, হুকুমতের উপর জয়লাভ করে তোমরা দেশের নেতৃস্থানীয় ও প্রধান প্রধান লোকদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই সিংহাসন দখল করবে। আমি তোমাদেরকে কি শাস্তি দেবো তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদের ডান হাত ও বাম পা কেটে নেবো অথবা এর বিপরীত।

অতঃপর তোমাদের সকলকেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেবো। তোমাদের মৃতদেহগুলো গাছের ডালের সাথে বেঁধে লটকিয়ে দেয়া হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ফাঁসি এবং হাত পা কেটে নেয়ার শাস্তি-বিধান সর্ব প্রথম ফিরাউনই চালু করেছিল। যাদুকরগণ উত্তরে বলে“আমরা তো এখন আল্লাহরই হয়ে গেছি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করছি।

আজ তুমি আমাদেরকে যে শাস্তি প্রদানের হুমকি দিচ্ছ, আল্লাহর শাস্তি এর চেয়ে বহুগুণে কঠিন। আজ আমরা তোমার শাস্তির উপর ধৈর্য ধারণ করছি, যেন কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহর শাস্তি হতে পরিত্রাণ পেতে পারি।” এ জন্যেই তারা বলে উঠলোঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা যেন দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি এবং ফিরাউনের শাস্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে পারি সে জন্যে আমাদেরকে ধৈর্য দান করুন।

আর আপনার নবী হযরত মূসা (আঃ)-এর অনুসরণ করিয়ে আমাদেরকে মুসলমান অবস্থায় দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিন।” অতএব, তারা ফিরাউনকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলো- “তুমি যত পার আমাদের সর্বনাশ সাধন কর। এই অবস্থাতেই আমাদের পার্থিব জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমরা তাঁরই উপর ঈমান আনছি যিনি আমাদের সত্য প্রভু।

আমরা আশা করি যে, তিনি আমাদের পূর্ববর্তী সমস্ত পাপ মার্জনা করবেন এবং আমাদেরকে যাদু পেশ করতে বাধ্য হতে হয়েছে সেটাও তিনি ক্ষমা করে দিবেন। কেননা, যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় আল্লাহর নিকট হাযির হবে তার জন্যে জাহান্নাম অবধারিত। সে না জীবিতের মধ্যে গণ্য, না মৃতের মধ্যে গণ্য। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুমিন ও সঙ্কৰ্মশীল রূপে হাযির হবে সে পরকালে বড় বড় মর্যাদার অধিকারী হবে।

যা হাক, এইসব যাদুকর ছিল সকাল বেলায় কাফির যাদুকর, আর সন্ধ্যা বেলায় হয়ে গেল সকর্মশীল মুমিন ও শহীদ।

আল-বাগাভির তাফসির

«আর তুমি আমাদের প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছ»—অর্থাৎ, তুমি আমাদের ঘৃণা করছ। দাহহাক ও অন্যরা বলেছেন: অর্থ হলো, তুমি আমাদের দোষারোপ করছ। আতা বলেছেন: তোমার কাছে আমাদের এমন কোনো অপরাধ নেই, যার কারণে তুমি আমাদের শাস্তি দেবে; «তবে এ ছাড়া যে, আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনগুলো যখন আমাদের কাছে এসেছিল, তখন আমরা তাতে ঈমান এনেছি»। এরপর তারা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলল: «হে আমাদের প্রতিপালক!

আমাদের ওপর ঢেলে দাও»—অর্থাৎ, ঢেলে দাও; «ধৈর্য, আর মুসলিম অবস্থায় আমাদের মৃত্যু দাও»। কালবি উল্লেখ করেছেন, ফিরআউন তাদের হাত-পা কেটে শূলে চড়িয়েছিল। অন্যরা বলেছেন, সে তাদের ওপর তা করতে সক্ষম হয়নি। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন: «অতঃপর তারা তোমাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না। আমার নিদর্শনসহ তোমরা দুজন এবং তোমাদের অনুসারীরাই বিজয়ী হবে» (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৩৫)।

সমর্থনকারী হাদিস

ইমাম আহমদের «মুসনাদে» (নং ২৪১০) নিষ্ঠুর শাসকদের মুখোমুখি হয়ে মুমিনদের অবিচল থাকার মহত্ত্ব সম্পর্কে বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে।

ট্যাগ
  • #ধৈর্য
  • #দৃঢ়তা
  • #ঈমান
  • #মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু
  • #ফিরআউন
  • #মুসা

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →