মূসার ক্ষমা ও রহমতের দোয়া
أَنْتَ وَلِيُّنَا، فَاغْفِرْ لَنَا، وَارْحَمْنَا، وَأَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ، وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَٰذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً، وَفِي الْآخِرَةِ، إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ.
أَنْتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَٰذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
মূসা তার জাতির সত্তর জন লোককে বাছাই করল আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য। যখন ভূমিকম্প তাদের উপর আঘাত হানল তখন সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছে করলে তো এদেরকে আর আমাকেও আগেই ধ্বংস করে দিতে পারতে! আমাদের মধ্যেকার নির্বোধেরা যা করেছে তার জন্য কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে? ওটা তো কেবল তোমার পরীক্ষা, যাকে চাও তদ্দ্বারা পথভ্রষ্ট কর, আর যাকে চাও সত্য পথে পরিচালিত কর, তুমি আমাদের প্রতি দয়া কর, তুমিই তো সবচেয়ে বেশী ক্ষমাশীল।’ ‘আমাদের জন্য এ দুনিয়ার কল্যাণ লিখে দাও আর পরকালেও। আমরা তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করছি।’ আল্লাহ বললেন, ‘শাস্তি তো আমি যাকে ইচ্ছে দেই, আর আমার রহমত সব বিষয়ে পরিব্যাপ্ত আর তা আমি তাদের জন্য লিখে দিব যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করবে, যাকাত দিবে আর যারা আমার নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাসী হবে।’
রূপ: আল্লাহর অভিভাবকত্ব স্বীকার (أَنْتَ وَلِيُّنَا) এবং ‘ইগফির’ (اغْفِرْ), ‘ইরহামনা’ (ارْحَمْنَا), ‘উকতুব’ (اكْتُبْ)—এই ক্রিয়াপদগুলো। সোনার বাছুরের পরীক্ষার পর মূসা (আ.) তাঁর জাতির জন্য এই দোয়া করেছিলেন।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
বনী ইসরাঈল যখন তওবা করল এবং নিজেদের সঠিক বোধে ফিরে এল, তখন মূসা (আ.) তাদের মধ্য থেকে সত্তরজন শ্রেষ্ঠ লোককে বেছে নিলেন, যাতে তারা তাদের জাতির পক্ষ থেকে তাদের প্রতিপালকের কাছে ওজর পেশ করে। আল্লাহ তাদের জন্য একটি নির্ধারিত সময় স্থির করলেন, যাতে তারা সেখানে উপস্থিত হয়। তারা সেখানে পৌঁছালে বলল, ‘হে মূসা, আমাদের আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখাও।’
এভাবে তারা আল্লাহর প্রতি ভীষণ ঔদ্ধত্য দেখাল এবং তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করল। ফলে ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল; তারা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল এবং মারা গেল।
মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি ও বিনীত প্রার্থনা করতে থাকলেন। তিনি বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি চাইলে তো তারা উপস্থিত হওয়ার আগেই তাদের ধ্বংস করতে পারতে, যখন তারা তাদের জাতির পক্ষ থেকে ওজর পেশ করার অবস্থায় থাকত। তুমি কি আমাদের মধ্যকার নির্বোধদের কৃতকর্মের জন্য আমাদের ধ্বংস করবে?’
অর্থাৎ, যাদের বুদ্ধি দুর্বল, যাদের বিবেচনাবোধ অপরিণত—তাদের কাজের জন্য কি আমাদের ধ্বংস করবে? এভাবে তিনি আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করলেন এবং ওজর পেশ করলেন যে, আল্লাহর প্রতি ঔদ্ধত্যকারীদের পূর্ণ বিবেক ছিল না, যা তাদের বলা ও করা থেকে বিরত রাখত। উপরন্তু, তারা এমন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল, যাতে মানুষ বিচ্যুতির আশঙ্কা করে এবং নিজের দ্বীন হারানোর ভয় পায়। তাই তিনি বললেন, ‘এটি তো কেবল তোমার পরীক্ষা; এর দ্বারা তুমি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর।
তুমি আমাদের অভিভাবক; অতএব আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের প্রতি দয়া করো। আর ক্ষমাকারীদের মধ্যে তুমিই সর্বোত্তম।’ অর্থাৎ, ক্ষমা করার ক্ষেত্রে তুমিই সর্বোত্তম, দয়া করার অধিক হকদার এবং দান ও অনুগ্রহ করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক মহান।
মনে হয়, মূসা (আ.) এ কথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন: ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাদের সবার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো তোমার আনুগত্যে অবিচল থাকা এবং তোমার প্রতি ঈমান আনা। যার বিবেক ও সঠিক বোধ অটুট ছিল এবং তোমার দেওয়া তাওফীকের ওপর অবিচল ছিল, সে সোজা পথেই ছিল। আর যার বুদ্ধি দুর্বল ছিল, যার বিবেচনা অপরিণত ছিল এবং যে পরীক্ষা দ্বারা বিচ্যুত হয়েছিল, সেই এই কাজ করেছে—এই দুটি কারণেই।
তা সত্ত্বেও তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু এবং ক্ষমাকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম। অতএব আমাদের ক্ষমা করো ও আমাদের প্রতি দয়া করো।’ আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা কবুল করলেন, তাদের মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করলেন এবং তাদের পাপ ক্ষমা করে দিলেন।
মূসা (আ.) তাঁর দোয়ার শেষে বললেন, ‘আমাদের জন্য এ দুনিয়ায় কল্যাণ লিখে দাও’—যেমন উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সৎকর্ম। ‘আর আখিরাতেও কল্যাণ’—অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর সৎ ও প্রিয় বান্দাদের জন্য যে প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ‘নিশ্চয়ই আমরা তোমার দিকে ফিরে এসেছি’—অর্থাৎ, নিজেদের ত্রুটি স্বীকার করে আমরা তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছি এবং আমাদের সব বিষয়ে তোমারই অভিমুখী হয়েছি।
আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘আমার শাস্তি—আমি আমার সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকি’, অর্থাৎ যে দুর্ভাগা এবং শাস্তির কারণগুলোর কাছে নিজেকে এগিয়ে দেয়। ‘আর আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে’—ঊর্ধ্ব ও নিম্ন জগতের সবকিছুকে; সৎ ও অসৎ, মুমিন ও কাফির—সবাইকে। এমন কোনো সৃষ্টি নেই যার কাছে আল্লাহর রহমত পৌঁছেনি এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া তাকে আচ্ছন্ন করেনি। তবে যে বিশেষ রহমত দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য এনে দেয়, তা সবার জন্য নয়।
এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর আমি তা তাদের জন্য নির্ধারণ করব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে’—ছোট-বড় সব পাপ থেকে বেঁচে থাকে; ‘যাকাত দেয়’—ফরজ যাকাত তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেয়; ‘এবং যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান আনে।’ আল্লাহর আয়াতসমূহে ঈমান পূর্ণতা পায় সেগুলোর অর্থ জানা এবং সেগুলোর দাবি অনুযায়ী আমল করার মাধ্যমে। এর অন্তর্ভুক্ত হলো দ্বীনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় নবী (সা.)-এর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে অনুসরণ করা।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
১৫৫-১৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সত্তরজন লোক নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং মূসা (আঃ) এরূপ সত্তরজন লোক নির্বাচন করে তাদেরকে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করার জন্যে রওয়ানা হন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করলো তখন নিম্নরূপ কথা বললোঃ“হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান করুন যা আপনি ইতিপূর্বে কাউকে দান করেননি এবং না আমাদের পরে কাউকেও দান করবেন।
তাদের এই প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলার কাছে পছন্দনীয় হলো না। সুতরাং ভূমিকম্প তাদেরকে ঘিরে ফেললো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন ত্রিশজনসহ আসতে বলেছিলেন যারা গো-বৎস পূজার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং দুআর জন্যে একটা সময় ও স্থান নির্ধারণ করেছিল। মূসা (আঃ) সত্তরজন লোক নির্বাচন করলেন, যাদেরকে নিয়ে তিনি ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে বের হলেন।
কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে নিয়ে অঙ্গীকার স্থলে পৌছলেন তখন তারা তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা যে পর্যন্ত না আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবো সেই পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। এখন আমাদেরকে দেখিয়ে দিন। এই আস্পর্ধামূলক কথার শাস্তি হিসেবে তাদের উপর বিদ্যুত পতিত হলো এবং সবাই ওখানে মরে পড়ে থাকলো।
হযরত মূসা (আঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় উঠে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি এখন বানী ইসরাঈলের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে কি জবাব দেবো? এরা তো তাদের মধ্যে ভাল লোক ছিল, আপনি তাদেরকেও ধ্বংস করে দিলেন। হে আল্লাহ!
যদি আপনি তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করে দিতেন।”( হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্য থেকে সত্তরজন খুবই ভাল লোককে বেছে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “চল, আল্লাহর কাছে যাই। তোমরা কওমের অবশিষ্ট লোকদের পক্ষ থেকে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ এবং শরীর ও কাপড় পবিত্র করে নাও।”
অতঃপর তিনি নির্ধারিত দিনে তাদেরকে নিয়ে দূরে সাইনার দিকে চললেন। এর সবকিছুই আল্লাহর অবগতি ও অনুমতিক্রমে হয়েছিল। এখন এই সত্তরজন লোক যারা মূসা (আঃ)-এর পরিচালনাধীনে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছিল তারা বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর সাথে আপনার বাক্যালাপ হয়ে থাকে, আমাদেরকে তা শুনতে দিন।”
হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি একটা অত্যন্ত ঘন মেঘখণ্ডের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পাহাড়টিও মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং তার লোকগুলোকে বললেনঃ “তোমরাও আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও।”
মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এমন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠতো যে, কেউই তার চেহারার প্রতি দৃষ্টি রাখতে পারতো । এজন্যে তিনি স্বীয় চেহারার উপর পর্দা ফেলে দিতেন। ঐলোকগুলো যখন মেঘখণ্ডের নিকটে এসে ওর মধ্যে প্রবেশ করলো তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল । তারা মূসা (আঃ) ও আল্লাহর কথা শুনতে লাগলো।
তিনি মূসা (আঃ)-কে আদেশ ও নিষেধ করে বলেছিলেনঃ “এটা কর এবং ওটা করো না।” যখন তিনি ওটা থেকে মুক্ত হলেন এবং মেঘ সরে গেল তখন তিনি ঐ লোকদের দিকে মনঃসংযোগ করলেন। তারা তাঁকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! যে পর্যন্ত না আপনি আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে দেখাবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনবো না।
তাদের এই ঔদ্ধত্যের কারণে বিজলী তাদেরকে পাকড়াও করলো। তাদের প্রাণপাখী দেহ থেকে বেরিয়ে গেল। তারা মৃত অবস্থায় পড়ে রইলো। এ দেখে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপের সুরে বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যখন এদেরকে ধ্বংস করারই ইচ্ছে করেছিলেন তখন তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করলেন না কেন?
এরা বোকামীর কাজ করেছে। আমার পিছনে আপনি কি বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করে দিবেন?" হযরত আলী ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মূসা (আঃ), হারূন (আঃ), শাবর ও শাবীর প্রমুখ মিলে এক পাহাড়ের উপত্যকার দিকে গেলেন। হারূন (আঃ) একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মৃত্যু দান করেন।
মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিকট প্রত্যাবর্তন করলে তারা তাকে হারূন (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মূসা (আঃ) উত্তরে বলেন যে, তিনি মারা গেছেন। তারা তখন বলে- “না, বরং সম্ভবতঃ আপনিই তাকে মেরে ফেলেছেন। তিনি অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন।”
মূসা (আঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা, তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক বেছে নাও।” তারা সত্তরজন লোক নির্বাচন করলো। অতঃপর তারা হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনাকে কে হত্যা করেছে?" হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহ থেকে শব্দ আসলোঃ “আমাকে কেউই হত্যা করেনি।
আমি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছি।” লোকগুলো তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এরপরে আর কখননা আমরা আপনার অবাধ্য হবো না।” তারা শাস্তি এই পেলো যে, বিদ্যুৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো। হযরত মূসা (আঃ) বিনা কারণে ডানে বামে ঘুরতেন এবং বলতেনঃ “হে আল্লাহ!
আপনি কি এই বোকা লোকদের কথায় আমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন? এটা তো আপনার পরীক্ষা ছিল। আপনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সকলকেই জীবিত করে দিলেন এবং সকলকেই নবী করলেন। এটা হচ্ছে অত্যন্ত গারীব ও অবিশ্বাসযোগ্য হাদীস।
এই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে আম্মারা ইবনে উবাইদ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত ব্যক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “ঐ লোকগুলোর উপর শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের সামনে গো-বৎসের পূজা চলছিল, অথচ তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। তাদের কওমকে তারা ঐ শিরকের কাজ থেকে নিষেধ পর্যন্ত করেনি।”
এই জন্যেই হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নির্বোধ নামে অভিহিত করেছেন। তাদের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা আপনার একটা পরীক্ষা।" নিম্নরূপে তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটাতো আপনার পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা।
একমাত্র আপনারই হুকুম চলে থাকে। আপনি যা চান তাই হয়। হিদায়াত দান ও পথভ্রষ্টকরণ আপনারই হাতে। আপনি যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ কুপথ দেখাতে পারে না। আপনি যাকে দান থেকে বিমুখ করেন তাকে কেউ দান করতে পারে না। পক্ষান্তরে আপনি যাকে দান করেন তা তার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না।
রাজ্যের মালিক আপনিই। হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আপনারই রয়েছে। খাক ও আমর আপনার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।” এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের অলী বা অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন ও আমাদের উপর দয়া করুন।
কেননা, আপনিই তো হচ্ছেন সর্বোত্তম ক্ষমাশীল।”( আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঢেকে ফেলা, গোপন করা এবং পাপের কারণে পাকড়াও না করা। আর (আরবী) এর সঙ্গে যখন (আরবী) যুক্ত হয় তখন ভাবার্থ হয়। ক্ষমা করে দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলার তাকে আগামীতে পুনরায় পাপে জড়িত না করা।“
হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে এই দুনিয়াতেও কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ নির্ধারিত করুন।” (আরবী) -এর তাফসীর সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। “আমরা তাওবা করেছি এবং আপনার নিকটই প্রত্যাবর্তন করেছি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈল (আরবী) বলেছিল বলেই তাদের নাম ইয়াহুদী হয়ে গেছে।
(এটা ইবনে জারীর তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর জাবীর আলজাফী নামক বর্ণনাকারী দুর্বল)মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! এটা আপনার পরীক্ষা। তাই ইরশাদ হচ্ছে- শাস্তি সেই পায় যাকে শাস্তি দেয়ার আমি ইচ্ছা করি এবং মনে করি যে, তার শাস্তি হওয়াই উচিত।
নচেৎ, আমার করুণা তো প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। আমি যা চাই তাই করি। প্রতিটি কাজে নিপণতা ও ন্যায় পরায়ণতার অধিকার আমারই । রহমতযুক্ত আয়াত খুবই বিরাট ও ব্যাপক এবং সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মুখে উচ্চারিত হয়“হে আমাদের প্রভু!
আপনার করুণা ও জ্ঞান সব কিছুকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।” জুনদুব ইবনে আবদিল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন বেদুইন আসলো। সে তার উটটি বসিয়ে বাধলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়লো। নামায শেষে উষ্ট্ৰীটিকে খুলে সে ওর উপর সওয়ার হলো এবং দুআ করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ!
আপনি আমার উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দয়া করুন। এই দয়ায় আপনি অন্য কাউকেও শরীক করবেন না। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বললেনঃ “আচ্ছা বলতো, এই লোকটি বেশী পথভ্রষ্ট ও নির্বোধ, না তার উটটি ? সে যা বলছে তা তোমরা শুনেছো কি?”
সাহাবীগণ বললেনঃ “হ্যা শুনেছি।' তিনি বললেনঃ “আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। তিনি স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এক ভাগ তিনি সমস্ত মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। দানব, মানব এবং চতুষ্পদ জন্তু সবাই এই অংশ থেকেই অংশ পেয়েছে।
বাকী নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের জন্যে নির্দিষ্ট রেখেছেন। এখন বল তো, এই উভয়ের মধ্যে কে বেশী নির্বোধ?” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এই একশ’ ভাগের মধ্যে মাত্র এক ভাগ তিনি দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছেন।
এই এক ভাগ দেয়ার কারণেই সৃষ্টজীব একে অপরের উপর করুণা ও মমতা দেখিয়ে থাকে। এ কারণেই সমস্ত প্রাণী নিজেদের সন্তান ও বাচ্চাদের উপর স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করে থাকে। বাকী নিরানব্বই ভাগ করুণা তার কাছেই রয়েছে। এগুলোর প্রকাশ কিয়ামতের দিন ঘটবে।
কিয়ামতের দিন এই একভাগ করুণার সাথে সঞ্চিত নিরানব্বই ভাগ করুণা মিলিয়ে দেয়া হবে।” আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর একশ’ ভাগ রহমত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক ভাগ মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন । এর দ্বারাই মানুষ, বন্য পশু এবং পাখী একে অপরের উপর দয়া দেখিয়ে থাকে।
(এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আল্লাহর শপথ! ধর্মের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি পাপী এবং জীবিকা উপার্জনের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি নির্বোধ সেও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তিও জান্নাতে প্রবেশ করবে যাকে পাপের কারণে আগুন পরিবেষ্টন করেছে।
তাঁর রহমত কিয়ামতের দিন এমনভাবে ছেয়ে যাবে যে, ইবলীসও তার থেকে কিছু অংশ পাওয়ার আশা পোষণ করবে।” (এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব । সা’দ নামক এর একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত ব্যক্তি)আল্লাহ পাক বলেনঃ ঐ ব্যক্তিই আমার রহমতের হকদার হবে, যে আমাকে ভয় করে ও পরহেজগারী অবলম্বন করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমার প্রভু নিজের জন্যে রহমতকে ফরয করে নিয়েছেন।”‘
তারা তাকওয়া অবলম্বন করে অর্থাৎ শিক ও কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তারা যাকাত প্রদান করে। বলা হয়েছে যে, এখানে যাকাত দ্বারা নসের যাকাত বুঝানো অথবা মালের যাকাত বুঝানো হয়েছে কিংবা দু'টোকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা, এটা হচ্ছে মক্কী আয়াত।
তারা আমার আয়াত সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করে অর্থাৎ ওগুলোর সত্যতা স্বীকার করে।
১৫৫-১৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সত্তরজন লোক নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং মূসা (আঃ) এরূপ সত্তরজন লোক নির্বাচন করে তাদেরকে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করার জন্যে রওয়ানা হন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করলো তখন নিম্নরূপ কথা বললোঃ“হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান করুন যা আপনি ইতিপূর্বে কাউকে দান করেননি এবং না আমাদের পরে কাউকেও দান করবেন।
তাদের এই প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলার কাছে পছন্দনীয় হলো না। সুতরাং ভূমিকম্প তাদেরকে ঘিরে ফেললো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন ত্রিশজনসহ আসতে বলেছিলেন যারা গো-বৎস পূজার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং দুআর জন্যে একটা সময় ও স্থান নির্ধারণ করেছিল। মূসা (আঃ) সত্তরজন লোক নির্বাচন করলেন, যাদেরকে নিয়ে তিনি ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে বের হলেন।
কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে নিয়ে অঙ্গীকার স্থলে পৌছলেন তখন তারা তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা যে পর্যন্ত না আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবো সেই পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। এখন আমাদেরকে দেখিয়ে দিন। এই আস্পর্ধামূলক কথার শাস্তি হিসেবে তাদের উপর বিদ্যুত পতিত হলো এবং সবাই ওখানে মরে পড়ে থাকলো।
হযরত মূসা (আঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় উঠে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি এখন বানী ইসরাঈলের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে কি জবাব দেবো? এরা তো তাদের মধ্যে ভাল লোক ছিল, আপনি তাদেরকেও ধ্বংস করে দিলেন। হে আল্লাহ!
যদি আপনি তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করে দিতেন।”( হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্য থেকে সত্তরজন খুবই ভাল লোককে বেছে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “চল, আল্লাহর কাছে যাই। তোমরা কওমের অবশিষ্ট লোকদের পক্ষ থেকে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ এবং শরীর ও কাপড় পবিত্র করে নাও।”
অতঃপর তিনি নির্ধারিত দিনে তাদেরকে নিয়ে দূরে সাইনার দিকে চললেন। এর সবকিছুই আল্লাহর অবগতি ও অনুমতিক্রমে হয়েছিল। এখন এই সত্তরজন লোক যারা মূসা (আঃ)-এর পরিচালনাধীনে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছিল তারা বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর সাথে আপনার বাক্যালাপ হয়ে থাকে, আমাদেরকে তা শুনতে দিন।”
হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি একটা অত্যন্ত ঘন মেঘখণ্ডের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পাহাড়টিও মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং তার লোকগুলোকে বললেনঃ “তোমরাও আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও।”
মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এমন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠতো যে, কেউই তার চেহারার প্রতি দৃষ্টি রাখতে পারতো । এজন্যে তিনি স্বীয় চেহারার উপর পর্দা ফেলে দিতেন। ঐলোকগুলো যখন মেঘখণ্ডের নিকটে এসে ওর মধ্যে প্রবেশ করলো তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল । তারা মূসা (আঃ) ও আল্লাহর কথা শুনতে লাগলো।
তিনি মূসা (আঃ)-কে আদেশ ও নিষেধ করে বলেছিলেনঃ “এটা কর এবং ওটা করো না।” যখন তিনি ওটা থেকে মুক্ত হলেন এবং মেঘ সরে গেল তখন তিনি ঐ লোকদের দিকে মনঃসংযোগ করলেন। তারা তাঁকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! যে পর্যন্ত না আপনি আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে দেখাবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনবো না।
তাদের এই ঔদ্ধত্যের কারণে বিজলী তাদেরকে পাকড়াও করলো। তাদের প্রাণপাখী দেহ থেকে বেরিয়ে গেল। তারা মৃত অবস্থায় পড়ে রইলো। এ দেখে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপের সুরে বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যখন এদেরকে ধ্বংস করারই ইচ্ছে করেছিলেন তখন তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করলেন না কেন?
এরা বোকামীর কাজ করেছে। আমার পিছনে আপনি কি বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করে দিবেন?" হযরত আলী ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মূসা (আঃ), হারূন (আঃ), শাবর ও শাবীর প্রমুখ মিলে এক পাহাড়ের উপত্যকার দিকে গেলেন। হারূন (আঃ) একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মৃত্যু দান করেন।
মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিকট প্রত্যাবর্তন করলে তারা তাকে হারূন (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মূসা (আঃ) উত্তরে বলেন যে, তিনি মারা গেছেন। তারা তখন বলে- “না, বরং সম্ভবতঃ আপনিই তাকে মেরে ফেলেছেন। তিনি অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন।”
মূসা (আঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা, তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক বেছে নাও।” তারা সত্তরজন লোক নির্বাচন করলো। অতঃপর তারা হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনাকে কে হত্যা করেছে?" হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহ থেকে শব্দ আসলোঃ “আমাকে কেউই হত্যা করেনি।
আমি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছি।” লোকগুলো তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এরপরে আর কখননা আমরা আপনার অবাধ্য হবো না।” তারা শাস্তি এই পেলো যে, বিদ্যুৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো। হযরত মূসা (আঃ) বিনা কারণে ডানে বামে ঘুরতেন এবং বলতেনঃ “হে আল্লাহ!
আপনি কি এই বোকা লোকদের কথায় আমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন? এটা তো আপনার পরীক্ষা ছিল। আপনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সকলকেই জীবিত করে দিলেন এবং সকলকেই নবী করলেন। এটা হচ্ছে অত্যন্ত গারীব ও অবিশ্বাসযোগ্য হাদীস।
এই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে আম্মারা ইবনে উবাইদ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত ব্যক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “ঐ লোকগুলোর উপর শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের সামনে গো-বৎসের পূজা চলছিল, অথচ তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। তাদের কওমকে তারা ঐ শিরকের কাজ থেকে নিষেধ পর্যন্ত করেনি।”
এই জন্যেই হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নির্বোধ নামে অভিহিত করেছেন। তাদের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা আপনার একটা পরীক্ষা।" নিম্নরূপে তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটাতো আপনার পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা।
একমাত্র আপনারই হুকুম চলে থাকে। আপনি যা চান তাই হয়। হিদায়াত দান ও পথভ্রষ্টকরণ আপনারই হাতে। আপনি যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ কুপথ দেখাতে পারে না। আপনি যাকে দান থেকে বিমুখ করেন তাকে কেউ দান করতে পারে না। পক্ষান্তরে আপনি যাকে দান করেন তা তার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না।
রাজ্যের মালিক আপনিই। হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আপনারই রয়েছে। খাক ও আমর আপনার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।” এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের অলী বা অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন ও আমাদের উপর দয়া করুন।
কেননা, আপনিই তো হচ্ছেন সর্বোত্তম ক্ষমাশীল।”( আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঢেকে ফেলা, গোপন করা এবং পাপের কারণে পাকড়াও না করা। আর (আরবী) এর সঙ্গে যখন (আরবী) যুক্ত হয় তখন ভাবার্থ হয়। ক্ষমা করে দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলার তাকে আগামীতে পুনরায় পাপে জড়িত না করা।“
হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে এই দুনিয়াতেও কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ নির্ধারিত করুন।” (আরবী) -এর তাফসীর সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। “আমরা তাওবা করেছি এবং আপনার নিকটই প্রত্যাবর্তন করেছি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈল (আরবী) বলেছিল বলেই তাদের নাম ইয়াহুদী হয়ে গেছে।
(এটা ইবনে জারীর তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর জাবীর আলজাফী নামক বর্ণনাকারী দুর্বল)মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! এটা আপনার পরীক্ষা। তাই ইরশাদ হচ্ছে- শাস্তি সেই পায় যাকে শাস্তি দেয়ার আমি ইচ্ছা করি এবং মনে করি যে, তার শাস্তি হওয়াই উচিত।
নচেৎ, আমার করুণা তো প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। আমি যা চাই তাই করি। প্রতিটি কাজে নিপণতা ও ন্যায় পরায়ণতার অধিকার আমারই । রহমতযুক্ত আয়াত খুবই বিরাট ও ব্যাপক এবং সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মুখে উচ্চারিত হয়“হে আমাদের প্রভু!
আপনার করুণা ও জ্ঞান সব কিছুকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।” জুনদুব ইবনে আবদিল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন বেদুইন আসলো। সে তার উটটি বসিয়ে বাধলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়লো। নামায শেষে উষ্ট্ৰীটিকে খুলে সে ওর উপর সওয়ার হলো এবং দুআ করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ!
আপনি আমার উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দয়া করুন। এই দয়ায় আপনি অন্য কাউকেও শরীক করবেন না। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বললেনঃ “আচ্ছা বলতো, এই লোকটি বেশী পথভ্রষ্ট ও নির্বোধ, না তার উটটি ? সে যা বলছে তা তোমরা শুনেছো কি?”
সাহাবীগণ বললেনঃ “হ্যা শুনেছি।' তিনি বললেনঃ “আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। তিনি স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এক ভাগ তিনি সমস্ত মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। দানব, মানব এবং চতুষ্পদ জন্তু সবাই এই অংশ থেকেই অংশ পেয়েছে।
বাকী নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের জন্যে নির্দিষ্ট রেখেছেন। এখন বল তো, এই উভয়ের মধ্যে কে বেশী নির্বোধ?” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এই একশ’ ভাগের মধ্যে মাত্র এক ভাগ তিনি দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছেন।
এই এক ভাগ দেয়ার কারণেই সৃষ্টজীব একে অপরের উপর করুণা ও মমতা দেখিয়ে থাকে। এ কারণেই সমস্ত প্রাণী নিজেদের সন্তান ও বাচ্চাদের উপর স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করে থাকে। বাকী নিরানব্বই ভাগ করুণা তার কাছেই রয়েছে। এগুলোর প্রকাশ কিয়ামতের দিন ঘটবে।
কিয়ামতের দিন এই একভাগ করুণার সাথে সঞ্চিত নিরানব্বই ভাগ করুণা মিলিয়ে দেয়া হবে।” আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর একশ’ ভাগ রহমত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক ভাগ মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন । এর দ্বারাই মানুষ, বন্য পশু এবং পাখী একে অপরের উপর দয়া দেখিয়ে থাকে।
(এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আল্লাহর শপথ! ধর্মের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি পাপী এবং জীবিকা উপার্জনের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি নির্বোধ সেও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তিও জান্নাতে প্রবেশ করবে যাকে পাপের কারণে আগুন পরিবেষ্টন করেছে।
তাঁর রহমত কিয়ামতের দিন এমনভাবে ছেয়ে যাবে যে, ইবলীসও তার থেকে কিছু অংশ পাওয়ার আশা পোষণ করবে।” (এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব । সা’দ নামক এর একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত ব্যক্তি)আল্লাহ পাক বলেনঃ ঐ ব্যক্তিই আমার রহমতের হকদার হবে, যে আমাকে ভয় করে ও পরহেজগারী অবলম্বন করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমার প্রভু নিজের জন্যে রহমতকে ফরয করে নিয়েছেন।”‘
তারা তাকওয়া অবলম্বন করে অর্থাৎ শিক ও কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তারা যাকাত প্রদান করে। বলা হয়েছে যে, এখানে যাকাত দ্বারা নসের যাকাত বুঝানো অথবা মালের যাকাত বুঝানো হয়েছে কিংবা দু'টোকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা, এটা হচ্ছে মক্কী আয়াত। তারা আমার আয়াত সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করে অর্থাৎ ওগুলোর সত্যতা স্বীকার করে।
আল-বাগাভির তাফসির
আল্লাহর বাণী, ‘আর মূসা তাঁর জাতিকে বেছে নিলেন’—অর্থাৎ, তাঁর জাতির মধ্য থেকে। এখানে সম্বন্ধবাচক অব্যয়ের পরিবর্তে পদের ব্যবহার হয়েছে। ‘আমাদের নির্ধারিত সময়ের জন্য সত্তরজন লোক’—এ আয়াতে প্রমাণ রয়েছে যে, তাদের সবাই বাছুরের উপাসনা করেনি। সুদ্দী বলেন, আল্লাহ তাআলা মূসাকে নির্দেশ দিলেন, বনী ইসরাঈলের কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে তাঁর কাছে যেতে, যাতে তারা বাছুরের উপাসনার জন্য তাঁর কাছে ওজর পেশ করে। মূসা তাঁর জাতি থেকে সত্তরজন লোক বেছে নিলেন।
‘অতঃপর যখন তারা’ সেই স্থানে পৌঁছাল, তখন বলল, ‘আমরা তোমার প্রতি কখনো ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখি।’ অতঃপর বজ্রাঘাত তাদের পাকড়াও করল এবং তারা মারা গেল। ইবনু ইসহাক বলেন, তারা যা করেছিল, তা থেকে তওবা করার জন্য এবং তাদের পেছনে রেখে আসা জাতির লোকদের তওবা কবুলের আবেদন জানাতে মূসা তাদের বেছে নিয়েছিলেন। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, তাদের সবাই বাছুরের উপাসনা করেছিল।
কাতাদা, ইবনু জুরাইজ ও মুহাম্মদ ইবনু কাব বলেন, ‘ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল’—কারণ, তাদের জাতির লোকেরা যখন বাছুরের উপাসনা করেছিল, তখন তারা তাদের কাছ থেকে আলাদা হয়নি, সৎকাজের আদেশ দেয়নি এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধও করেনি।
ইবনু আব্বাস বলেন, যারা বলেছিল, ‘আমরা তোমার প্রতি কখনো ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখি’—তাদের ওপর বজ্রাঘাত হয়েছিল (আল-বাকারা, ২:৫৫)। তারা সেই সত্তরজনের আগে ছিল, যাদের পরে ভূমিকম্প পাকড়াও করেছিল। আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.)-কে তাঁর জাতি থেকে সত্তরজন লোক বেছে নিতে আদেশ করেছিলেন। তিনি তাদের বেছে নিয়ে তাদের সঙ্গে বের হলেন, যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে দোয়া করে।
তাদের দোয়ার মধ্যে ছিল: ‘হে আল্লাহ, আমাদের এমন কিছু দাও যা আমাদের আগে কাউকে দাওনি এবং আমাদের পরে কাউকেও দিও না।’ আল্লাহ তাদের এই দোয়া অপছন্দ করলেন, ফলে ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল।
ওয়াহব বলেন, ভূমিকম্পটি কোনো শব্দ ছিল না। বরং লোকেরা সেই মহিমা দেখে কাঁপতে ও অস্থির হতে লাগল; তারা এমনভাবে কেঁপে উঠল যে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জোড়াগুলো যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। মূসা যখন তাদের এ অবস্থা দেখলেন, তখন তাদের প্রতি দয়া হলো এবং তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা করলেন। তাদের হারিয়ে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হলেন।
তারা কল্যাণের কাজে তাঁর সহকারী ছিল, তাঁর কথা শুনত ও তাঁর আনুগত্য করত। তখন তিনি দোয়া করলেন, কাঁদলেন এবং তাঁর প্রতিপালকের কাছে মিনতি করলেন। আল্লাহ তাদের থেকে সেই কম্পন দূর করে দিলেন। তারা স্থির হলো এবং তাদের প্রতিপালকের বাণী শুনল। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহর বাণী: ‘তিনি [মূসা] বললেন—’
‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি চাইলে তাদের ধ্বংস করতে পারতে আগেই’—অর্থাৎ, বাছুরের উপাসনার আগেই; ‘এবং আমাকেও’—মিসরীয়কে হত্যা করার কারণে।
‘আমাদের মধ্যকার নির্বোধদের কৃতকর্মের জন্য কি তুমি আমাদের ধ্বংস করবে?’—অর্থাৎ, বাছুরের উপাসনাকারীদের কাজের জন্য। মূসা ধারণা করেছিলেন, বাছুর গ্রহণ করার কারণে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্নের ভঙ্গিতে কথাটি বলেছিলেন: ‘নির্বোধদের কাজের জন্য কি তুমি আমাদের ধ্বংস করবে?’ মুবররাদ বলেন, ‘নির্বোধদের কৃতকর্মের জন্য আমাদের ধ্বংস করবে’—এটি অনুকম্পা প্রার্থনার প্রশ্ন; অর্থাৎ, আমাদের ধ্বংস কোরো না।
মূসা (আ.) জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা এত ন্যায়পরায়ণ যে, একজন অপরাধীর অপরাধের কারণে অন্যকে পাকড়াও করবেন না।
আল্লাহর বাণী, ‘এটি তো কেবল তোমার পরীক্ষা’—অর্থাৎ, নির্বোধেরা যে পরীক্ষায় পড়েছিল, তা ছিল কেবল তোমার পরীক্ষা ও যাচাই। এর দ্বারা তুমি একদলকে পথভ্রষ্ট করেছ, ফলে তারা পরীক্ষায় পড়ে বিভ্রান্ত হয়েছে; আর একদলকে সৎপথে পরিচালিত করেছ, ফলে তুমি তাদের রক্ষা করেছ এবং তারা তোমার দ্বীনের ওপর অবিচল থেকেছে। এটাই ‘এর দ্বারা তুমি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর’—এর অর্থ। ‘তুমি আমাদের অভিভাবক’—অর্থাৎ, আমাদের সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী।
‘অতএব আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের প্রতি দয়া করো; আর ক্ষমাকারীদের মধ্যে তুমিই সর্বোত্তম।’
‘আর আমাদের জন্য লিখে দাও’—অর্থাৎ, আমাদের জন্য অবধারিত করো; ‘এ দুনিয়ায় কল্যাণ’—অর্থাৎ, নিয়ামত ও নিরাপত্তা; ‘এবং আখিরাতেও কল্যাণ’—অর্থাৎ, ক্ষমা ও জান্নাত; ‘নিশ্চয়ই আমরা তোমার দিকে ফিরে এসেছি’—অর্থাৎ, আমরা তোমার কাছে তওবা করেছি।
আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘আমার শাস্তি—আমি আমার সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকি। আর আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে’—অর্থাৎ, তা সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। হাসান ও কাতাদা বলেন, দুনিয়ায় তাঁর রহমত সৎ ও অসৎ—সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে; আর কিয়ামতের দিন তা বিশেষভাবে মুত্তাকিদের জন্য হবে। আতিয়্যা আল-আওফি বলেন, তাঁর রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে, কিন্তু তা কেবল তাদের জন্যই আবশ্যক হবে যারা তাকওয়া অবলম্বন করে।
কারণ, কাফিরও রিজিক পায় এবং মুমিনদের কারণে তার কাছ থেকে বিপদ দূর করা হয়—এটি মুমিনদের প্রতি আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতার কারণে; এভাবে সে সেই রহমতের মধ্যে জীবনযাপন করে। কিন্তু আখিরাতে পৌঁছালে তা কেবল মুমিনদের জন্যই নির্দিষ্ট হবে। যেমন, অন্যের প্রদীপের আলোয় আলোকিত ব্যক্তি—প্রদীপের মালিক তার প্রদীপ নিয়ে চলে গেলে সে আলো পায় না।
ইবনু আব্বাস (রা.), কাতাদা ও ইবনু জুরাইজ বলেন, যখন ‘আর আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে’ আয়াতটি নাজিল হলো, তখন ইবলিস বলল, ‘আমিও তো সেই সবকিছুর অন্তর্ভুক্ত।’ তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘অতঃপর আমি তা তাদের জন্য নির্ধারণ করব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান আনে।’ ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এই রহমত নিজেদের জন্য কামনা করে বলল, ‘আমরা তাকওয়া অবলম্বন করি, ঈমান আনি এবং যাকাত দিই।’ অতঃপর আল্লাহ তা এই উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট করলেন—এরপর তিনি বললেন:
‘সহিহ আল-বুখারি’ (নং ৭৪০৫)-এ হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে: ‘আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর অগ্রগামী।’