رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَلِوَالِدَيَّ، وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا، وَلِلْمُؤْمِنِينَ، وَالْمُؤْمِنَاتِ، وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا.
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
হে আমার রব্ব! তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতামাতাকে যারা আমার গৃহে মু’মিন হয়ে প্রবেশ করে তাদেরকে আর মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদেরকে; আর যালিমদের জন্য ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করো না।’
রূপ: «ইগফির লী» (اغْفِرْ لِي)—নিজের জন্য, পিতামাতার জন্য, ঘনিষ্ঠ অতিথিদের জন্য এবং কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সকল মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার এক সর্বব্যাপী অভিব্যক্তি।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
(رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا) — «হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যে মুমিন অবস্থায় আমার গৃহে প্রবেশ করেছে তাকে ক্ষমা করুন»—এখানে তাঁদের বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ তাঁদের অধিকার অধিক নিশ্চিত এবং তাঁদের প্রতি সদাচরণকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। এরপর তিনি দোয়াকে ব্যাপক করে বললেন: (وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا) — «আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরও; আর জালিমদের জন্য ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করবেন না»। অর্থাৎ, ক্ষতি, বিনাশ ও ধ্বংস। নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সূরার তাফসির সমাপ্ত হলো। সকল প্রশংসা আল্লাহর।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর (আরবি) এর অন্য কিরআত (আরবি) ও রয়েছে। মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ পাপের আধিক্যের কারণে হযরত নূহ (আঃ)-এর কওমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য, হঠকারিতা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাদেরকে পানিতে নিমজ্জিত করা হয়েছিল এবং সেখান থেকে আগুনের গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
তাদেরকে আল্লাহর এই আযাব হতে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কেউ এগিয়ে আসেনি এবং তারা তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারীও পায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ)-এর ঐ উক্তি উদ্ধৃত করেন যে উক্তি তিনি তাঁর পুত্রের প্রতি করেছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজ আল্লাহর বিধান হতে রক্ষা করবার কেউ নেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন সে ব্যতীত।”( ১১:৪৩) হযরত নূহ (আঃ) স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতাবান ও মহামহিমান্বিত আল্লাহর দরবারে ঐ হতভাগ্যদের বিরুদ্ধে বদ দু'আ করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিবেন না।
হলো তাই, সবাই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল। এমনকি হযরত নূহ (আঃ)-এর নিজের পুত্র, যে তার থেকে পৃথক ছিল, সেও রক্ষা পায়নি। হযরত নূহ (আঃ) তাঁর ঐ পুত্রকে অনেক কিছু বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোনই ফল হয়নি। সে মনে করেছিল যে, পানি তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, সে কোন এক উঁচু পাহাড়ের উপর উঠে গিয়ে আত্মরক্ষা করবে।
কিন্তু ওটা ছিল আল্লাহর আযাব ও গযব এবং হযরত নূহ (আঃ)-এর বদ দু'আর ফল। কাজেই তা হতে রক্ষা করতে পারবে কে? পানি তাকে ওখানেই ধরে ফেলছে এবং সে তার পিতার চোখের সামনে কথা বলতে বলতে ডুবে মরছে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি হযরত নূহ এর তুফানের সময় আল্লাহ তা’আলা কারো প্রতি দয়া করতেন তবে তিনি ঐ মহিলাটির উপর দয়া করতেন যে উনানে পানি উথলিয়ে উঠতে দেখে নিজের শিশু সন্তানকে নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গিয়েছিল।
পানি যখন ওখানেও উঠে গেল তখন সে তার শিশুটিকে কাঁধের উপর উঠিয়ে নিলো। পানি যখন তার কাঁধ পর্যন্তও উঠে গেল তখন শিশুটিকে সে তার মাথার উপর বসিয়ে নিলো। মাথার উপরেও যখন পানি উঠে গেল তখন সে ছেলেকে হাতে উঠিয়ে নিয়ে মাথার ঊর্ধ্বে উঠালো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পানি সেখানেও পৌঁছে গেল এবং মাতা ও সন্তান উভয়েই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল।
সুতরাং ঐদিন যদি আল্লাহ তা'আলা ভূ-পৃষ্ঠের কাফিরদের মধ্য হতে কারো প্রতি দয়া করতেন তবে অবশ্যই ঐ মহিলাটির উপর দয়া করতেন।” (এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল কিন্তু এর বর্ণনাকারী সবাই নির্ভরযোগ্য) মোটকথা যমীনের সমস্ত কাফিরদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। শুধু ঐ ঈমানদার লোকদেরকে রক্ষা করা হয় যারা হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে তার নৌকায় ছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত নূহ (আঃ) যাদেরকে তার নৌকায় উঠিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত নূহ (আঃ) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর কওমের লোকেরা তাঁর উপর ঈমান আনবে না, তাই তিনি নৈরাশ্য প্রকাশ করে বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক!
আমার চাহিদা এই যে, সমস্ত কাফিরকে ধ্বংস করে দেয়া হোক। যদি আপনি তাদের মধ্য হতে কাউকেও অব্যাহতি দেন তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে এবং জন্ম। দিতে থাকবে শুধু দুষ্কৃতিকারী ও কাফিরদের। তাদের পরবর্তী বংশধরগণ তাদের মতই বদকার ও কাফির হবে।
সাথে সাথে তিনি নিজের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করবে তাদেরকে। ঘর দ্বারা এখানে মসজিদকেও বুঝানো হয়েছে। তবে সাধারণ অর্থ ঘরই বটে।
মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তুমি মুমিন ছাড়া কারো সঙ্গী হয়ো না এবং আল্লাহভীরু ছাড়া কেউ যেন তোমার খাদ্য না খায়।” (এ হাদীসটি সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিযীতেও বর্ণিত হয়েছ এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন, শুধু এই সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে)এরপর হযরত নূহ (আঃ) তাঁর দু'আকে সাধারণ করেন এবং বলেনঃ হে আল্লাহ! সমস্ত ঈমানদার নারী পুরুষকেও আপনি ক্ষমা করে দিন, জীবিতই হোক বা মৃতই হোক। এ জন্যেই মুস্তাহাব এটাই যে, প্রত্যেক মানুষ তার দু'আতে অন্য মু'মিনকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।
তাহলে হযরত নূহ (আঃ)-এর অনুসরণও করা হবে। এবং সাথে সাথে এ সম্পর্কে উল্লিখিত হাদীসগুলোর উপর আমলও করা হবে। এরপর দু'আর শেষে হযরত নূহ (আঃ) বলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকেও ক্ষমা করে দিন এবং যালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন!
আল-বাগাভির তাফসির
(رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ) — «হে আমার রব! আমাকে ও আমার পিতামাতাকে ক্ষমা করুন»। তাঁর পিতার নাম ছিল লামাক ইবনু মাতূশালাখ, আর তাঁর মায়ের নাম ছিল সামহা বিনতু আনূশ। তাঁরা দুজনই মুমিন ছিলেন। (وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ) — «এবং যে আমার গৃহে প্রবেশ করেছে»; অর্থাৎ, আমার বাসস্থানে।
(مُؤْمِنًا) — «মুমিন অবস্থায়»। দাহহাক ও কালবী বলেছেন: এর অর্থ, আমার মসজিদ। আরেকটি মত হলো, এর দ্বারা তাঁর নৌযান (سفينة) বোঝানো হয়েছে। (وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ) — «এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্যও»; এটি তাদের সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং রাসূলদের সত্য বলে মেনেছে।
(وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا) — «আর জালিমদের জন্য ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করবেন না»; অর্থাৎ, বিনাশ ও ধ্বংস। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেছিলেন এবং তাদের ধ্বংস করেছিলেন। আরও বলা হয়েছে, তাঁর মায়ের নাম ছিল হাইগাল বিনতু লামূশ ইবনু মাতূশালাখ; তিনি ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন।
সুনান আত-তিরমিযী (৩৫৩৪)-তে বর্ণিত হয়েছে: «যে ব্যক্তি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার জন্য প্রত্যেক মুমিনের বিপরীতে একটি করে নেক আমল লিপিবদ্ধ করা হয়!»