দোয়া 60 অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা 89 মিনিট পড়তে

আশ্রয়প্রার্থনার দুই সূরা

আল্লাহর কাছে আশ্রয়প্রার্থী মুসলিম 113:1–5 / 114:1–6
আরবি পাঠ
1  সূরা 113 · আল-ফালাক الفلق

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ، وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ، وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ، وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ.

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

2  সূরা 114 · আন-নাস الناس

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ، مَلِكِ النَّاسِ، إِلَٰهِ النَّاسِ، مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ، الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ، مِنَ الْجِنَّةِ، وَالنَّاسِ.

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَٰهِ النَّاسِ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। الفلق · الناس 113:1–5 / 114:1–6
দোয়া শুনুন · আল-ফালাক 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
দোয়া শুনুন · আন-নাস 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Bismillāhir-Raḥmānir-Raḥīm. Qul a‘ūdhu birabbil-falaq. Min sharri mā khalaq. Wa min sharri ghāsiqin idhā waqab. Wa min sharrin-naffāthāti fil-‘uqad. Wa min sharri ḥāsidin idhā ḥasad. Bismillāhir-Raḥmānir-Raḥīm. Qul a‘ūdhu birabbin-nās. Malikin-nās. Ilāhin-nās. Min sharril-waswāsil-khannās. Alladhī yuwaswisu fī ṣudūrin-nās. Minal-jinnati wan-nās.
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

বল, ‘আমি আশ্রয় চাচ্ছি সকাল বেলার রব-এর, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে, আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট হতে যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এবং (জাদু করার উদ্দেশ্যে) গিরায় ফুৎকারকারিণীদের অনিষ্ট হতে, এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে। বল, ‘আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির, মানুষের প্রকৃত ইলাহর, যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে বার বার এসে কুমন্ত্রণা দেয় তার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে (এই কুমন্ত্রণাদাতা হচ্ছে) জিন্নের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে।

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

রূপ: মুসহাফের শেষের দুটি সূরা—মু‘আউব্বিযাতাইন (আশ্রয়প্রার্থনার দুই সূরা)। বদনজর, জাদু, হিংসা এবং জিন ও মানুষের মধ্যকার শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে মুসলিমের প্রধান রক্ষাকবচ।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

“আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে”—হিংসুক হলো সে, যে হিংসার পাত্রের কাছ থেকে নিয়ামত দূর হয়ে যাক—এটা কামনা করে এবং যে উপায়ে পারে তা দূর করার চেষ্টা করে। তাই তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং তার কৌশল নস্যাৎ করা প্রয়োজন। বদনজরদাতাও হিংসুকের অন্তর্ভুক্ত; কারণ বদনজর কেবল মন্দ স্বভাব ও কলুষিত অন্তরের হিংসুকের থেকেই বের হয়। এই সূরায় তাই সাধারণ ও বিশেষ—সব ধরনের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

এতে প্রমাণিত হয় যে জাদুর বাস্তবতা আছে, তার ক্ষতির আশঙ্কা করা হয় এবং তা ও জাদুকরদের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হয়।

অর্থাৎ, “বল”—আশ্রয়প্রার্থী হয়ে—“আমি আশ্রয় চাই”, অর্থাৎ আমি আশ্রয় নিই, নিরাপত্তা চাই এবং সুরক্ষা গ্রহণ করি, “ফালাকের রবের কাছে”; অর্থাৎ যিনি শস্যদানা ও আঁটি বিদীর্ণ করেন এবং ভোর উদ্ভাসিত করেন।

এরপর ব্যাপক অনিষ্টের কথা বলার পর বিশেষভাবে বলেছেন: “আর অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে, যখন তা আচ্ছন্ন করে”—অর্থাৎ রাতের বেলায় যে অনিষ্ট ঘটে, যখন রাত মানুষকে ঢেকে ফেলে এবং তাতে বহু অশুভ আত্মা ও ক্ষতিকর প্রাণী ছড়িয়ে পড়ে, সেসবের অনিষ্ট থেকে।

“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে”—এতে আল্লাহর সৃষ্ট সবকিছু, মানুষ, জিন ও প্রাণী অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সেগুলোর মধ্যে থাকা অনিষ্ট থেকে সেগুলোর স্রষ্টার কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়।

“আর গিরায় ফুঁৎকারকারিণীদের অনিষ্ট থেকে”—অর্থাৎ সেই জাদুকরী নারীদের অনিষ্ট থেকে, যারা জাদুর জন্য গিঁট দেওয়া সুতোয় ফুঁ দিয়ে জাদু করে।

এই সূরায় মানুষের রব, তাদের অধিপতি ও উপাস্যের কাছে শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। শয়তান সব অনিষ্টের মূল ও উৎস। তার প্রলোভন ও অনিষ্টের একটি দিক হলো, সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়; মন্দ কাজকে সুন্দর করে দেখায়, সেটিকে সুন্দর রূপে উপস্থাপন করে এবং তা করার ইচ্ছাকে জাগিয়ে তোলে। আর কল্যাণকে কুৎসিত করে দেখায়, তা থেকে নিরুৎসাহিত করে এবং তার প্রকৃত রূপ আড়াল করে।

সে সব সময় এভাবেই কুমন্ত্রণা দিতে থাকে এবং গোপনে সরে পড়ে; অর্থাৎ বান্দা যখন তার রবকে স্মরণ করে এবং শয়তানের অনিষ্ট ঠেকাতে তাঁর সাহায্য চায়, তখন সে পিছিয়ে যায়। তাই মানুষের উচিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি তাঁর রবুবিয়্যাতের আশ্রয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। সব সৃষ্টি তাঁর রবুবিয়্যাত ও কর্তৃত্বের অধীন; প্রত্যেক প্রাণীর কপালের ঝুঁটি তাঁর হাতে। আর তাঁর উলুহিয়্যাতের আশ্রয়ও চাইতে হবে—যে উদ্দেশ্যে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহর ইবাদত পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না তাঁর শত্রুর অনিষ্ট প্রতিহত করা হয়; সে মানুষকে ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে, তাদের ও ইবাদতের মাঝে বাধা সৃষ্টি করতে এবং তাদের নিজের দলের অন্তর্ভুক্ত করে জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী বানাতে চায়। কুমন্ত্রণা জিনদের থেকেও আসে, মানুষের থেকেও আসে। এ জন্যই বলা হয়েছে: “জিন ও মানুষের মধ্য থেকে।”

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগতসমূহের রব—প্রথমে ও শেষে, প্রকাশ্যে ও গোপনে। আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করেন এবং আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করেন—যেগুলো তাঁর বহু বরকত থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে; আর আমাদের ভুলত্রুটি ও প্রবৃত্তির অনুসরণ ক্ষমা করেন—যেগুলো তাঁর আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা থেকে আমাদের অন্তরকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা তাঁর অনুগ্রহের আশা ও প্রত্যাশা করি—আমাদের মন্দ কাজের কারণে যেন তিনি তাঁর কাছে থাকা কল্যাণ থেকে আমাদের বঞ্চিত না করেন। আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না এবং পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় ছাড়া কেউ তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।

আল্লাহ তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের প্রতি সর্বদা অব্যাহত দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যাঁর নিয়ামতেই সৎকর্মসমূহ পূর্ণতা পায়। তাঁর সাহায্য ও উত্তম তাওফিকে তাঁর কিতাবের তাফসির সম্পন্ন হলো। এটি সংকলন ও লেখন করেছেন আবদুর রহমান ইবন নাসির ইবন আবদুল্লাহ, যিনি ইবন সা‘দী নামে পরিচিত।

আল্লাহ তাঁকে, তাঁর পিতা-মাতাকে এবং সব মুসলিমকে ক্ষমা করুন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর হিজরতের ১৩৪৪ সালের রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিনে এটি সম্পন্ন হয়।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক।

হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল। সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে।

(আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।

একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন।

এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল।

এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন।

ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি। সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন।

দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?"

দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।”

দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।

তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম।

এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে।

তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো।

প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”

এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক।

হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল। সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে।

(আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।

একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন।

এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল।

এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন।

ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি। সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন।

দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?"

দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।”

দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।

তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম।

এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে।

তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো।

প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”

এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক।

হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল। সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে।

(আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।

একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন।

এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল।

এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন।

ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি। সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন।

দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?"

দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।”

দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।

তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম।

এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে।

তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো।

প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”

এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক।

হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল। সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে।

(আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।

একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন।

এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল।

এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন।

ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি। সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন।

দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?"

দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।”

দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।

তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম।

এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে।

তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো।

প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”

এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) সকাল বেলাকে বলা হয়। আওফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমেরই অন্য জায়গায় (আরবি) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এর অর্থ হলো মাখলুক।

হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি জায়গা। ঐ জায়গার দরজা খোলা হলে তথাকার আগুনের উত্তাপ এবং ভয়াবহতায় জাহান্নামের সমস্ত অধিবাসী চীৎকার করতে শুরু করে। একটি মারফু হাদীসেও উপরোক্ত হাদীসেরই প্রায় অনুরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু ওটাকে মুনকার হাদীস বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) জাহান্নামের নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রথমটিই সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য উক্তি। অর্থাৎ (আরবি) এর অর্থ হলো সকাল বেলা। ইমাম বুখারীও (রঃ) একথাই বলেছেন এবং এটাই নির্ভুল। সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর অপকারিতার মধ্যে জাহান্নাম, ইবলীস ও ইবলীসের সন্তান সন্ততিও রয়েছে।

(আরবি) এর অর্থ হলো রাত। (আরবি) এর অর্থ হলো সূর্যাস্ত। অর্থাৎ যখন অন্ধকার রাত উপস্থিত হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আরবের লোকেরা সুরাইয়া নক্ষত্রের অস্তমিত হওয়াকে বলে। অসুখ এবং বিপদ আপদ সুরাইয়া নক্ষত্র উদিত হওয়ার পর বৃদ্ধি পায় এবং ঐ নক্ষত্র অস্তমিত হওয়ার পর অসুখ বিপদ আপদ কেটে যায়।

একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) হলো নক্ষত্রের নাম। কিন্তু এ হাদীসের মারফু হওয়ার কথা সত্য নয়। কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো চাঁদ। তাফসীরকারদের দলীল হলো মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদীস, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাত ধরে চাঁদের প্রতি ইশারা করে বললেনঃ “আল্লাহর কাছে ঐ (আরবি) এর অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর।"

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, (আরবি) দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। উভয় উক্তির মধ্যে সহজেই সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে বলা যেতে পারে যে, এটা হলো চাদের ক্রমবৃদ্ধি এবং নক্ষত্ররাজির আত্মপ্রকাশ ইত্যাদি। এসব কিছু রাত্রিকালেই হয়ে থাকে এবং যখন রাত্রির আগমন ঘটে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

গ্রন্থিসমূহের উপর পড়ে পড়ে ফুৎকারকারিণীরা অর্থাৎ যাদুকর নারীগণ। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যেই মন্ত্র পাঠ করে সাপে কাটা রোগীর উপর ফু দেয়া হয় এবং ভূত প্রেত তাড়ানোর জন্যে ফু দেয়া হয় এগুলো শিরকের খুবই কাছাকাছি। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি কি রোগাক্রান্ত?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেন “হ্যা” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন নিম্নের দু'আ দু'টি পাঠ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ফু দিচ্ছি সেই সব রোগের জন্যে যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক হিংসুকের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন।

এই রোগ দ্বারা সম্ভবতঃ ঐ রোগকেই বুঝানো হয়েছে যে রোগে তিনি যাদুকৃত হওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। এতে হিংসুটে ইয়াহুদীদের যাদুর প্রভাব নস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে যাদু করা সত্ত্বেও তিনি যাদুকারীদেরকে কোন কটু কথা বলেননি এবং ধমকও। দেননি। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে সুস্থতা ও আরোগ্য দান করেন। মুসনাদে আহমদে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এর উপর একজন ইয়াহূদী যাদু করেছিল।

এই কারণে নবী (সঃ) কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে জানান যে, অমুক ইয়াহূদী তার উপর যাদু করেছে এবং অমুক অমুক কুঁয়ায় গ্রন্থি বেঁধে রেখেছে। সুতরাং তিনি যেন কাউকে পাঠিয়ে ঐ গ্রন্থি খুলিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোক পাঠিয়ে তখন কুঁয়া থেকে ঐ যাদু বের করিয়ে আনান এবং গ্রন্থিখুলে ফেলেন।

ফলে যাদুর প্রভাব কেটে যেতে শুরু করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ। (সঃ) ঐ ইয়াহুদীকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। এবং তাকে দেখে। কখনো মুখও মলিন করেননি। সহীহ বুখারীতে কিতাবুত তিব্বে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যাদু করা হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ভেবেছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন, অথচ তিনি তাদের কাছে যাননি। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেন যে, এটাই যাদুর সবচেয়ে বড় প্রভাব। এ অবস্থা হওয়ার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! আমি আমার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করেছি এবং তিনি আমাকে জানিয়েছেন।

দু’জন লোকে আমার কাছে আসেন। একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন আমার পায়ের কাছে বসেন 'আমার কাছে অর্থাৎ শিয়রে যিনি বসেছিলেন, তিনি দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এর অবস্থা কি?” দ্বিতীয়জন উত্তরে বললেনঃ “এঁর উপর যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন প্রশ্ন করলেনঃ “কে যাদু করেছে?"

দ্বিতীয়জন জবাব দিলেনঃ “লুবাইদ ইবনে আসাম। সে বান্ যুরাইক গোত্রের লোক। সে ইয়াহূদীদের মিত্র এবং মুনাফিক।" প্রথম জন জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিসের মধ্যে যাদু করেছে?" দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “মাথার চুলে ও চিরুণীতে। প্রথমজন প্রশ্ন করলেনঃ “কোথায়, তা দেখাও।”

দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেনঃ “খেজুর গাছের বাকলে, পাথরের নিচে এবং যারওয়ান কূপে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কূপের কাছে গমন করলেন এবং তা থেকে ওসব বের করলেন। ঐ কূপের পানি ছিল যেন মেহদীর রঙ। ওর পাশের খেজুর গাছগুলোকে ঠিক শয়তানের মাথার মত মনে হচ্ছিল।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ): এ কাজের জন্যে তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তিনি আমাকে নিরাময় করেছেন ও সুস্থতা দিয়েছেন। আমি মানুষের মধ্যে মন্দ ছড়ানো পছন্দ করি না।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটা কাজ করেননি। অথচ তাঁর মনে হতো যে, তিনি ওটা করেছেন। এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশক্রমে ঐ কূপে মাটি ভর্তি করে দেয়া হয়। এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ছয় মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সঃ) এরূপ অবস্থা ছিল।

তাফসীরে সালাবীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের একটা ছেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমত করতো। ঐ ছেলেটিকে ফুসলিয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কয়েকটি চুল এবং তাঁর চুল আঁচড়াবার চিরুনীর কয়েকটি দাঁত হস্তগত করে। তারপর তারা ওগুলোতে যাদু করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশী সচেষ্ট ছিল লুবাইদ ইবনে আসাম।

এরপর যাদুর গ্রন্থি বা সুরাইক যারওয়ান নামক কূপে স্থাপন করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার স্ত্রীদের কাছে গমন না করেও তাঁর মনে হতো যে তিনি তাদের কাছে গমন করেছেন। এইমন ভুলো অবস্থা দূরীকরণের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু এরকম অবস্থা হওয়ার কারণ তাঁর জানা ছিল না। ছয় মাস পর্যন্ত ঐ একই অবস্থা চলতে থাকে।

তারপর উপরোল্লিখিত ঘটনা ঘটে। দুজন ফেরেশতা এসে কথােপকথনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আলী (রাঃ), হযরত যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আম্মার (রাঃ) কে পাঠিয়ে কূপ থেকে যাদুর গ্রন্থিগুলো বের করিয়ে আনেন। ঐ যাদুকৃত জিনিষগুলোর মধ্যে একটি ধনুকের রঞ্জু ছিল, তাতে ছিল বারোটি গ্রন্থি বা গেরো।

প্রত্যেক গেরোতে একটি করে সূচ বিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ সূরা দু’টি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টির এক একটি আয়াত পাঠ করছিলেন আর ঐ গ্রন্থিসমূহ একটি একটি করে আপনা আপনি খুলে যাচ্ছিল। সূরা দু'টি পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত গেরোই খুলে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উপরোল্লিখিত দু'আ পাঠ করেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি ঐ নরাধমকে ধরে হত্যা করে ফেলবো রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আমি মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ও বিবাদ ফাসাদ সৃষ্টি করতে চাই না।”

এ বর্ণনায় গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর এ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)!

তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে?

কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন।

পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র।

হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।”

(এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি।

আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে।

ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়।

অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(

আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(

আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি।

একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)। মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন।

হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন।

তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে?

উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)।

রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।”

হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।”

হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন।

এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর এ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)!

তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে?

কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন।

পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র।

হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।”

(এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি।

আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে।

ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়।

অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(

আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(

আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি।

একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)। মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন।

হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন।

তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে?

উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)।

রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।”

হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।”

হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন।

এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর এ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)!

তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে?

কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন।

পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র।

হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।”

(এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি।

আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে।

ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়।

অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(

আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(

আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি।

একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)। মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন।

হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন।

তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে?

উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)।

রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।”

হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।”

হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন।

এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর এ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)!

তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে?

কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন।

পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র।

হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।”

(এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি।

আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে।

ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়।

অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(

আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(

আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি।

একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)। মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন।

হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন।

তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে?

উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)।

রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।”

হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।”

হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন।

এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর এ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)!

তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে?

কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন।

পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র।

হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।”

(এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি।

আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে।

ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়।

অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(

আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(

আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি।

একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)। মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন।

হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন।

তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে?

উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)।

রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।”

হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।”

হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন।

এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”

১-৬ নং আয়াতের তাফসীর এ সূরায় মহা মহিমান্বিত আল্লাহর তিনটি গুণ বিবৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি হলেন পালনকর্তা, শাহানশাহ এবং মা'বুদ বা পূজনীয়। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তার মালিকানাধীন এবং সবাই তার আনুগত্য করছে। তিনি তার প্রিয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)!

তুমি বলে দাও, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির এবং মানুষের মা'বুদের, পশ্চাদপসরণকারীর অনিষ্ট হতে যে মানুষের অন্তরসমূহে কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা দিয়ে থাকে। চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। অর্থাৎ যারা অন্যায় ও খারাপ কাজকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে চোখের সামনে হাজির করে পথভ্রষ্ট এবং বিভ্রান্ত করার কাজে যারা অতুলনীয়। আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই শুধু তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেতে পারে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে শয়তান রয়েছে।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি শয়তান রয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা আমার সঙ্গেও শয়তান রয়েছে?

কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ শয়তানের মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করেছেন, কাজেই আমি নিরাপদ থাকি। সে আমাকে পুণ্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ই'তেকাফে থাকা অবস্থায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়া (রাঃ) তাঁর সাথে রাতের বেলায় দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)ও তাঁকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকেন।

পথে দু’জন আনসারীর সাথে দেখা হলো। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর স্ত্রীকে দেখে দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে থামালেন এবং বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার সাথে যে মহিলাটি রয়েছে এটা আমার স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুইয়াই (রাঃ)।” তখন আনসারী দু’জন বললেনঃ “আল্লাহ্ পবিত্র।

হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। এ কথা আমাদেরকে বলার প্রয়োজনই বা কি ছিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মানুষের রক্ত। প্রবাহের স্থানে শয়তান ঘোরাফেরা করে থাকে। সুতরাং আমি আশংকা করছিলাম যে, শয়তান তোমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় না কি।”

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন “শয়তান তার হাত মানুষের অন্তকরণের উপর স্থাপন করে রেখেছে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদত করে তখন সে নিজের হাত মানুষের অন্তকরণ থেকে সরিয়ে নেয়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় তখন শয়তান মানুষের অন্তকরণের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটাই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা এবং এটাই ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস।”

(এ হাদীসটি হাফিয আবূইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুসনাদে আহমাদে এমন একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যিনি গাধার পিঠে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। গাধা একটু হোঁচট খেলে ঐ সাহাবী বলে ওঠেনঃ “শয়তান ধ্বংস হোক।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এভাবে বলো না, এতে শয়তান আরো বড় হয়ে যায়, আরো এগিয়ে আসে এবং বলেঃ আমি নিজের শক্তি দ্বারা তাকে কাবু করেছি।

আর যদি বিসমিল্লাহ বলো তবে সে ছোট হতে হতে মাছির মতে হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর স্মরণে শয়তান পরাজিত ও নিস্তেজ হয়ে যায়। আর আল্লাহকে বিস্মরণ হলে সে বড় হয়ে যায় ও জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে শয়তান তার কাছে যায় এবং আদর করে তার গায়ে হাত বুলাতে থাকে, যেমন মানুষ গৃহপালিত পশুকে আদর করে।

ঐ আদরে লোকটি চুপ করে থাকলে শয়তান তার নাকে দড়ি বা মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ “তোমরা স্বয়ং নাকে দড়ি লাগানো এবং মুখে লাগাম পরিহিত লোককে দেখতে পাও। নাকে দড়ি লাগানো হলো ঐ ব্যক্তি যে এক দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আল্লাহকে স্মরণ করে না। আর মুখে লাগাম পরিহিত হলো ঐ ব্যক্তি যে মুখ খুলে রাখে এবং আল্লাহর যিক্র করে না।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, শয়তান আদম সন্তানের মনে তার থাবা বসিয়ে রাখে। মানুষ যেখানেই ভুল করে এবং উদাসীনতার পরিচয় দেয় সেখানেই সে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। আর যেখানে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে সেখানে সে পশ্চাদপসরণ করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, সুখ-শান্তি এবং দুঃখ কষ্টের সময় শয়তান মানুষের মনে ছিদ্র করতে চায়।

অর্থাৎ তাকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। এ সময়ে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে তবে শয়তান পালিয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শয়তানকে মানুষ যেখানে প্রশ্রয় দেয় সেখানে সে মানুষকে অন্যায় অপকর্ম শিক্ষা দেয়, তারপর কেটে পড়ে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ মানব মণ্ডলীর অন্তর সমূহে কুমন্ত্রণা দেয়।(

আরবি) শব্দের অর্থ মানুষ। তবে এর অর্থ জ্বিনও হতে পারে। কুরআন কারীমের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ জ্বিনের মধ্য হতে কতকগুলো তোক। কাজেই জ্বিনসমূহকে শব্দের অন্তর্ভুক্ত করা অসঙ্গত নয়। মোটকথা, শয়তান। জ্বিন এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।(

আরবি) (জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ এরা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, চাই সে জ্বিন হোক অথবা মানুষ হোক। এর তাফসীর এরূপও করা হয়েছে। মানব ও দানব শয়তানরা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি মানবরূপী অথবা দানবরূপী শয়তানকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়েছি।

একজন অন্যজনের কানে ধোকা-প্রতারণামূলক কথা সাজিয়ে গুছিয়ে ব্যক্ত করে।” (৬:১১২)। মুসনাদে আহমদে হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির হন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে অবস্থান করছিলেন।

হযরত আবু যার (রাঃ) তার পাশে বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি নামায পড়েছো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তখন তিনি বললেনঃ “তা হলে উঠে নামায পড়ে নাও।” হযরত আবু যার (রাঃ) উঠে নামায পড়লেন।

তারপর বসে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবু যার (রাঃ) মানবরূপী শয়তান হতে এবং দানবরূপী শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে?

উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা”, হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) নামায কি?" তিনি জবাবে বললেনঃ “নামায খুব ভাল কাজ। যার ইচ্ছা কম পড়তে পারে এবং যার ইচ্ছা বেশী পড়তে পারে।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)।

রোযা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “যথেষ্ট হওয়ার মত একটি ফরজ কাজ। আল্লাহর কাছে এর জন্যে বহু পুরস্কার রয়েছে। হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “সাদকা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “সাদকা এমনই জিনিষ যার বিনিময় বহুগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে।”

হযরত আবু যার (রাঃ) আর করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। কোন সাদকা সবচেয়ে উত্তম?” রাসূলুল্লাহ। (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও সাদকা করা, অথবা চুপে চুপে কোন ফকীর মিসকীন ও দুঃখী জনের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) ছিলেন প্রথম নবী।” হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তিনি নবী ছিলেন, এবং এমন ব্যক্তি ছিলেন যার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কথাবার্তা বলেছেন।”

হযরত আবু যার (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। রাসূল কত জন ছিলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তিনশত দশের কিছু বেশী, বলা যায় একটি বড় জামাআত।” আবার এও বললেনঃ “তিনশত পনেরো।” হযরত আবু যার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আপনার প্রতি নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াত কোনটি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “আয়াতুল কুরসী অর্থাৎ,(আরবি) এই আয়াতটি।” (এ হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বানও (রঃ) অন্য সনদে এ হাদীসটি দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন।

এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুসনাদে আহমদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মনে এমন সব চিন্তা আসে যেগুলো প্রকাশ করার চেয়ে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াই আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় (সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি করবো?)। নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “(তুমি বলবে): (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি শয়তানের প্রতারণাকে ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ শুধু কুমন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, বাস্তবে কার্যে পরিণত করেননি।”

আল-বাগাভির তাফসির

“আর অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে, যখন তা আচ্ছন্ন করে”—আবুল হাসান আস-সারাখসী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে যাহির ইবন আহমাদ বর্ণনা করেছেন; তাঁকে জা‘ফর ইবন মুহাম্মাদ আল-মুগলিস বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: হারুন ইবন ইসহাক আল-হামদানী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ওয়াকী‘ আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবন আবি যি’ব থেকে, তাঁর মামা আল-হারিস ইবন আবদুর রহমান থেকে, আবু সালামা থেকে, তিনি আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: নবী ﷺ আমার হাত ধরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: “হে আয়িশা, অন্ধকার যখন আচ্ছন্ন করে, তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। এটাই অন্ধকার, যখন তা আচ্ছন্ন করে।”

এখানে ‘আচ্ছন্ন করা’ বলতে চাঁদের গ্রহণ লাগা, কালো হয়ে যাওয়া বোঝানো হয়েছে। ‘ওয়াকাব’ অর্থ, গ্রহণের মধ্যে প্রবেশ করা, অস্তমিত হতে থাকা এবং অন্ধকার হয়ে যাওয়া। ইবন আব্বাস বলেন: ‘গাসিক’ হলো রাত, যখন তা পূর্বদিক থেকে অন্ধকার নিয়ে আসে, সবকিছুকে ঢেকে ফেলে এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন করে। ‘গাসাক’ অর্থ অন্ধকার।

বলা হয়, “রাত গাসাকা” এবং “আঘসাকা”—যখন তা অন্ধকার হয়। এটাই হাসান ও মুজাহিদের মত; তাঁদের মতে এর অর্থ, রাত এগিয়ে আসে ও প্রবেশ করে। ‘ওকুব’ অর্থ প্রবেশ করা; অর্থাৎ সূর্যাস্তের সঙ্গে রাতের আগমন। মুকাতিল বলেন: এর অর্থ রাতের অন্ধকার, যখন তার কালিমা দিনের আলোতে প্রবেশ করে।

বলা হয়েছে, রাতকে ‘গাসিক’ বলা হয়, কারণ তা দিনের তুলনায় বেশি ঠান্ডা; ‘গাসাক’ অর্থ ঠান্ডা। ইবন যায়দ বলেন: এর দ্বারা সুরাইয়া নক্ষত্রপুঞ্জের অস্ত যাওয়া বোঝানো হয়েছে। বলা হয়, এর অস্ত যাওয়ার সময় রোগব্যাধি বেড়ে যায় এবং তা উদিত হলে রোগ কমে যায়।

“আর গিরায় ফুঁৎকারকারিণীদের অনিষ্ট থেকে”—অর্থাৎ সেই জাদুকরী নারীরা, যারা গিঁটের ওপর মন্ত্র পড়তে পড়তে সুতোয় ফুঁ দেয়। আবু উবাইদা বলেন: তারা ছিল লাবীদ ইবন আল-আ‘সামের কন্যারা; তারা নবী ﷺ-এর ওপর জাদু করেছিল।

“আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে”—অর্থাৎ ইহুদিরা; তারা নবী ﷺ-কে হিংসা করত। এই সূরা মাদানী।

“বল, আমি আশ্রয় চাই ফালাকের রবের কাছে।” ইবন আব্বাস ও আয়িশা (রা.) বলেন: এক ইহুদি বালক রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সেবা করত। ইহুদিরা তাকে বারবার প্ররোচিত করে অবশেষে নবী ﷺ-এর চুল আঁচড়ানোর চিরুনির কিছু চুল এবং চিরুনির কয়েকটি দাঁত তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়।

সে সেগুলো ইহুদিদের দেয়। তারা সেগুলো দিয়ে নবী ﷺ-এর ওপর জাদু করে। এ কাজের দায়িত্বে ছিল ইহুদি ব্যক্তি লাবীদ ইবন আল-আ‘সাম। এ ঘটনায় দুটি সূরা অবতীর্ণ হয়।

আবু হামিদ আহমাদ ইবন আবদুল্লাহ আস-সালিহী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবু সাঈদ মুহাম্মাদ ইবন মূসা আস-সিরাফী বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবুল আব্বাস মুহাম্মাদ ইবন ইয়াকুব আল-আসাম আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আনাস ইবন ইয়াদ আমাদের বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা থেকে, আয়িশা থেকে—নবী ﷺ-এর ওপর জাদু করা হয়েছিল। এমনকি তাঁর মনে হতো, তিনি কোনো কাজ করেছেন, অথচ তা করেননি। তিনি তাঁর রবের কাছে দোয়া করলেন। এরপর বললেন: “তুমি কি জানো, যে বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, সে সম্পর্কে আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন?”

আয়িশা বললেন: “হে আল্লাহর রাসুল, তা কী?” তিনি বললেন: “দুজন লোক আমার কাছে এল। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন পায়ের কাছে বসল। তাদের একজন তার সঙ্গীকে বলল: ‘এই ব্যক্তির কী হয়েছে?’ অন্যজন বলল: ‘তাঁর ওপর জাদু করা হয়েছে।’

সে জিজ্ঞেস করল: ‘কে জাদু করেছে?’ সে বলল: ‘লাবীদ ইবন আল-আ‘সাম।’ সে জিজ্ঞেস করল: ‘কী দিয়ে?’ সে বলল: ‘চিরুনি, আঁচড়ানোর সময় পড়ে যাওয়া চুল এবং পুরুষ খেজুরগাছের মঞ্জরির খোসা দিয়ে।’ সে জিজ্ঞেস করল: ‘তা কোথায়?’ সে বলল: ‘যারওয়ান কূপে’—যারওয়ান ছিল বনু যুরাইকের একটি কূপ।”

আয়িশা বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺ সেখানে গেলেন, তারপর আয়িশার কাছে ফিরে এসে বললেন: “আল্লাহর কসম, এর পানি মেহেদির ভেজানো পানির মতো, আর এর খেজুরগাছগুলো শয়তানের মাথার মতো মনে হচ্ছিল।” আমি বললাম: “হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তা বের করে আনলেন না কেন?” তিনি বললেন: “আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনিষ্ট ছড়িয়ে পড়ুক—এটা আমি অপছন্দ করলাম।”

বর্ণিত হয়েছে, সেটি কূপের একটি পাথরের নিচে ছিল। তারা পাথরটি সরিয়ে খেজুরমঞ্জরির খোসাটি বের করল। তাতে তাঁর মাথার চুল এবং চিরুনির দাঁত ছিল।

আল-মুতাহহার ইবন আলী আল-ফারিসী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম আস-সালিহানী বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবু শাইখ আল-হাফিজ আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন জা‘ফর আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ইবন আবি আসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবু বকর ইবন আবি শাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবু মু‘আবিয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন, আ‘মাশ থেকে, ইয়াযীদ ইবন হাইয়ান থেকে, যিনি যায়দ ইবন আরকাম থেকে বর্ণনা করেন: এক ইহুদি ব্যক্তি নবী ﷺ-এর ওপর জাদু করেছিল। এর কারণে তিনি কয়েক দিন অসুস্থ ছিলেন। এরপর জিবরীল তাঁর কাছে এসে বললেন: “এক ইহুদি ব্যক্তি আপনার ওপর জাদু করেছে এবং আপনার জন্য গিঁট বেঁধেছে।”

রাসুলুল্লাহ ﷺ আলীকে পাঠালেন। তিনি গিঁটগুলো বের করে আনলেন। তিনি যখনই একটি গিঁট খুলতেন, নবী ﷺ হালকা বোধ করতেন। অবশেষে তিনি এমনভাবে উঠে দাঁড়ালেন, যেন বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি ইহুদিদের কিছু জানাননি, আর তারা তাঁর চেহারায় কখনো এর চিহ্ন দেখেনি।

মুকাতিল ও কালবী বলেন: সেটি ছিল একটি সুতোর মধ্যে; তাতে এগারোটি গিঁট দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে, গিঁটগুলোতে সুচ গেঁথে দেওয়া ছিল। আল্লাহ এই দুটি সূরা অবতীর্ণ করলেন; একটিতে পাঁচটি আয়াত এবং অন্যটিতে ছয়টি আয়াত—মোট এগারোটি আয়াত। প্রতিটি আয়াত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি করে গিঁট খুলে গেল; সব গিঁট খুলে গেলে নবী ﷺ এমনভাবে উঠে দাঁড়ালেন, যেন বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েছেন।

বর্ণিত হয়েছে, তিনি এতে ছয় মাস আক্রান্ত ছিলেন, আর তিন রাত তাঁর অসুস্থতা তীব্র হয়েছিল। তখন আশ্রয়প্রার্থনার দুটি সূরা অবতীর্ণ হয়।

ইসমাঈল ইবন আবদুল কাহির আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবদুল গাফির ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন; তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন ঈসা আল-জুলূদী বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ইবরাহিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন সুফইয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: বিশর ইবন হিলাল আস-সাওয়াফ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবদুল আযীয ইবন সুহাইব আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু নাদরা থেকে, আবু সাঈদ থেকে: জিবরীল (আ.) নবী ﷺ-এর কাছে এসে বললেন: “হে মুহাম্মাদ, আপনি কি অসুস্থ?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ।”

তখন তিনি বললেন: “আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি—আপনার কষ্টের কারণ হয় এমন সবকিছু থেকে, প্রত্যেক প্রাণের অনিষ্ট এবং হিংসুকের বদনজর থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দিন। আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য ঝাড়ফুঁক করছি; আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দিন।”

আল্লাহর বাণী, “বল, আমি আশ্রয় চাই ফালাকের রবের কাছে”—এখানে ‘ফালাক’ দ্বারা ভোর বোঝানো হয়েছে। এটাই জাবির ইবন আবদুল্লাহ, হাসান, সাঈদ ইবন জুবাইর, মুজাহিদ, কাতাদা এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মত; ইবন আব্বাস থেকেও আল-আওফীর বর্ণনায় এ মত এসেছে। এর প্রমাণ হলো আল্লাহর বাণী: “ভোর উদ্ভাসিতকারী”। ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘ফালাক’ হলো জাহান্নামের একটি কারাগার।

কালবী বলেন: এটি জাহান্নামের একটি উপত্যকা। দাহহাক বলেন: এর অর্থ সৃষ্টি; ইবন আব্বাস থেকে আল-ওয়ালিবীর বর্ণনায়ও এ মত এসেছে। তবে প্রথম ব্যাখ্যাটিই প্রসিদ্ধ। “তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে।” এই সূরা মাদানী। “বল, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে।”

“যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়”—অর্থাৎ এমন গোপন কথা বলে, যার অর্থ না শুনেও অন্তরে পৌঁছে যায়। “মানুষের অধিপতির।” “মানুষের উপাস্যের।”

“গোপনে কুমন্ত্রণা প্রদানকারী, আত্মগোপনকারীর অনিষ্ট থেকে”—এর দ্বারা শয়তান বোঝানো হয়েছে। ‘ওয়াসওয়াস’ শব্দটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য এবং নাম—দুই অর্থেই ব্যবহৃত হয়। যাজ্জাজ বলেন: অর্থ হলো, কুমন্ত্রণা প্রদানকারী শয়তান, যে ‘খান্নাস’—অর্থাৎ বারবার পিছিয়ে পড়ে। শয়তান মানুষের অন্তরে বসে থাকে; মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করলে সে সরে যায়, আর মানুষ গাফেল হলে কুমন্ত্রণা দেয়।

কাতাদা বলেন: তার কুকুরের শুঁড়ের মতো একটি শুঁড় মানুষের বুকের মধ্যে থাকে। বান্দা তার রবকে স্মরণ করলে সে সরে যায়; আর সে স্মরণ না করলে ফিরে আসে এবং অন্তরের কেন্দ্রে মাথা রাখে। বলা হয়, তার মাথা সাপের মাথার মতো; সে অন্তরের কেন্দ্রে মাথা রেখে মানুষকে আশা দেখায় ও নানা কথা বলে। মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করলে সরে যায়, আর স্মরণ না করলে ফিরে এসে মাথা রাখে।

“জিন ও মানুষের মধ্য থেকে”—অর্থাৎ শয়তান জিনের মধ্যে যেমন থাকে, মানুষের মধ্যেও তেমন থাকে; জিনকে যেমন কুমন্ত্রণা দেয়, মানুষকেও তেমন দেয়। কালবী এ কথা বলেছেন। “মানুষের অন্তরে” কথাটির দ্বারা পরের আয়াতে উল্লিখিত জিন ও মানুষ—উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। এখানে জিনকে ‘মানুষ’ বলা হয়েছে; যেমন তাদের ‘পুরুষ’ বলা হয়েছে: “আর মানুষের মধ্যকার কিছু পুরুষ জিনদের মধ্যকার কিছু পুরুষের আশ্রয় নিত।”

(সূরা আল-জিন, ৭২:৬)। কোনো কোনো আরবের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে, সে বলেছিল: “জিনদের একদল এল এবং পড়ে গেল।” তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: “তোমরা কারা?” তারা বলল: “আমরা জিনদের মধ্যকার একদল মানুষ।” এটাই ফাররা’র কথার অর্থ। কেউ কেউ বলেছেন: মানুষের কাছে মানুষের কুমন্ত্রণা যেমন সত্য, তেমনি শয়তানের কুমন্ত্রণাও সত্য।

তাই ‘কুমন্ত্রণা’কে জিন ও মানুষ—উভয়ের কাজ বলা হয়েছে; যেমন আল্লাহ বলেছেন: “এভাবেই আমরা প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ ও জিনদের মধ্য থেকে শয়তানদের শত্রু করেছি।” (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১১২)। অর্থাৎ জিন ও মানুষ উভয়ের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইসমাঈল ইবন মুহাম্মাদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন ঈসা বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ইবরাহিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন সুফইয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: কুতাইবা ইবন সাঈদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: জারীর আমাদের বর্ণনা করেছেন, বায়ান থেকে, কায়স ইবন আবি হাজিম থেকে, উকবা ইবন আমির থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তুমি কি দেখনি, আজ রাতে এমন কিছু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, যেগুলোর মতো আর কখনো দেখা যায়নি: ‘বল, আমি আশ্রয় চাই ফালাকের রবের কাছে’ এবং ‘বল, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে’?”

আবু সাঈদ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম আশ-শুরাইহী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবু ইসহাক আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম আথ-থা‘লাবী বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবুল হাসান আবদুর রহমান ইবন ইবরাহিম আল-আদল বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবুল আব্বাস মুহাম্মাদ ইবন ইয়াকুব আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবুল আব্বাস ইবনুল ওয়ালিদ ইবন মুরثিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আমার পিতা আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আওযাঈ আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ইয়াহইয়া ইবন আবি কাসীর আমাকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম ইবনুল হারিস আত-তাইমী আমাকে বর্ণনা করেছেন, উকবা ইবন আমির আল-জুহানী থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বললেন: “তুমি কি তোমাকে জানাব, আশ্রয়প্রার্থীরা যে উত্তম বিষয়ের মাধ্যমে আশ্রয় চায়?”

আমি বললাম: “অবশ্যই।” তিনি বললেন: “‘বল, আমি আশ্রয় চাই ফালাকের রবের কাছে’ এবং ‘বল, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে’।”

আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবন আবদুস সামাদ আল-জাওযজানী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবুল কাসিম আলী ইবন আহমাদ আল-খুযাঈ বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবু সাঈদ আল-হাইসাম ইবন কুলাইব আশ-শাশী বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবু ঈসা আত-তিরমিযী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: কুতাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুফাদ্দাল ইবন ফাদালা আমাদের বর্ণনা করেছেন, উকাইল থেকে, যুহরী থেকে, উরওয়া থেকে, আয়িশা থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন দুই হাতের তালু একত্র করতেন, তাতে হালকা ফুঁ দিতেন এবং পড়তেন: “বল, তিনি আল্লাহ, এক” (সূরা আল-ইখলাস), “বল, আমি আশ্রয় চাই ফালাকের রবের কাছে” এবং “বল, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে।”

তারপর যতদূর সম্ভব শরীরের ওপর দুই হাত বুলিয়ে নিতেন; মাথা, মুখ এবং শরীরের সামনের অংশ থেকে শুরু করতেন। এভাবে তিনি তিনবার করতেন।

আবুল হাসান আস-সারাখসী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে যাহির ইবন আহমাদ বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আবু ইসহাক আল-হাশিমী বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবু মুস‘আব আমাদের বর্ণনা করেছেন, মালিক থেকে, ইবন শিহাব থেকে, উরওয়া ইবন যুবাইর থেকে, আয়িশা (রা.) থেকে: নবী ﷺ অসুস্থ হলে আশ্রয়প্রার্থনার সূরাগুলো পড়ে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন। তাঁর অসুস্থতা বেড়ে গেলে আমি সেগুলো পড়ে তাঁর ওপর ফুঁ দিতাম এবং বরকতের আশায় তাঁর হাত দিয়ে তাঁর শরীর মুছে দিতাম।

ইমাম আবু আলী আল-হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ আল-কাদি এবং আবু হামিদ আহমাদ ইবন আবদুল্লাহ আস-সালিহী—দুজনেই আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁরা বলেন: আবু বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল-হাইরী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন মি‘কাল আল-মাইদানি বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুহাম্মাদ ইবন ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: আবদুর রাজ্জাক আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মা‘মার আমাদের বর্ণনা করেছেন, যুহরী থেকে, সালিম থেকে, ইবন উমর থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “দুটি বিষয় ছাড়া হিংসা নেই: এমন ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ কুরআন দান করেছেন এবং সে রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় তা নিয়ে ইবাদত করে; আর এমন ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং সে রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় তা ব্যয় করে।”

আবদুল ওয়াহিদ আল-মিলীহী আমাদের বর্ণনা করেছেন; তাঁকে আহমাদ ইবন আবদুল্লাহ আন-নু‘আইমী বর্ণনা করেছেন; তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ইবরাহিম ইবন হামযা আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন: ইবন আবি হাজিম আমাকে বর্ণনা করেছেন, ইয়াযীদ—অর্থাৎ ইবনুল হাদ—থেকে, মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম থেকে, আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান থেকে, আবু হুরাইরা থেকে: তিনি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছেন: “আল্লাহ কোনো কিছুর প্রতি ততটা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেননি, যতটা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেন সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতকারী কোনো নবীর তিলাওয়াত—যখন তিনি তা উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করেন।” সমাপ্ত।

সমর্থনকারী হাদিস

সহিহ আল-বুখারি (হাদিস নং ৫০১৭)-তে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবী মুহাম্মাদ ﷺ প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দুই হাতের তালুতে হালকা ফুঁ দিতেন, সূরা “আল-ইখলাস”, “আল-ফালাক” ও “আন-নাস” পড়তেন এবং তা দিয়ে তাঁর পুরো শরীর মুছে নিতেন।

ট্যাগ
  • #সূরা আল-ফালাক
  • #সূরা আন-নাস
  • #আল্লাহর আশ্রয়
  • #জাদু
  • #হিংসা
  • #শয়তানের কুমন্ত্রণা

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →