رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ.
رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
তখন মূসা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল সতর্কতার সঙ্গে। সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে যালিম গোষ্ঠী হতে রক্ষা কর।’
রূপ: «নাজ্জিনী» (نَجِّنِي) আদেশসূচক ক্রিয়ারূপ; অর্থ, “আমাকে রক্ষা করো”। খাবার ও পাথেয়ের কোনো সম্বল ছাড়াই মিশর থেকে মাদইয়ানের পথে পালানোর সময় মূসা (আ.) এই দোআ করেছিলেন।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
“অতঃপর সে সেখান থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বেরিয়ে গেল, সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে তাকাতে”—এই আশঙ্কায় যে, তাকে হত্যা করা হতে পারে। সে আল্লাহর কাছে দোআ করল এবং বলল: «হে আমার রব! আমাকে অত্যাচারী সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করো»। কেননা, সে নিজের পাপের জন্য তওবা করেছিল।
তার কাজটি ক্রোধের বশে ঘটেছিল, কাউকে হত্যা করার ইচ্ছা তার ছিল না। অতএব, তারা তাকে যে হত্যার হুমকি দিয়েছিল, তা ছিল তাদের পক্ষ থেকে সীমালঙ্ঘন ও ঔদ্ধত্য।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীর এই লোকটির মাধ্যমে হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউন ও তার লোকদের ষড়যন্ত্রের কথা অবহিত হন তখন তিনি অতি সন্তর্পণে একাকী সেখান থেকে পালিয়ে যান। ইতিপূর্বে তিনি রাজপুত্রদের মত জীবন যাপন করেছিলেন বলে এই সফর তাঁর কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়। কিন্তু ভয় ও ত্রাসের কারণে তিনি এদিক ওদিক দেখছিলেন এবং সোজা পাড়ি দিচ্ছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক!
আমাকে আপনি ফিরাউনের ও তার লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করুন।” বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ)-কে মিসরের পথ-প্রদর্শনের জন্যে আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন যিনি ঘোড়ায় চড়ে তাঁর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে পথ-প্রদর্শন করেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। অল্পক্ষণ পরেই তিনি বন-জঙ্গল ও মরুভূমি অতিক্রম করে মাদইয়ানের পথে পৌঁছে যান।
এতে তিনি খুবই খুশী হন এবং বলে ওঠেনঃ “আমি মহান আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তিনি আমাকে সঠিক পথে চালিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ আশাও পূরণ করেন এবং তাঁকে শুধু দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক পথ-প্রদর্শন করেই ক্ষান্ত হলেন না, বরং তাকে অন্যদের জন্যে সঠিক পথ-প্রদর্শকও বানালেন। মাদইয়ানের পার্শ্ববর্তী কূপের নিকট এসে তিনি দেখলেন যে, রাখালরা কুপ হতে পানি উঠিয়ে তাদের জন্তুগুলোকে পান করাচ্ছে। তিনি এটাও দেখতে পেলেন যে, দু’টি মহিলা তাদের বকরীগুলোকে ঐ জন্তুগুলোর সাথে পানি পান করানো হতে বিরত রয়েছে।
তিনি যখন এ অবস্থা অবলোকন করলেন যে, মহিলাদ্বয় নিজেরাও তাদের বকরীগুলোকে পানি পান করাতে পারছে না এবং ঐ রাখালরাও তাদের জানোয়ারগুলোর সাথে ঐ বকরীগুলোকে পানি পান করানোর কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না তখন তার মনে করুণার উদ্রেক হলো। তাই তিনি মহিলা দুটিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা তোমাদের এ বকরীগুলোকে পানি পান করানো হতে বিরত থাকছো কেন?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা বকরীগুলোকে পানি পান করাতে পারি না যতক্ষণ না রাখালরা তাদের জানোয়াগুলোকে নিয়ে সরে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ।”
তাদের একথা শুনে তিনি নিজেই পানি উঠিয়ে তাদের বকরীগুলোকে পান করালেন। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, রাখালরা একটি বিরাট পাথর দ্বারা ঐ কূপটির মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল যা দশজন লোক মিলে সরাতে পারতো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) একাকী ঐ পাথরটি সরিয়ে ফেলেন। তিনি মাত্র এক বালতি পানি উঠিয়েছিলেন যাতে মহান আল্লাহ বরকত দান করেছিলেন, ফলে ঐ মহিলাদ্বয়ের বকরীগুলো ঐ পানি পান করেই পরিতৃপ্ত হয়েছিল।
অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) ক্লান্ত শ্রান্ত এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি গাছের ছায়ার নীচে বসে পড়েন। মিসর হতে মাদইয়ান পর্যন্ত তিনি দৌড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তাই তাঁর পায়ে ফোসকা উঠে গিয়েছিল। খাওয়ার কোন দ্রব্য তাঁর সাথে ছিল না।
গাছের পাতা, ঘাস ইত্যাদি তিনি ভক্ষণ করে আসছিলেন। পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি আধখানা খেজুরেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। অথচ সেই সময় সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে তিনিই ছিলেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও মনোনীত বান্দা!
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “দুই দিনের সফর শেষে আমি মাদইয়ানে পৌঁছি। আমি জনগণকে ঐ গাছের পরিচয় জানতে চাই যে গাছের ছায়ায় হযরত মূসা (আঃ) আশ্রয় নিয়েছিলেন। জনগণ আমাকে গাছটি দেখিয়ে দেয়। আমি দেখি যে, ওটা একটি সবুজ-শ্যামল বৃক্ষ।
আমার আরোহণের পশুটি ক্ষুধার্ত ছিল। তাই সে ঐ গাছের পাতা মুখ দ্বারা ছিড়ে নেয় এবং অতি কষ্টে চিবাতে থাকে। কিন্তু শেষে সে পাতা মুখ হতে বের করে ফেলে। দেয়। আমি হযরত কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর দু'আ করে সেখান হতে ফিরে আসি।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) ঐ গাছটি দেখতে গিয়েছিলেন যেখান থেকে আল্লাহ তা'আলা হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন।
এর বর্ণনা সত্ত্বরই আসবে ইনশাআল্লাহ! সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ওটা ছিল বাবলার গাছ। মোটকথা, হযরত মূসা (আঃ) ঐ গাছের ছায়ায় বসে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার মুখাপেক্ষী।” হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, ঐ মহিলাটিও তাঁর এ প্রার্থনা শুনেছিল।
আল-বাগাভির তাফসির
“অতঃপর সে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল”—অর্থাৎ, মূসা (আ.)। “ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায়, সতর্ক দৃষ্টিতে”—অর্থাৎ, তাকে খুঁজতে লোকজন বেরিয়েছে কি না, সে অপেক্ষায়। “সে বলল: হে আমার রব! আমাকে অত্যাচারী সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করো”—অর্থাৎ, কাফিরদের হাত থেকে।
ঘটনাবিবরণে এসেছে: ফিরআউন মূসা (আ.)-এর পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য লোক পাঠাল। সে বলল: “পথের বাঁকগুলো ধরে এগিয়ে চলো; কারণ সে পথ চেনে না।”
«সহিহ মুসলিম» (নং ২৬৯৯)-এ বিপদ থেকে পালানোর সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করার বিষয়ে নবী (সা.)-এর বাণী বর্ণিত হয়েছে।