দোয়া 47 নিরাপত্তা ও রিজিক 6 মিনিট পড়তে

আল্লাহর কাছে পরম মুখাপেক্ষিতা

মূসা (আ.) 28:24
আরবি পাঠ

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ، فَقِيرٌ.

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

আরবি পাঠ হরকতসহ কুরআন থেকে নেওয়া হয়েছে। القصص 28:24
দোয়া শুনুন 0:00 0:00
কণ্ঠস্বর
প্রতিবর্ণীকরণ Rabbi innī limā anzalta ilayya min khayrin faqīr
ভাবানুবাদ
Taisirul QuranBN

তখন মূসা তাদের জন্য পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিল, অতঃপর পেছন ফিরে ছায়ায় গিয়ে বসল, অতঃপর বলল- ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহই করবে আমি তো তারই ভিখারী।’

অর্থ ও বৈশিষ্ট্য

রূপ: আল্লাহর সামনে পরম অভাব ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা—‘ফকীর’ অর্থ দরিদ্র বা অভাবগ্রস্ত। সরাসরি কিছু না চেয়েই রিযিক, আশ্রয় ও সাহায্য চাওয়ার এক অনুপম দোয়া।

ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির

মূসা (আ.) তাদের দুজনের প্রতি কোমল হলেন এবং তাদের প্রতি দয়া করলেন। “অতঃপর তিনি তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিলেন”—তাদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক না চেয়ে, আর মহিমান্বিত আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য না রেখে। তিনি যখন তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিলেন, তখন ছিল প্রচণ্ড গরমের সময়, দিনের মধ্যভাগ।

এর প্রমাণ হলো, “তারপর তিনি ছায়ার দিকে সরে গেলেন”—ক্লান্তির পর সেই ছায়ায় বিশ্রাম নিতে। “অতঃপর তিনি বললেন”—সেই অবস্থায় নিজের রবের কাছে রিযিক প্রার্থনা করে: “হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণই পাঠাও, আমি তার মুখাপেক্ষী।” অর্থাৎ, তুমি যে কল্যাণ আমার কাছে পৌঁছে দাও এবং আমার জন্য সহজ করে দাও, আমি তারই অভাবগ্রস্ত।

এটি ছিল তাঁর নিজের অবস্থার মাধ্যমে করা প্রার্থনা। অবস্থার মাধ্যমে প্রার্থনা করা মুখে কথা বলে প্রার্থনা করার চেয়েও অধিক মর্মস্পর্শী। এ অবস্থায় তিনি নিজের রবের কাছে প্রার্থনা করতে এবং বিনীতভাবে নিবেদন করতে থাকলেন। আর ওই দুই নারী তাদের পিতার কাছে ফিরে গিয়ে যা ঘটেছিল তা তাঁকে জানালেন।

ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির

২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীর এই লোকটির মাধ্যমে হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউন ও তার লোকদের ষড়যন্ত্রের কথা অবহিত হন তখন তিনি অতি সন্তর্পণে একাকী সেখান থেকে পালিয়ে যান। ইতিপূর্বে তিনি রাজপুত্রদের মত জীবন যাপন করেছিলেন বলে এই সফর তাঁর কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়। কিন্তু ভয় ও ত্রাসের কারণে তিনি এদিক ওদিক দেখছিলেন এবং সোজা পাড়ি দিচ্ছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক!

আমাকে আপনি ফিরাউনের ও তার লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করুন।” বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ)-কে মিসরের পথ-প্রদর্শনের জন্যে আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন যিনি ঘোড়ায় চড়ে তাঁর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে পথ-প্রদর্শন করেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। অল্পক্ষণ পরেই তিনি বন-জঙ্গল ও মরুভূমি অতিক্রম করে মাদইয়ানের পথে পৌঁছে যান।

এতে তিনি খুবই খুশী হন এবং বলে ওঠেনঃ “আমি মহান আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তিনি আমাকে সঠিক পথে চালিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ আশাও পূরণ করেন এবং তাঁকে শুধু দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক পথ-প্রদর্শন করেই ক্ষান্ত হলেন না, বরং তাকে অন্যদের জন্যে সঠিক পথ-প্রদর্শকও বানালেন। মাদইয়ানের পার্শ্ববর্তী কূপের নিকট এসে তিনি দেখলেন যে, রাখালরা কুপ হতে পানি উঠিয়ে তাদের জন্তুগুলোকে পান করাচ্ছে। তিনি এটাও দেখতে পেলেন যে, দু’টি মহিলা তাদের বকরীগুলোকে ঐ জন্তুগুলোর সাথে পানি পান করানো হতে বিরত রয়েছে।

তিনি যখন এ অবস্থা অবলোকন করলেন যে, মহিলাদ্বয় নিজেরাও তাদের বকরীগুলোকে পানি পান করাতে পারছে না এবং ঐ রাখালরাও তাদের জানোয়ারগুলোর সাথে ঐ বকরীগুলোকে পানি পান করানোর কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না তখন তার মনে করুণার উদ্রেক হলো। তাই তিনি মহিলা দুটিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা তোমাদের এ বকরীগুলোকে পানি পান করানো হতে বিরত থাকছো কেন?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা বকরীগুলোকে পানি পান করাতে পারি না যতক্ষণ না রাখালরা তাদের জানোয়াগুলোকে নিয়ে সরে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ।”

তাদের একথা শুনে তিনি নিজেই পানি উঠিয়ে তাদের বকরীগুলোকে পান করালেন। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, রাখালরা একটি বিরাট পাথর দ্বারা ঐ কূপটির মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল যা দশজন লোক মিলে সরাতে পারতো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) একাকী ঐ পাথরটি সরিয়ে ফেলেন। তিনি মাত্র এক বালতি পানি উঠিয়েছিলেন যাতে মহান আল্লাহ বরকত দান করেছিলেন, ফলে ঐ মহিলাদ্বয়ের বকরীগুলো ঐ পানি পান করেই পরিতৃপ্ত হয়েছিল।

অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) ক্লান্ত শ্রান্ত এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি গাছের ছায়ার নীচে বসে পড়েন। মিসর হতে মাদইয়ান পর্যন্ত তিনি দৌড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তাই তাঁর পায়ে ফোসকা উঠে গিয়েছিল। খাওয়ার কোন দ্রব্য তাঁর সাথে ছিল না।

গাছের পাতা, ঘাস ইত্যাদি তিনি ভক্ষণ করে আসছিলেন। পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি আধখানা খেজুরেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। অথচ সেই সময় সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে তিনিই ছিলেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও মনোনীত বান্দা!

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “দুই দিনের সফর শেষে আমি মাদইয়ানে পৌঁছি। আমি জনগণকে ঐ গাছের পরিচয় জানতে চাই যে গাছের ছায়ায় হযরত মূসা (আঃ) আশ্রয় নিয়েছিলেন। জনগণ আমাকে গাছটি দেখিয়ে দেয়। আমি দেখি যে, ওটা একটি সবুজ-শ্যামল বৃক্ষ।

আমার আরোহণের পশুটি ক্ষুধার্ত ছিল। তাই সে ঐ গাছের পাতা মুখ দ্বারা ছিড়ে নেয় এবং অতি কষ্টে চিবাতে থাকে। কিন্তু শেষে সে পাতা মুখ হতে বের করে ফেলে। দেয়। আমি হযরত কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর দু'আ করে সেখান হতে ফিরে আসি।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) ঐ গাছটি দেখতে গিয়েছিলেন যেখান থেকে আল্লাহ তা'আলা হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন।

এর বর্ণনা সত্ত্বরই আসবে ইনশাআল্লাহ! সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ওটা ছিল বাবলার গাছ। মোটকথা, হযরত মূসা (আঃ) ঐ গাছের ছায়ায় বসে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার মুখাপেক্ষী।” হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, ঐ মহিলাটিও তাঁর এ প্রার্থনা শুনেছিল।

আল-বাগাভির তাফসির

“অতঃপর তিনি তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিলেন, তারপর ছায়ার দিকে সরে গেলেন”—একটি গাছের ছায়ায়। প্রচণ্ড গরমে তিনি তার ছায়ায় বসেছিলেন, আর তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন।

“অতঃপর তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণই পাঠাও, আমি তার মুখাপেক্ষী।’”—অর্থাৎ, খাদ্যের মুখাপেক্ষী।

“মুখাপেক্ষী”—ভাষাবিদদের মতে, এখানে ‘লি’ অব্যয়টি ‘ইলা’ [দিকে/প্রতি] অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বলা হয়, “সে তার মুখাপেক্ষী” এবং “সে তার প্রতি মুখাপেক্ষী”। তিনি বলতে চেয়েছেন: “তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ পাঠাও”—অর্থাৎ খাদ্য—আমি তার অভাবগ্রস্ত ও প্রয়োজনী। ক্ষুধার কারণে তিনি খাবার চাইছিলেন।

ইবন আব্বাস (রা.) বলেছেন: তিনি আল্লাহর কাছে এক টুকরো রুটি চেয়েছিলেন, যা দিয়ে তাঁর কোমর সোজা রাখতে পারেন। আল-বাকির বলেছেন: তিনি এ কথা বলেছিলেন, অথচ তখন তিনি একটি খেজুরের অর্ধেকেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। ইবন আব্বাস (রা.) থেকে সাঈদ ইবন জুবাইর বর্ণনা করেছেন: মূসা বলেছিলেন, “হে আমার রব!

তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণই পাঠাও, আমি তার মুখাপেক্ষী”—অথচ তিনি ছিলেন আল্লাহর কাছে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত; তবুও তিনি একটি খেজুরের অর্ধেকেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। মুজাহিদ বলেছেন: তিনি শুধু রুটিই চেয়েছিলেন।

তারা দুজন যখন লোকজনের আগে দ্রুত তাদের পিতার কাছে ফিরে গেলেন, তখন তাদের পশুগুলো ছিল পূর্ণ উদর ও দুধে ভরা। তিনি তাঁদের বললেন, “তোমরা এত তাড়াতাড়ি ফিরলে কেন?” তাঁরা বললেন, “আমরা একজন সৎ লোককে পেয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছেন।” তখন তিনি তাঁদের একজনকে বললেন, “যাও, তাকে আমার কাছে ডেকে আনো।”

সমর্থনকারী হাদিস

আত-তিরমিযীর “আস-সুনান” (হাদিস নং ২৪৮২)-এ বর্ণিত হয়েছে: “যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিজের অভাব প্রকাশ করে, আল্লাহ তাকে সচ্ছলতা দান করেন।”

ট্যাগ
  • #মূসা
  • #দোয়া
  • #আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা
  • #রিযিক
  • #আশ্রয়
  • #সাহায্য

দোয়া অনুসন্ধান

বিষয়, সূরা, অনুবাদ, তাফসির বা আরবি লেখা দিয়ে খুঁজুন। আরবিতেও অনুসন্ধান করা যায়—হরকত দেওয়া আবশ্যক নয়।

↑ ↓ navigate · ↵ open · esc close ফলাফল →