আল্লাহর ওপর ভরসা ও ক্ষমাপ্রার্থনা
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا، وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا، وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ. رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا، وَاغْفِرْ لَنَا. رَبَّنَا، إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
অডিও লোড করা যায়নি। পরে আবার চেষ্টা করুন।
ইবরাহীম ও তার সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে তোমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল- ‘তোমাদের সঙ্গে আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর তাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমাদের আর তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ শুরু হয়ে গেছে যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনবে। তবে ইবরাহীম যে তার পিতাকে বলেছিল- ‘আমি অবশ্য অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব আর আমি তোমার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে কোন কিছু করারই অধিকার রাখি না’’- এটা একটা ব্যতিক্রম। (আর ইবরাহীম ও তার সঙ্গী সাথীরা প্রার্থনা করেছিল) ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমারই উপর নির্ভর করছি, তোমারই অভিমুখী হচ্ছি, আর (সব কিছুর) প্রত্যাবর্তন তো তোমারই পানে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কাফিরদের উৎপীড়নের পাত্র করো না, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর, তুমি মহা পরাক্রান্ত, মহা বিজ্ঞানী।
এ দোয়ায় ভরসা প্রকাশ করা হয়েছে (তাওয়াক্কুল—تَوَكُّل) এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে (ইনাবাহ—إِنَابَة)। এরপর ‘আমাদেরকে পরীক্ষার পাত্র করো না’—এই নিষেধমূলক প্রার্থনা এবং ক্ষমা প্রার্থনা এসেছে।
শাইখ আবদুর রহমান আস-সা’দির তাফসির
হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—অর্থাৎ এমন সৎ অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত, যার অনুসরণ তোমাদের উপকার করবে। কারণ তোমাদেরকে একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের ধর্মপথ অনুসরণের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তারা যখন তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের উপাসনা কর, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই’—অর্থাৎ ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনগণ তাদের মুশরিক সম্প্রদায় এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করা হতো, তাদের থেকে নিজেদের সম্পর্কমুক্ত ঘোষণা করেছিলেন। এরপর তারা নিজেদের শত্রুতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে বলেছিল, ‘আমরা তোমাদের প্রত্যাখ্যান করেছি; আর আমাদের ও তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে।’ বিদ্বেষ হলো অন্তরের ঘৃণা ও ভালোবাসার বিলুপ্তি; আর শত্রুতা হলো দেহ ও কাজের বিরোধিতা।
এ শত্রুতা ও বিদ্বেষের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা সীমা নেই; বরং তা চিরকাল চলবে, যতক্ষণ তোমরা কুফরিতে অবিচল থাকবে—‘যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।’ যখন তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, তখন শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে এবং তার পরিবর্তে ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
সুতরাং হে মুমিনগণ! ঈমান ও তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, এগুলোর অপরিহার্য বিষয়গুলো পালন করা এবং একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত করার ক্ষেত্রে ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে তোমাদের জন্য আদর্শ রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে নয়—সেটি হলো মুশরিক ও কাফির পিতা আযরকে ইবরাহীমের বলা: ‘আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।’ ইবরাহীম তাঁকে ঈমান ও তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তখন ইবরাহীম বলেছিলেন, ‘তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই।’ অর্থাৎ আমি আমার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করব—আশা করি, তাঁকে ডেকে আমি হতভাগ্য হব না। এই অবস্থায় মুশরিকের জন্য দোয়া করার ক্ষেত্রে ইবরাহীমকে অনুসরণ করার অনুমতি তোমাদের নেই; তোমরা মুশরিকদের জন্য দোয়া করে বলতে পারো না যে, এ ব্যাপারে আমরা ইবরাহীমের ধর্মপথ অনুসরণ করছি। কেননা আল্লাহ ইবরাহীমের এ কাজের কারণ উল্লেখ করে বলেছেন: ‘ইবরাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল কেবল তার কাছে দেওয়া এক প্রতিশ্রুতির কারণে।
অতঃপর যখন তার কাছে স্পষ্ট হলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার থেকে সম্পর্কমুক্ত হলেন। নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন বিনীতভাবে প্রার্থনাকারী ও সহনশীল।’ (সূরা আত-তাওবা, ৯:১১৪)
ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে তোমাদের জন্য আরেকটি উত্তম আদর্শ রয়েছে: তাঁরা আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, তাঁর ওপর ভরসা করেছিলেন, তাঁরই দিকে ফিরে এসেছিলেন এবং নিজেদের অক্ষমতা ও ত্রুটি স্বীকার করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমারই ওপর নির্ভর করেছি’—অর্থাৎ যা আমাদের উপকার করে তা লাভ করা এবং যা আমাদের ক্ষতি করে তা দূর করার ব্যাপারে আমরা তোমার ওপর নির্ভর করেছি; হে আমাদের প্রতিপালক, এ বিষয়ে আমরা তোমার ওপর আস্থা রেখেছি। ‘আর তোমারই দিকে ফিরে এসেছি’—অর্থাৎ আমরা তোমার আনুগত্য, তোমার সন্তুষ্টি এবং তোমার নৈকট্য লাভের সব উপায়ের দিকে ফিরে এসেছি।
এ কাজে আমরা সচেষ্ট এবং সৎকর্ম সম্পাদনে পরিশ্রমী। আমরা জানি, আমাদের প্রত্যাবর্তন তোমারই কাছে; তাই তোমার সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুতি নেব এবং এমন কাজ করব, যা তোমার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উপায় হয়।
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কাফিরদের জন্য পরীক্ষার পাত্র করো না’—অর্থাৎ আমাদের পাপের কারণে তাদেরকে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব দিও না, যাতে তারা আমাদের নির্যাতন করে এবং ঈমানের যেসব কাজ তারা বাধা দিতে পারে, তা থেকে আমাদের বিরত রাখে। তারা নিজেরাও পরীক্ষায় পড়ে; কারণ তারা যদি নিজেদেরকে বিজয়ী দেখে, তবে মনে করবে তারাই সত্যের ওপর রয়েছে আর আমরা মিথ্যার ওপর। ফলে তাদের কুফরি ও সীমালঙ্ঘন আরও বেড়ে যাবে।
‘আর আমাদের ক্ষমা করো’—আমাদের কৃত পাপ ও মন্দ কাজ এবং যেসব আদেশ পালনে আমরা ত্রুটি করেছি, সেসব ক্ষমা করো। ‘হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয়ই তুমি মহাপরাক্রমশালী’—সবকিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল; ‘মহাপ্রজ্ঞাময়’—যিনি প্রত্যেক বিষয়কে যথাস্থানে স্থাপন করেন। অতএব, তোমার পরাক্রম ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো, আমাদের পাপ ক্ষমা করো এবং আমাদের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দাও।
ইমাম ইবন কাসিরের তাফসির
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব না করার হিদায়াত দানের পর তাদের জন্যে তাঁর খলীল হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তার অনুসারীদের (রাঃ) নমুনা বা আদর্শ পেশ করছেন যে, তাঁরা স্পষ্টভাবে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে বলে দেনঃ তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তোমাদের দ্বীন ও পন্থাকে আমরা ঘৃণা করি। তোমরা আমাদেরকে শত্রু মনে করতে থাকো যে পর্যন্ত তোমরা এই পন্থা ও মাযহাবের উপর রয়েছে। ভ্রাতৃত্বের কারণে যে আমরা তোমাদের কুফরী সত্ত্বেও তোমাদের সাথে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক কায়েম রাখবো এটা অসম্ভব।
হ্যাঁ, তবে যদি আল্লাহ তোমাদের কে হিদায়াত দান করেন এবং তোমরা এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন কর ও তাঁর একত্ববদিকে মেনে নিয়ে তাঁর ইবাদত করতে শুরু করে দাও এবং যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক মনে করে রেখেছে ও তাদের উপাসনায় লেগে রয়েছে তাদের সবকেই পরিত্যাগ করে দাও ও নিজেদের কুফরীর নীতি ও শিরকের পন্থা হতে সরে পড় তাহলে সেটা স্বতন্ত্র কথা! এ অবস্থায় তোমরা অবশ্যই আমাদের ভাই ও বন্ধু হয়ে যাবে। অন্যথায় আমাদের ও তোমাদের মধ্যে ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাক নেই। আমরা তোমাদের হতে ও তোমরা আমাদের হতে পৃথক।
তবে হ্যাঁ, এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার পিতার জন্যে যে ক্ষমা প্রার্থনা করার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং তা পূর্ণ করেছিলেন, এতে তাঁর অনুসরণ করা চলবে না। কেননা, এই ক্ষমা প্রার্থনা ঐ সময় পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যে পর্যন্ত তিনি তাঁর পিতার আল্লাহ্ তা'আলার শত্রু হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে জানতে পারেননি। যখন তিনি নিশ্চিতরূপে জানতে পারলেন যে, তাঁর পিতা আল্লাহর শত্রু তখন তিনি স্পষ্টভাবে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। কোন কোন মুমিন নিজের মুশরিক মাতা-পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং দলীল হিসেবে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার ঘটনাটি পেশ করতেন।
তখন আল্লাহ্ তা'আলা নিম্নের আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী এবং মুমিনদের জন্যে সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী। ইবরাহীম (আঃ) তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে। অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হলো যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন ইবরাহীম (আঃ) ওর সম্পর্ক ছিন্ন করলো। ইবরাহীম (আঃ) তো কোমল হৃদয় ও সহনশীল।”
(৯:১১৩-১১৪) আর এই সূরায় আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন যে, উম্মতে মুহাম্মাদী (সঃ)-এর জন্যে ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। তবে ব্যতিক্রম তার পিতার প্রতি ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তিঃ আমি নিশ্চয়ই তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না। অর্থাৎ মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার মধ্যে আদর্শ নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ), যহ্হাক।
(রঃ) প্রমুখ শুরুজনও এই ভাবার্থই বর্ণনা করেছেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছে যে, কওমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করছেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিকট আরয করছেনঃ হে আল্লাহ! সমস্ত কাজে-কর্মে আমাদের ভরসা আপনার পবিত্র সত্তার উপরই রয়েছে।
আমরা আমাদের সমস্ত কার্য আপনার কাছেই সমর্পণ করছি। আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আপনারই নিকট। এরপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কাফিরদের পীড়নের পাত্র করবেন না। অর্থাৎ যেন এমন না হয় যে, তারা আমাদের উপর বিজয় লাভ করে আমাদেরকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলে।
অনুরূপভাবে যেন এরূপও না হয় যে, আপনার পক্ষ হতে আমাদের উপর কোন বিপদ আপতিত হয় এবং ওটা তাদের বিভ্রান্তির কারণ হয় যে, যদি আমরা সত্যের উপর থেকে থাকি তবে আমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসলো কেন? দ্রুপ এও যেন না হয় যে, তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়ে আমাদেরকে কষ্ট দিতে দিতে আপনার দ্বীন হতে আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করছেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন, আমাদের অপরাধ মার্জনা করুন!
আপনি তো পরাক্রমশালী। আপনার নিকট আশ্রয়প্রার্থী কখনো বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসে না। আপনার দ্বারে করাঘাতকারী কখনো শূন্য হস্তে ফিরে না। আপনি আপনার কথায়, কাজে, শরীয়ত ও ভাগ্য নির্ধারণে প্রজ্ঞাময়। আপনার কোন কাজই হিকমত শূন্য নয়।
এরপর গুরুত্ব হিসেবে মহান আল্লাহ্ পূর্ব কথারই পুনরাবৃত্তি করে বলেনঃ তাদের মধ্যে তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। যে কেউই আল্লাহ তাআলার উপর, কিয়ামত সংঘটনের সত্যতার উপর ঈমান রাখে তার তাদের অনুসরণে আগে বেড়ে পা রাখা উচিত। আর যে কেউই আল্লাহর আহ্কাম হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ্ তো অভাবমুক্ত। তিনি কারো কোন পরোয়া করেন না।
তিনি প্রশংসাৰ্য। মাখলুক সৃষ্টিকর্তার প্রশংসায় নিমগ্ন রয়েছে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা এবং ভূ-পৃষ্ঠের সবাই কুফরী কর বা অবাধ্য হয়ে যাও তবে জেনে রেখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ।।” (১৪:৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাকেই বলা হয় যিনি তাঁর অভাবহীনতায় পরিপূর্ণ।
একমাত্র আল্লাহরই মধ্যে এই বিশেষণ রয়েছে যে, তিনি সর্বপ্রকারের অভাবমুক্ত এবং সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। অন্য কারো সত্তা এরূপ নয়। তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। কেউই তার সাথে তুলনীয় হতে পারে না। তিনি পবিত্র ও একক। তিনি সবারই উপর হাকিম, সবারই উপর বিজয়ী এবং সবারই বাদশাহ্।
তিনি প্রশংসাৰ্হ। সমস্ত সৃষ্টজীব সদা তাঁর প্রশংসায় রত রয়েছে। অর্থাৎ তিনি তাঁর সমস্ত কথায় ও কাজে প্রশংসনীয়। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কোন প্রতিপালকও নেই।
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব না করার হিদায়াত দানের পর তাদের জন্যে তাঁর খলীল হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তার অনুসারীদের (রাঃ) নমুনা বা আদর্শ পেশ করছেন যে, তাঁরা স্পষ্টভাবে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে বলে দেনঃ তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তোমাদের দ্বীন ও পন্থাকে আমরা ঘৃণা করি। তোমরা আমাদেরকে শত্রু মনে করতে থাকো যে পর্যন্ত তোমরা এই পন্থা ও মাযহাবের উপর রয়েছে। ভ্রাতৃত্বের কারণে যে আমরা তোমাদের কুফরী সত্ত্বেও তোমাদের সাথে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক কায়েম রাখবো এটা অসম্ভব।
হ্যাঁ, তবে যদি আল্লাহ তোমাদের কে হিদায়াত দান করেন এবং তোমরা এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন কর ও তাঁর একত্ববদিকে মেনে নিয়ে তাঁর ইবাদত করতে শুরু করে দাও এবং যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক মনে করে রেখেছে ও তাদের উপাসনায় লেগে রয়েছে তাদের সবকেই পরিত্যাগ করে দাও ও নিজেদের কুফরীর নীতি ও শিরকের পন্থা হতে সরে পড় তাহলে সেটা স্বতন্ত্র কথা! এ অবস্থায় তোমরা অবশ্যই আমাদের ভাই ও বন্ধু হয়ে যাবে। অন্যথায় আমাদের ও তোমাদের মধ্যে ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাক নেই। আমরা তোমাদের হতে ও তোমরা আমাদের হতে পৃথক।
তবে হ্যাঁ, এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার পিতার জন্যে যে ক্ষমা প্রার্থনা করার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং তা পূর্ণ করেছিলেন, এতে তাঁর অনুসরণ করা চলবে না। কেননা, এই ক্ষমা প্রার্থনা ঐ সময় পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যে পর্যন্ত তিনি তাঁর পিতার আল্লাহ্ তা'আলার শত্রু হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে জানতে পারেননি। যখন তিনি নিশ্চিতরূপে জানতে পারলেন যে, তাঁর পিতা আল্লাহর শত্রু তখন তিনি স্পষ্টভাবে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। কোন কোন মুমিন নিজের মুশরিক মাতা-পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং দলীল হিসেবে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার ঘটনাটি পেশ করতেন।
তখন আল্লাহ্ তা'আলা নিম্নের আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী এবং মুমিনদের জন্যে সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী। ইবরাহীম (আঃ) তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে। অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হলো যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন ইবরাহীম (আঃ) ওর সম্পর্ক ছিন্ন করলো। ইবরাহীম (আঃ) তো কোমল হৃদয় ও সহনশীল।”
(৯:১১৩-১১৪) আর এই সূরায় আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন যে, উম্মতে মুহাম্মাদী (সঃ)-এর জন্যে ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। তবে ব্যতিক্রম তার পিতার প্রতি ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তিঃ আমি নিশ্চয়ই তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না। অর্থাৎ মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার মধ্যে আদর্শ নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ), যহ্হাক।
(রঃ) প্রমুখ শুরুজনও এই ভাবার্থই বর্ণনা করেছেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছে যে, কওমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করছেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিকট আরয করছেনঃ হে আল্লাহ! সমস্ত কাজে-কর্মে আমাদের ভরসা আপনার পবিত্র সত্তার উপরই রয়েছে।
আমরা আমাদের সমস্ত কার্য আপনার কাছেই সমর্পণ করছি। আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আপনারই নিকট। এরপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কাফিরদের পীড়নের পাত্র করবেন না। অর্থাৎ যেন এমন না হয় যে, তারা আমাদের উপর বিজয় লাভ করে আমাদেরকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলে।
অনুরূপভাবে যেন এরূপও না হয় যে, আপনার পক্ষ হতে আমাদের উপর কোন বিপদ আপতিত হয় এবং ওটা তাদের বিভ্রান্তির কারণ হয় যে, যদি আমরা সত্যের উপর থেকে থাকি তবে আমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসলো কেন? দ্রুপ এও যেন না হয় যে, তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়ে আমাদেরকে কষ্ট দিতে দিতে আপনার দ্বীন হতে আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করছেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন, আমাদের অপরাধ মার্জনা করুন!
আপনি তো পরাক্রমশালী। আপনার নিকট আশ্রয়প্রার্থী কখনো বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসে না। আপনার দ্বারে করাঘাতকারী কখনো শূন্য হস্তে ফিরে না। আপনি আপনার কথায়, কাজে, শরীয়ত ও ভাগ্য নির্ধারণে প্রজ্ঞাময়। আপনার কোন কাজই হিকমত শূন্য নয়।
এরপর গুরুত্ব হিসেবে মহান আল্লাহ্ পূর্ব কথারই পুনরাবৃত্তি করে বলেনঃ তাদের মধ্যে তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। যে কেউই আল্লাহ তাআলার উপর, কিয়ামত সংঘটনের সত্যতার উপর ঈমান রাখে তার তাদের অনুসরণে আগে বেড়ে পা রাখা উচিত। আর যে কেউই আল্লাহর আহ্কাম হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ্ তো অভাবমুক্ত। তিনি কারো কোন পরোয়া করেন না।
তিনি প্রশংসাৰ্য। মাখলুক সৃষ্টিকর্তার প্রশংসায় নিমগ্ন রয়েছে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা এবং ভূ-পৃষ্ঠের সবাই কুফরী কর বা অবাধ্য হয়ে যাও তবে জেনে রেখো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ।।” (১৪:৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাকেই বলা হয় যিনি তাঁর অভাবহীনতায় পরিপূর্ণ।
একমাত্র আল্লাহরই মধ্যে এই বিশেষণ রয়েছে যে, তিনি সর্বপ্রকারের অভাবমুক্ত এবং সম্পূর্ণরূপে বেপরোয়া। অন্য কারো সত্তা এরূপ নয়। তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। কেউই তার সাথে তুলনীয় হতে পারে না। তিনি পবিত্র ও একক। তিনি সবারই উপর হাকিম, সবারই উপর বিজয়ী এবং সবারই বাদশাহ্।
তিনি প্রশংসাৰ্হ। সমস্ত সৃষ্টজীব সদা তাঁর প্রশংসায় রত রয়েছে। অর্থাৎ তিনি তাঁর সমস্ত কথায় ও কাজে প্রশংসনীয়। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং তিনি ছাড়া কোন প্রতিপালকও নেই।
আল-বাগাভির তাফসির
‘তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ’—অর্থাৎ অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। ‘ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গে থাকা লোকদের মধ্যে’—অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্যে।
‘যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল’—অর্থাৎ মুশরিকদের—‘তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ ‘বারী’ শব্দের বহুবচন হলো ‘বারাআ’। ‘এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ইবাদত কর, তাদের থেকেও। আমরা তোমাদের প্রত্যাখ্যান করেছি’—অর্থাৎ তোমাদের ধর্মকে অস্বীকার করেছি এবং তা প্রত্যাখ্যান করেছি।
‘আর আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।’ আল্লাহ হাতিব ও মুমিনদের নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তারা মুশরিকদের থেকে সম্পর্কমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনদের অনুসরণ করে।
‘তবে ইবরাহীম তার পিতাকে বলেছিল, “আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব”—অর্থাৎ ইবরাহীম ও তাঁর বিষয়াবলির মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে, তবে তাঁর মুশরিক পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়টি ব্যতিক্রম। ইবরাহীম (আ.) তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, “আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।” পরে তিনি তার থেকে সম্পর্কমুক্ত হন—যেমনটি আমরা সূরা আত-তাওবায় উল্লেখ করেছি।
‘আর আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই’—ইবরাহীম তাঁর পিতাকে বলেছিলেন: তুমি যদি তাঁর অবাধ্য হও এবং তাঁর সঙ্গে শিরক কর, তবে আল্লাহর শাস্তি থেকে তোমাকে রক্ষা করার বা তা ঠেকানোর ক্ষমতা আমার নেই।
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমারই ওপর নির্ভর করেছি’—ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনগণ এ কথা বলেছিলেন। ‘আর তোমারই দিকে ফিরে এসেছি, আর প্রত্যাবর্তন তোমারই কাছে।’
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কাফিরদের জন্য পরীক্ষার পাত্র করো না।’ যাজ্জাজ বলেছেন: আমাদের ওপর তাদের বিজয়ী করো না, যাতে তারা মনে করে তারাই সত্যের ওপর রয়েছে এবং পরীক্ষায় পড়ে যায়। মুজাহিদ বলেছেন: তাদের হাতে আমাদের শাস্তি দিও না এবং তোমার পক্ষ থেকে কোনো শাস্তি দিয়েও আমাদের শাস্তি দিও না; তাহলে তারা বলবে, ‘এরা যদি সত্যের ওপর থাকত, তবে তাদের এমন কিছু ঘটত না।’ ‘আর আমাদের ক্ষমা করো, হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয়ই তুমি মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়।’
সহিহ আল-বুখারি (হাদিস নং ৪৫১৯)-এ স্রষ্টার ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে ইবরাহীম (আ.)-এর আদর্শের কথা বর্ণিত হয়েছে।